আধমানুষের জীবন (প্রথম পর্ব)

Cage 2শারমিন শামস: ১ তিন তিনটে বোনের পর আবারো মেয়ে হলো বলে, ডাক্তার গেল খেপে। অবাক কাণ্ড, মেয়ের বাপ- মা খুশীতে আত্মহারা। বাপ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন নাম। মানে মনে মনে তিনি আরো একটা মেয়েই চাইছিলেন আর কি। এমন তো কেবল বুদ্ধদেবের উপন্যাসেই ঘটে। বাস্তবে কী হয়?

বাস্তবের ডাক্তার খেপে লাল। ‘হালার মাইয়া পোয়া!’ এই বাক্যবাণই প্রথম ঢুকলো শিশুর কানে। বলে অলিভ অয়েল দিয়ে ডলতে ডলতে শিশুকে ছুঁড়ে দিলেন মায়ের কোলে। মা দ্যাখে, মেয়ের ঘন কালো চুল। বাবা বলেন, আমার মেয়ে। ডায়েরিতে লেখেন, ‘ফোর্থ ডটার বোর্ন অ্যাট সিক্স থার্টি এএম।’ তো মেয়ের গায়ের রং শ্যামলা। নাক বোঁচা। এই নিয়েও মাথা ব্যথা নাই মা বাপের। তবে প্রতিবেশির আছে। আত্মীয় পরিজনের আছে। তার উপরে চার নম্বর। ভাই নেই।

এরকম ভাই নেই, শুধু বোনের সংসারে তার জন্ম। বাংলাদেশের কোটি কোটি মেয়ের মতো, কালো রং আর সাদামাটা চেহারা নিয়ে। ভাগ্যবান বলে তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হয়নি, ছুঁড়ে ফেলা হয়নি। বরং একটা সুন্দর নাম জুটেছে, ভালোবাসা পেয়েছে সে। ভাগ্যবতী। ভাগ্যবতী মেয়ে। তো সেই ডাক্তার আরো বিশ বছর পর মন্ত্রী হয়েছিলেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী! ভাঁড়ের দেশে এ সম্ভব!

জন্ম তো হলো। সে জন্মের সময়ের গল্প এটুকুই। তারপর যেটুকু মনে পড়ে, সবটাই মেয়েমানুষ হয়ে ওঠার গল্প। শুধু জন্মালেই হয় না। জন্মালেই মানুষ নয়। জন্মানোর পর তো আরো নয়। বছর দশ-বিশ-ত্রিশ-পঞ্চাশ বছর পরও নয়। মেয়েমানুষের জন্ম কোন জন্মই নয়। জীবন বলতে যা আছে তা শত সহস্ত্র ফিকে রঙা গল্পের সমষ্টি। সেইসব গল্প বলতে শুরু করেছি। ঠিক মিলে যাবে লাখ লাখ কোটি অযুত নিযুত মেয়ের সঙ্গে।

Moonmoon
শারমিন শামস

তবে নতুন আর কি? নতুন কিচ্ছু নয়। সবই পুরোনো। তবু বারবার বলতে ইচ্ছে করছে গলা ফাটিয়ে। আস্তে ধীরে দ্রুত মধ্যম লয়ে। যেভাবে আমার ইচ্ছে। বুকের ভিতরে দলা দলা ঢেউ, সেই ঢেউকে প্রবোধ দেবার সাধ্য থাকে কি সবসময়? গল্পগুলো গল্পই ছিল। কিন্তু সেই যে আমার রাশ রাশ ভাবনা, আমার বুকের ভিতরে বয়ে নিয়ে চলা অন্তহীন জিজ্ঞাসারাশি, আমার চেতন অবচেতন, আমার সঙ্গতি অসঙ্গতির বোধ? তাকে যে আটকে রাখি, তারো তো মুক্তি পেতে ইচ্ছে করে, নাকি? আর আমার পরিবেশ প্রতিবেশ, এর ভিতরে, এর বাইরে, অন্যরকমে, কত শত সহস্র মেয়ের সাথে, নারীর সাথে, বৃদ্ধার সাথে দেখা হলো এই জীবনে। জীবন যেখানে সবার আগে মেয়েমানুষের জীবন হয়ে উঠেছে, আর কিছু নয়, তারাও তো বসে আছে মাথার ভিতরে ডালপালা ছড়িয়ে- কত চিন্তা, কত যুক্তি, আবেগ, বাস্তবতার ঘা খেয়ে খেয়ে তাদের জীবন চলার পথ, কাহিনী তৈরি হয়েছে। এই সবই বলতে চাই আমি। ওলো সই, আমার এত কিছু বলার আছে? ভেবে অবাক হই!

বহু মেয়ে বলে শুনি, ‘পরের জন্মে যেন পুরুষ হয়ে জন্মাই’। আমিও ভেবে দেখেছি, আমারো এমন ইচ্ছে জাগে কিনা! এ জন্ম কিংবা পরের জন্মে, পুরুষ যদি হতাম কিংবা হই, কী পেতাম? আমি জানিনা। তবে এ জন্মে পুরুষ নই বলে পাওয়া না পাওয়ার এক বিশাল বস্তা টেনে টেনে চলেছি জন্মাবধি। কিন্তু সত্যি কখনো ইচ্ছে জাগেনি, পুরুষ হবার। আমি পুরুষ হতে চাইনা পরজন্মে। এ জন্মে যদি পুরুষ হতাম, তবে নিশ্চিত, পরজন্ম, তারো পরের জন্ম এবং জন্ম জন্মান্তর জুড়ে আমি শুধু পুরুষই হতে চাইতাম। ক্ষমতার স্বাদ একবার যে পায়, সে কি গদি ছাড়তে চায়? আমি জন্মেছি এক সাদামাটা কালোমালো নিতান্ত সাধারণ মেয়ে হয়ে, এই বঙ্গদেশে। ক্ষমতায় বড় ভয় আমার। আমি স্বার্থপর কৌশলে ক্ষমতা ধরে রেখে দিনের পর দিন মাঠাটা, আমটা, মুড়োটা গিলতে পারবো না বোধ করি। আমার হয়তো লজ্জা লজ্জা করবে। আমার হয়তো খারাপ লাগবে। তাই পুরুষ হবার যোগ্যতাই নেই আমার। তাই চাই না। তবু একান্তই পরেরবার যদি হয় পুরুষজন্ম, তবে আমি হলফ করে বলতে পারি, কুণ্ঠায় জড়োসরো হয়ে থাকতে হবে আমাকে। কারণ, গতজন্মে নারী ছিলাম বলে, আমি তো খুব ভালো জানি, সব নারীর চোখে পুরুষের স্বার্থপর, কৌশলী, আয়েশী, ভোগী আর সুবিধাবাদী রূপটা ক্যামন প্রকট হয়ে আছে। এইসব ছাপিয়ে পুরুষ কখনো কখনো আরো বীভৎস, অত্যাচারী, স্বৈরাচারী আর লোভী।

প্রেমিক পুরুষ, মমতাময় পুরুষ, সার্থক সফল পুরুষ, ভালোমানুষ পুরুষ, সৎ পুরুষ, নিষ্ঠাবান পুরুষের ভিতরেও, প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে ঘাপটি মেরে আছে আপাদমস্তক এমন এক মানুষ, সমাজ আর রাষ্ট্রের কাঠামোর ভিতর থেকে নিজের জন্য দুধের সরটুকু তুলে নিয়ে নারীর জন্য শূণ্য পাত্র ছুঁড়ে ফেলাই যার অভ্যাস, যার চেতনা, যার দর্শন। এই বঙ্গদেশে অন্তত নারীর চোখে পুরুষের সংজ্ঞা এটাই। যে জানে, জানে। যে মানে না, মনে মনে, সেও ঠিক মানে।

শহরে আজ বেদম বৃষ্টি। আজ আমার মন ভালো নাই। শহুরে পথগুলো দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে যদি পৌঁছে যাই সবজেরঙা আরো গভীর কোন পথের গোপনে, তবে সুখী হতে পারি, অন্তত আজ। এই শহরে এমন কোন পার্ক নেই যেখানে এই বৃষ্টিভেজা মনভাঙ্গা বিকেলবেলায় আমি দু’দন্ড জিরোতে পারি একা। পা ছড়িয়ে বসে চা খেতে খেতে খেতে গাইতে পারি গান। এই শহর মেয়েমানুষের নয়। এই দেশ মেয়েমানুষের নয়। এই সমাজ মেয়েমানুষের নয়। এই বৃষ্টি ঘরে তাকে খিঁচুরি রাঁধতে ঠেলে, বেগুন আর ইলিশ ভাজতে বলে, দৌড়ে গিয়ে কাপড় তুলতে বলে, কাঁথামুড়ি দিয়ে সন্তানকে জড়িয়ে ধরতে বলে, স্বামীকে আল্হাদ দিতে বলে। বৃষ্টি মানে মেয়েমানুষের দৌড় জানালা অব্দি। ওপারে ঘন সবুজে গাঢ় বৃষ্টির দাপাদাপি দেখে জানালা বন্ধ করা- “জোলো বাতাসে ‘ও’র ঠান্ডা লাগে খুব”- এইসব বাক্যবিনিময়ে কেটে যায় বৃষ্টিক্লান্ত দিন।

আর যদি কখনো সে সব ভুলে গিয়ে দাঁড়ায় ছাদেতে, লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে আসে প্রবল পানিতে, জোড়া জোড়া চোখ তাকে গিলে গিলে খায়, আশেপাশে ছাদগুলো সচকিত, ‘বেহায়া মহিলা, ওড়না কোথায় এর? বুক দেখিয়ে ভিজছে ক্যামন! ছ্যা ছ্যা ছ্যা!’

বলে আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, পলক পড়ে না। দেখে দেখে বীর্যপাত হয়! এই শহর এই বৃষ্টি মেয়েমানুষকে আরো মেয়েমানুষ বানায়। তার মাথায় কোষে কোষে নতুন করে ঢেউ তোলে- মেয়েমানুষের বৃষ্টি মানে ঘরে থাকা, খিঁচুরি রান্না আর জানালা বন্ধ করা। মেয়েমানুষের বৃষ্টি মানে রিকশায় জড়োসরো, রিকশায় হুড তুলে ময়লা প্লাষ্টিকের কাভারে নিজেকে ঢেকেঢুকে ঘরে ফেরা, ভেজা ভেজা ওড়নায় সর্বাঙ্গ প্রাণপনে ঢেকে নিজেকে ভালো মেয়ে প্রমাণ করতে করতে ঘরে ঢোকা। বুকের ভিতরে যত মেঘ ডাকুক, যত জল পড়ে পড়ুক, যতই পাতা নড়ুক, বৃষ্টি মানে ঘরবন্দি মেয়েমানুষের ঘেমো ঘেমো কান্না!

(চলবে)

(অন্যদেশ থেকে নেয়া)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.