কখনও মমতাময়ী মা, কখনও বিষধর সাপ

FotorCreatedমারজিয়া প্রভা: যে নারী সন্তানকে দশ মাস গর্ভে ধারণ করে, জন্মের পর দিনরাত অমানুষিক খাটুনি করে বাচ্চাকে বড় করে তোলে, সেই মা-ই আবার অন্য মায়ের সন্তানকে নির্যাতন করে , মেরে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করে না !

শিশু রাকিবকে খুন করলো যে নারী, কিংবা ক’দিন আগে কাজের মেয়ে হ্যাপিকে আসুরিক নির্যাতন করে পা ভেঙ্গে দিল জাতীয় ক্রিকেট দলের পেসার শাহাদাত হোসেনের স্ত্রী নিতু, এরা তো সবাই ব্যক্তিজীবনে মা ! নাকি মা শুধু নিজের সন্তানের বেলায়, অন্য সন্তানের ক্ষেত্রে না!

স্কুল লাইফ, কলেজ লাইফ শেষ করে ভার্সিটি লাইফের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দেখেছি অনেক আন্টিকে, যারা নিজেদের ছেলেমেয়ের সাফল্যে ভীষণ খুশি হলেও, অন্য ছেলেমেয়ের সাফল্যে ঠিক ততেটাই উন্নাসিক ভাব দেখান অথবা মুখ ফিরিয়ে নেন, সমালোচনা করেন। অনেক আন্টিকে দেখতাম, নিজের ছেলে বা মেয়ের শত দোষ ঢাকলেও , ঠিকই অন্য ছেলে বা মেয়ের বেলায় সেই একই দোষ গলা চেঁচিয়ে বলছে।

কিন্তু মা কি সার্বজনীন মা হতে পারে না?

খালি বায়োলজিক্যাল জিন ধারণকারি সন্তানই নিজের সন্তান, অন্যের সন্তান নিজের না, তাই তার ক্ষতি করা যায়, তাকে মারা যায়, পেটানো যায়, খুন করা যায়, এই তত্ত্ব এলো কি করে?

বলা তো হয়, নারী মানেই মমতাময়ী? কিন্তু আজকাল যুগের মায়েরা কি পারছে সেই মমতাময়ীর ইমেজ ধারণ করতে? নাকি “নিজের নিজের” বলে মুখে ফেনা তুলে, নিজের লাভ করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি করে বসছে?

পৃথিবীর সব মায়ের প্রসব বেদনা একরকম, মা হওয়ার সুখ দুঃখ এক রকম, এই এক কাতারে সব মেয়েই এক। যদি একই হয়ে থাকে, তাহলে সেই অনুভূতিকে নিজের মধ্যে রেখে এক মা কি পারে না, সব সন্তানকে সমানভাবে আদর করতে, শাসন করতে?

পারিবারিক শিশু কর্মী নির্যাতনে সবচেয়ে এগিয়ে থাকে এই মায়েরাই। বাচ্চাকে আদর করে দুধ খাইয়ে, কাজের মেয়েকে দিচ্ছে খুন্তি ছেঁকা, মাতৃত্বের কী অসামান্য রূপ!

একটা মায়ের মধ্যে যদি সত্যিকার মাতৃত্বের বোধোদয় আসতো, তাহলে এই নির্যাতন কি করা সম্ভব হতো?

অনেক আগে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের এক লেখায় পড়েছিলাম, এরশাদের শাসনামলে মিছিলে যখন গুলি চালানো হল, তখন শোনা গেল, তোতন নামে এক ছেলে মারা গেছে। তোতনের মা-বাবা লাশ দেখতে এসে থানায় বসে আছে। মা চিৎকার করে কাঁদছেন, “তোতন রে, আমার বাপধন, বুকের মানিক, তুই চলে গেলি, আমি কাকে নিয়ে থাকব”। বাবা মাকে কলা পাউরুটি খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। লাশ এলো, বাবা দেখলেন, দেখে হাসিমুখে বললেন, “ওগো তোতনের মা, এ আমাদের তোতনের লাশ না, রাজুর লাশ”। রাজু তোতনের বন্ধু, একসঙ্গেই বেরিয়েছিল। জাস্ট এক সেকেন্ড লাশের দিকে চাইলেন মা, তারপর আবার সেই কান্না “ রাজুরে, আমার সোনা মানিক, তুই চলে গেলি বাপ”। লেখক বলেছিলেন “এমন মা কি গোর্কি দেখেছেন ?”

আজ আমারও বলতে ইচ্ছে করে, এমন মা কবে হবে, যে সবার মমতাময়ী মা থাকবে! কারও জন্য দানবী হয়ে আসবে না!

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.