জামিনেই কি স্বস্তি?

0

probir sikderসুমন্দভাষিণী: সিনিয়র সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে অবশেষে চাপের মুখে জামিন দিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনদিনের রিমান্ড শেষ না হতেই জামিন মঞ্জুর হয়েছে, যেখানে বিরোধী পক্ষের আইনজীবীরা কোনরকম বিরোধিতাই করেনি। মামলা যেমন হয়েছিল ‘নেতার’ নির্দেশে ‘নেতা’র অনুসারীকে দিয়ে, তাহলে কী বুঝবো যে ‘নেতা’র নির্দেশেই জামিন হয়ে গেছে?

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এ কোন নেতা, যার ক্ষমতা মসনদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছায়? বাঁশের চেয়ে কোন কঞ্চি বড় হলো? কেন হলো? কবে হলো? তবে এ যাত্রায় প্রবীর সিকদারের জামিন না হলেও তো রক্ষে ছিল না। মসনদ পর্যন্ত কেঁপে যেত, আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি।

পুরো প্রক্রিয়াটা যদি দেখি আমরা, তাহলে বুঝবো, কতটা চাপ ছিল তাঁকে গ্রেপ্তারে এবং কতটা চাপের মুখে শেষপর্যন্ত নতি স্বীকার করতে হয়েছে যে রিমান্ডে না নিয়েই জামিন দিতে বাধ্য হয়েছে। আইনের ফাঁকফোকরগুলো আমাদের সাধারণের জন্যে বোধগম্য নয় একেবারেই।

যেমনটি বলছিলেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘তার মামলাটি করার পর থেকে আটকের প্রক্রিয়া- কোনওটাই সঠিকভাবে মানা হয়নি। আমি আগেও বলেছি ফৌজদারি মামলা করতে পারেন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি। দেওয়ানি মামলার মতো প্রতিনিধিত্বমূলক (রিপ্রেজেন্টেটিভ) ফৌজদারি মামলা হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন ব্যক্তি যাদের বিষয়ে হুমকি বোধ করছেন তাদের বিষয়ে তদন্ত না করে অভিযোগকারী সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে আটক করাটা ‍খুবই হাস্যকর। যে ব্যক্তির অবস্থান স্পষ্ট, তিনি নিজের জীবনের হুমকি বোধ করছেন, তাকে ধরে নিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ কী জানতে চাইতো এবং সেটা তিনদিন মঞ্জুর হওয়ার পর একবেলোয় কিভাবে সেটা শেষ হলো এ ধরনের আচরণের জন্য পুলিশের জবাবদিহিতার দরকার আছে। পুরো বিষয়টিতেই একধরনের স্বেচ্ছাচারিতা লক্ষ্য করা গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফৌজদারি আইন ব্যবস্থারই আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এই আইন না পারছে সাধারণ মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে, না পারছে মিথ্যা হয়রানি থেকে বাঁচাতে। মামলা হওয়ার আগে সাধারণ মানুষের কোনও না কোনও রক্ষাকবচ থাকা উচিত।’

জামিনেই কি শেষ হয়ে যাবে দেশজুড়ে দানা বেঁধে উঠা ক্ষোভগুলো? নাকি শেষ হওয়া উচিত?

একাত্তরে শহীদ পরিবারের সন্তান প্রবীর সিকদার রাজাকারদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে গিয়ে ২০০১ সালে বোমার আঘাতে নিজের একটা পা হারান, শরীরে তার অজস্র স্প্লিন্টার। সেই মানুষটাকে যখন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আক্রোশে চোর-ডাকাতের মতোন হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে নেয়া হয়, তখন শুধু একজন প্রবীর সিকদার অপমানিত হোন না অপমানিত হয় গোটা বাংলাদেশ। প্রবীর সিকদার জানিয়েছেন তাঁর ছেলে সুপ্রিয়কে যে, তাঁর ওপর নির্যাতন হয়েছে, চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কী জিজ্ঞাসা করলো পুলিশ?

ঊনি কি খুন করেছেন? উনি কি মাদক ব্যবসায়ী, নাকি অস্ত্র ব্যবসায়ী? ঊনি কি ভূমিদস্যু, দখলদার? ঊনি কী আসলে? তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কী পেয়েছে পুলিশ? জাতি জানতে চায়। ঊনাকে হাতকড়া পরানো হয়েছিল কেন? পালিয়ে যাবেন বলে? নাকি পুলিশের ওপর ওই এক পা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন ভয়ে? কোনটা?

একটা দেশ রে বাবা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে বলতে যারা মুখে তুবড়ি ছুটায়, তারাই দিনশেষে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির সাথে হাত মেলায়, আত্মীয়তা পাতায়। আমরা যারা সাধারণ মানুষ আছি, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, আদর্শ যদি বলেন, এখানেই কিছুটা পাওয়া গেলেও যেতে পারে। এই শ্রেণীটাতেই এখনও অনেক মানুষ আছে, যাদের কেনা যায় না, যারা আপোস করে না বিত্ত-বৈভবের কাছে। প্রবীর সিকদার তাদেরই একজন।

তাইতো যখন কানাঘুষা চলছিল যে, ফরিদপুরের প্রভাবশালী মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, যিনি কিনা আবার প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই, তাঁর কাছে মি. সিকদারকে ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষমা চাইলেই সব মাফ হয়ে যাবে। কিন্তু তখনই মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, একাত্তরে চোখের সামনে চৌদ্দজনকে খুন হতে দেখা এই দেশপ্রেমিককে কেনা যাবে না, মাথা নত করানো যাবে না। আরেকটা পা হারানোর ভয় দেখালেও না। সত্যিই তাই হয়েছে। চোরের মতো রাতের অন্ধকারে তাঁকে আটক করলেও, দিনের আলোতে বীরদর্পে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে সরকার। নইলে প্রবীর সিকদারই হয়ে উঠতে পারতেন সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়া মোক্ষম অস্ত্র।

একেবারেই যে কিছু লাভ হয়নি, তা নয়। এই এক গ্রেপ্তারই সরকারকে ভীষণরকম বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়েছে। বেরিয়ে পড়েছে অনেক না বলা তথ্য। চোরে চোরে যে মাসতুতো ভাই পাতানো হয়েছে, সেটা আগে জানতো গুটিকয় মানুষ, এখন জানে বিশ্ববাসী। সবারই চক্ষু চড়ক গাছ। এ কী করে সম্ভব? মুক্তিযুদ্ধের মহান নায়কের কন্যা কি করে রাজাকারের সাথে আত্মীয়তা করতে পারলেন? আমার নিজেরও বিস্ময় এ নিয়ে। কী করে সম্ভব? তাহলে আদর্শ, নীতি সবই কি জলাঞ্জলি গেল?

সুতরাং আপাতত জামিন নিয়ে কিছুটা মানসিক স্বস্তি পেলেও সামাজিক অর্থে স্বস্তি আসেনি। আইসিটি আইন অনুযায়ী ৫৭ ধারার মতোন কালো ধারাটি বহাল আছে, যে কেউ, যেকোনো সময় এর ফাঁদে পড়তে পারি আমরা, তারপর পুলিশ ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে বসলো, তারও একটা বিহিত হওয়া চাই। কোন ক্ষমতাবলে পুলিশ এটা করতে পারে? এটা কী এমন অপরাধ যে, রিমান্ড চাইতে হবে?

আমার মনে হয়, আজ, নয়তো কাল, কিন্তু খুব শিগগিরই এর সমাধান চাইতে হবে এবং এটা করতে হবে এই আন্দোলনের পথ ধরেই। তবে অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিকের ভাষায় বলতেই হয় যে, ‘ঘটনা ৫৭ ধারাতে নয়, মূল ঘটনা রাষ্ট্রের নিপীড়নকারী মানসিকতায়। এই রাষ্ট্রে প্রবল প্রতাপশালীরা চাইলেই প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে দিতে পারে, সেটি ৫৭ ধারায় হবে নাকি অন্য কোনও ধারায় হবে সেটা তেমন বিবেচ্য নয়। এই দেশে হাস্যকর মামলা হয়, বড় বড় নেতাদের নামে মামলা হয় টিনের থালাবাসন চুরি কিংবা মোবাইল ফোন-ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাইয়ের, পুলিশ সেই মামলার আবার চার্জশিটও দেয়! সুতরাং ৫৭ ধারা না থাকলেও প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে মামলা হতোই।’

তারপরও বলবো, যতদিন এই ধারাটি বহাল থাকবে, ততদিন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাহত হবে, আরও অনেক প্রবীর সিকদার তখন আক্রান্ত হবেন এই ধারায়। আক্রান্ত হবেন না তারাই, যারা ক্ষমতার লঙ্ঘনকারী, যারা এই দেশটাকে নিজের বাপের সম্পত্তি মনে করে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.