‘নির্বাসিত’ উবাচ: ফিরে দেখা ১৪ই আগস্ট

nirbashito-650_650x400_61430505595সারিতা আহমেদ: ১৪ আগস্ট। আমাদের (ভারতের) স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে একটি সিনেমা আছড়ে পড়লো কলকাতায়। সুনামির ন্যায় তুমুল হিল্লোল তুললো চায়ের কাপ থেকে কেরানির টেবিলে। এতো শুধু সিনেমা নয়; বাক স্বাধীনতা, কলমের স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি মস্তিষ্কের স্বাধীনতার পক্ষে এক সেলুলয়েড সওয়াল।

হ্যাঁ, এটি তসলিমা নাসরিনের বায়োপিক নয়।
কিন্তু তসলিমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়– বঙ্গভূমি থেকে দ্বিতীয়বার নির্বাসনের যন্ত্রণা, পুষ্যি বিড়াল ‘মিনু’র (সিনেমায় ‘বাঘিনী’) সাথে বিচ্ছেদ এসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে চূর্ণী গাঙ্গুলির অসাধারণ মুন্সিয়ানায় এমনভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ‘নির্বাসিত’ ছবিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত , যে, কেউ বলবে না এটি ওনার প্রথম পরিচালিত ছবি।

যখন কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে তসলিমা একটি ডেড-ইস্যু , কেউ রা -কাড়ে না এই একটা নাম নিয়ে, কেউ ঊনার হয়ে একটা কথা বলে না, জানতেও চায় না কেমন আছেন উনি, ঠিক সেরম সময়ে চূর্ণীদি এমন একটা পাথ ব্রেকিং ছবি উপহার দিলেন কলকাতা তথা বঙ্গবাসীকে।

অসংখ্য অভিনন্দন ও কুর্নিশ টিম নির্বাসিতকে। আমি সেই মুষ্টিমেয় ভাগ্যবানদের একজন যে ছবির প্রিমিয়ার শোতে থাকার সুযোগ পেয়েছিল।
১৪ই আগস্ট সন্ধ্যে ৭ টায় প্রিয়া সিনেমায় চাঁদের হাটে রীতিমত কুন্ঠিত লাগছিল। অভ্যেস নেই তো সেলেব ফিভারে আছন্ন হতে।
পর্দা ওঠার আগে ছবির পটভূমিকা খুব সুন্দরভাবে চূর্ণীদি ব্যাখ্যা করলেন পুরো টিমের সাথে। তসলিমা নাসরিনের ওপর ঘটা অন্যায়গুলো যতটা সম্ভব গুছিয়ে উনি ব্যাখ্যা করলেন, প্রেক্ষাপট তো ওটাই। সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল।
কাস্টিং এর সাথে ২০০৭ এর সেই কালো দিনের টুকরো ছবির কোলাজে খুব দ্রুত বলা হলো গল্পের প্রেক্ষাপট। সত্যি বলতে এতো দ্রুত হলো, মন ভরেনি।
তবে গল্প যত এগিয়েছে মুগ্ধতা তত ছড়িয়েছে ।

Churni n Sarita
চূর্ণী গাঙ্গুলির সাথে লেখক

একটা দৃশ্য যেখানে হঠাৎ লেখিকাকে চাদরচাপা দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আধখোলা চাদরের ফাঁক থেকে প্রিয় বাঘিনীর দিশেহারা চাহনী দেখতে দেখতে, খাবারের বাটিটা ওইভাবেই পড়ে থাকা দেখতে দেখতে … আর কী থেকে কী হয়ে গেল এটা বুঝতে বুঝতেই গাড়িতে তুলে নেওয়া হলো লেখিকাকে — ভীষণ নাড়া দেয়।

অথবা সেই দৃশ্য- সুইডেনে সেই রিপোর্টার যিনি লেখিকার সাথে দেখা করে জানাচ্ছেন তিনি বাংলাদেশে ওনার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করে এসেছেন । তাঁরা ওনার হাত ধরে নানা কথা বলেছে … এইটা শুনে রিপোর্টারের হাতদুটো চেপে ধরে লেখিকা গালে ছোঁয়ালেন, চুমু খেলেন … মনে মনে কল্পনা করলেন এই হাত তো রিপোর্টারের নয়, এ তার বাবা-মায়ের স্পর্শ, তাঁর দেশের স্পর্শ, মাটির গন্ধ মাখা ওই পরশখানি হৃদয় ছুঁয়ে দেয়, আর অজান্তেই কখন গলা বুঁজে আসে।

বাঘিনীর কথা আর কী বলি, অসাধারণ অভিনয়। তবু বলবো, সোনি হয়তো মিনুর চেয়েও বেশি কিউট, কিন্তু মিনুর মত স্মার্ট না, খুব প্যাম্পার্ড আর কিউটি পাই। সবচেয়ে নিখুঁতভাবে ও নিজের যন্ত্রণা আর দিশেহারা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছে। টিভিতে মায়ের কণ্ঠস্বর শুনে পাগলের মত ইতিউতি লেখিকা মাকে খুঁজে বেড়ানো …বা তাকে ঘিরে শাশ্বত-রাইমার চাপা টেনশন/ঝগড়ার সময়ে খুব অসহায়ভাবে ভয় পেয়ে খাঁচায় গিয়ে লুকানো …এগুলো স্নায়ুর উপর ভীষণ চাপ ফেলছিল।
তবে বেশ কিছু মজার দৃশ্য ওকে ঘিরে রয়েছে , যা সিনেমার টানটান উত্তেজনা আর কষ্টের পরতগুলোয় হাল্কা প্রলেপের কাজ করে।

Chrny
তসলিমা নাসরিনের সাথে চূর্ণী গাঙ্গুলি

চূর্ণী গাঙ্গুলি যে একজন অসাধারণ অভিনেত্রী তা নতুন করে বলার কিছু নেই।
তসলিমাদির বাড়িতে ঊনি ছবির মেকিং এর সময় যখন গিয়েছিলেন, তখন খুব নিখুঁতভাবে স্টাডি করেছেন দিদিকে। তসলিমার কিবোর্ডে টাইপ করার ভঙ্গি, মিনুকে খেতে দেওয়ার ভঙ্গি এবং আরো নানা কিছু। সিনেমায়, আমরা যারা কাছ থেকে দিদিকে দেখেছি, ভীষণভাবে মেলাতে পারছিলাম দু’জনকে। এখানেই তসলিমা আর চূর্ণী কোথাও যেন মিলেমিশে গিয়েছিল।

যে দৃশ্যতে, শেষের দিকে লেখিকা একটা বাচ্চা ডেলিভারি করেন, আর গিফট হিসেবে প্রাপ্য অন্য বিড়ালের বাচ্চাকে দেখে বলেন , “আমি বাঘিনীকে মিস করছি , কেউ ওর স্থান নিতে পারবে না। তোমরা বরং একে ফিরিয়ে নিয়ে যাও তার মায়ের কাছে। মা এবং বাচ্চার সেপারেশনের কষ্ট আমি বুঝি ।” — এই জায়গায় খুব খুব দরদ দিয়ে চূর্ণীদি অভিনয়টা করেছে।

এছাড়া বন্দুক আর গিটারের সহাবস্থান একটা ফারসিক্যাল মেটাফরের পরশ দেয়।
আর প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ পত্রের উত্তরে ‘ ফুড ! ‘ একটা অসাধারণ Antithesis, at same time Oxymoron too । সত্যিই তো মানুষের সমস্ত জৌলুস, সমস্ত খ্যাতির চেয়েও কখনো কখনো বড্ড নির্মম হয়ে ওঠে আমাদের বেসিক নিডগুলো … খাদ্য তার মধ্যে অন্যতম। পেটে যার খিদে, তার কাছে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি কি সত্যিই কোনো মূল্য পায় ?

সুইডেন ও বাল্টিক সাগরের সেই অজানা দ্বীপের তীব্র শীতে, তীব্র একাকিত্বে, তীব্র মানসিক প্যারালাইজড অবস্থায় লেখিকার একছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়া, বেঞ্চে বসে পড়ে সিগারেট ধরানোর আকুল চেষ্টায়…… যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রক্ষাগৃহের অন্ধকারে উষ্ণ কান্না নামছিল গাল বেয়ে, আমি অনুভব করছিলাম এর চেয়ে আরো কত বেশি, কত তীব্র যন্ত্রণার চাবুক সয়েছেন আমার প্রাণপ্রতিমা তসলিমাদি ।

আর কত কী বলবো !
এ ছবি না দেখলে, এই সময়ের একটা শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক মানের বাংলা ছবির রসাস্বাদন থেকে বঞ্চিত হবেন ।
এতো শুধু সিনেমা নয় , অনেক না বলা প্রতিবাদ , অনেকের না করা প্রতিবাদ , অনেকের চুপ করে সয়ে যাওয়া অন্যায়ের উপর এক তীব্র কষাঘাত। যা চুর্ণী গাঙ্গুলি ও তাঁর টিমের অসাধারণ পারদর্শিতায় দৃশ্যমান হয়েছে।
আর আলাদা করে বলতে হয় শাশ্বত’র কথা । ‘বন্ধু’ শব্দের মানে কী, তা ওনার অভিনয় আর চরিত্রের বুনট দেখেই বোঝা যায় ।

গল্পের বুনট এমন সুন্দর করে গেঁথেছেন চূর্ণী, যে, কোনও দৃশ্য কোনও অভিব্যক্তি কোথাও ফাঁক থাকেনি। চূর্ণীর চোখের কোলে কালো আঁধারে তসলিমার যন্ত্রণার ছায়া যে কেউ অনুভব করতে পারবে ।

তবে ‘সোনার বাংলা’ গানটি ছবিতে অনুপস্থিত। জানি না শুধুমাত্র ট্রেলরের জন্যই ওটা রেকর্ড করা হয়েছিল কিনা। এছাড়া আরো কিছু টাচি দৃশ্য বাদ পড়েছিল।
ছবিতে অনেকগুলো কবিতা আছে, যদি সেগুলো তসলিমার নিজের কণ্ঠে আবৃত্তি আকারে দেওয়া হতো, তাহলে আরেক মাত্রা পেত ছবির আবেদন।

এই সব টুকটাক বাদ দিলে ওভারঅল ছবিটা দুর্ধর্ষ হয়েছে। জাতীয় পুরস্কার কী আর এমনি এমনি পেয়েছে?
গল্পের বুননটা এত মজবুত হয়েছে যে দর্শক কিছুতেই শেষ অবধি না দেখে উঠবে না।
শেষে যখন ‘ আমি ফিরব ‘ কবিতার শেষ লাইনে… ”যদি মানুষ হয়ে না পারি, পাখি হয়েও ফিরব একদিন ” বলার সাথে সাথে সমাপ্তি হলো, তখন সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিল।
I was thrilled and overjoyed .
চোখের জল বাঁধ মানছিল না ।

সেই মূহূর্তে খুব ইচ্ছে করছিল চূর্নীদিকে জড়িয়ে ধরতে, হয়তো ওইভাবে দিদিকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছেটা পূর্ণ হতো।
একবার জাস্ট চূর্নীদির হাত ধরে বলা, ”অনেক ধন্যবাদ এরম একটা ছকভাঙ্গা সিনেমা বানানোর জন্য। যখন কেউ তসলিমাদির ব্যাপারে কথা বলছে না, বলতে চাইছে না, ঠিক সেই সময়ে তুমি এরম একটা ফিল্ম আমাদের গিফট করলে – এজন্য A Big Thank you ”
এরম গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। শুধু ”থ্যাঙ্কস আ লট ” বলতে পেরেছিলাম … গলাটা বুঁজে এসেছিল …কে জানে কেন !

পরের দিন ভোরের ট্রেন ধরবো বলে ট্যাক্সি নিয়ে ছুটছিলাম যখন, রডন স্ট্রিটের সেই ৭ নং বাড়িটার পাশ দিয়েই গেলাম, আর মনে পড়লো সেই অমোঘ উচ্চারণ… ‘বাড়িটা, তুই আছিস কেমন …?’

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.