গর্ব ও গৌরবের ইতিবৃত্ত: পুরুষত্বের স্যাটায়ারিক স্বীকারোক্তি  

Dress 1নাহিদ শামস্‌ ইমু: আমি একজন ছেলে। জাতে পুরুষ। এবং ছেলে হয়ে জন্মগ্রহণ করে আমি ভীষণ ভাগ্যবান অনুভব করছি। আমি যদি মেয়ে হয়ে জন্ম নিতাম, তাহলে যে কত প্রকারের ঝামেলা পোহাতে হতো তা কি আর বলতে?

আমার পোশাক-আষাক নিয়ে নানারকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হতো। আমি কেন এই পোশাক পরলাম, আমি কেন ওই পোশাক পরলাম না, আমি কেন হ্যান পরেছি, আমি কেন ত্যান পরেছি, আমার এই পোশাকখানা কতখানি শ্লীল ছিলো, এবং কতখানি অশ্লীল ছিলো- তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হতো। আমি হিজাব পরি না কেন- এসব নিয়ে সমালোচনা হতো।

কিন্তু এই যে আমি ছেলে হয়ে এখন টুপি পরি না, পাগড়ি পরি না, পাঞ্জাবি কিংবা জোব্বা পরি না- এতে কিন্তু কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। ব্যাপারটি উপভোগ্য। তাই না?

পোশাক নির্বাচনে আমাকে সর্বদা বাঙ্গালিয়ানা কিংবা ধর্ম এই দু’টির যেকোন একটি কিংবা উভয়টিই মাথায় রাখতে হতো। কিন্তু এই যে আমি পুরুষ হয়ে জন্মেছি, আমাকে কিন্তু এসব নিয়ে একেবারেই ভাবতে হয় না! আমি ক্যাজুয়াল শার্ট পরি, ফরম্যাল পরি, টি শার্ট পরি, জিন্স পরি, গেঞ্জি পরি, ফতুয়া পরি। আই হ্যাভ ভ্যারাইটিজ অফ অপশন্স।

রিমেম্বার গাইজ, টি-শার্ট-গেঞ্জি-জিন্স এসবগুলো কিন্তু এক্কেবারে খাঁটি ইসলামিক ড্রেস আপ এবং একইসঙ্গে খাঁটি বাঙালি ড্রেস আপ! যুগের পর যুগ সেই আবহমান কাল ধরে বাঙালি পুরুষেরা ঘরে ঘরে জিন্স পরে এসেছে, টি-শার্ট পরে এসেছে। আমার বাপ-দাদারাও জিন্স পরত, টি-শার্ট পরত। হ্যা? পরতো না?

সে কী! আমার বর্ণনায় কি ভুল আছে? চুপ থাকো বেয়াদপ! পুরুষের পোশাক সবসময় রীতিসিদ্ধ। বাঙ্গালিয়ানা নিয়ে ভাবার দরকার পড়ে না! বোঝা গেছে? আই ক্যান ইম্পোর্ট এনি ড্রেসকোড ফ্রম এনি কান্ট্রি!

আমি ফ্যাশনবেলও হতে পারি। পুরুষের ফ্যাশন নিয়ে সমাজের মানুষের চুল ছিঁড়তে হয় না। এই যেমন, ইচ্ছে করলেই শার্টের একটা-দু’টো-তিনটে বোতাম খোলা রাখতে পারি! ইটস সো কুল ডুড! ছেলেরা বুকের পশম দেখাতে ভালোবাসে। চাইলে সবগুলো বোতামও খোলা রাখতে পারে। থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরে হাঁটতে পারে, পা দেখাতে পারে, হাঁটু দেখাইতে পারে। আমাদের ফ্যাকাল্টির ছেলেরা পাতলা ট্রাউজার পরে ক্লাস করতে যেতো। অ্যান্ড নোবডি কেয়ারস্‌।

Dress 2ট্রেন্ডি হওয়া আমার জন্য বৈধ। নতুন ধরণের পোশাক আমার জন্য স্মার্টনেস। নারী হলে ট্রেন্ডি কিংবা স্মার্ট হওয়াটা আমার জন্য অশ্লীল হিসেবে ঘোষিত হত। পুরুষ হিসেবে আমার পোশাকের যেকোন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত হবে। এই যেমন তালি দেয়া জিন্স, ছেঁড়া জিন্স, টাইট জিন্স ইত্যাদি। টাইট জিন্স খুব আঁট-সাঁট হয়ে শরীরের সাথে লেগে থাকে, পশ্চাৎদেশের অস্তিত্ব বিষদভাবে প্রতীয়মান হয়!

কখনো শুনেছেন টাইট জিন্সকে আপত্তিকর পোশাক হিসেবে আখ্যা দিয়ে কোন ফ্যান পেজে পোস্ট হয়েছে? শুনবেনও না। ছেলেরা চাইলে প্যান্ট যতখুশি তত নিচে পরতে পারে, পশ্চাৎদেশের উপরিভাগ দৃশ্যমান করে তুলতে পারে।

ছেলেদের পশ্চাৎদেশ আছে, এটা দেখাতে কোনো অসুবিধে নেই। তাতে ‘গেলো গেলো, সমাজ গেলো’- জাতীয় রব ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। ও হ্যা, আরেকটা ব্যাপার কি জানেন? এই যে ছেলেরা শার্টের তিনটা বোতাম খোলা রাখে, টাইট ফিটিং শার্ট-প্যান্ট পরে, গ্রহণযোগ্যতার সীমার অনেক নিচে প্যান্ট পরিধান করে- এসবগুলোর কোনটাই কিন্তু তারা মেয়েদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য করে না! এগুলো ছেলেরা এমনি এমনিই করে! মানে, এমনি এমনিই করে!

কিন্তু আমি মেয়ে হয়ে জন্ম নিলে একটু আলাদা কিছু পরতে গেলেই কি বলা হতো জানেন? বলা হতো, আমি ছেলেদের আকৃষ্ট করবার জন্য এবং তাদের প্রলুব্ধ করবার জন্যই এসব পরছি! এবং যেহেতু ছেলেদেরকে প্রলুব্ধ করবার জন্যই এসব পোশাক পরছি বলে ধরে নেয়া হত, কাজেই ইভটিজিং, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি এসব কিছু বৈধ হয়ে যেতো! যাক গে সেসব।

একটা কথা বলে শেষ করি। ছেলেদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে মেয়েদের পোশাক-আশাক নিয়ে চিন্তিত হওয়া। মেয়েদের জন্য কোনটা ভালো এবং কোনটা মন্দ সেটা ছেলে হিসেবে আমাদেরকেই ঠিক করে দিতে হবে। বিকজ উই আর দি গার্ডিয়ান অফ দিস ওয়ার্ল্ড। আমি একজন ছেলে। জাতে পুরুষ!

অ্যান্ড আই ফিল লাইক এ কিং…

শেয়ার করুন:
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.