প্রবীর সিকদারের হাতে হাতকড়া কেন?

0
Probir Sikdar

সংগৃহীত

সুমন্দভাষিণী: ছবিটি দেখুন, খুব ভালো করে দেখুন এবং আমার করা প্রশ্নের উত্তর যদি আপনার কাছে থাকে, তবে দিন। না, আমাকে উত্তর দিতে হবে না, নিজের বিবেকের কাছেই দিন, যদি এতোদিনেও সেই বিবেক আপনি বন্ধক রাখেননি কোথাও!

রাষ্ট্র আজ কার হাতে হাতকড়া পরায়? আর কার মাথায় ছাতা ধরে? কাকে জামাই আদরে রাখে, থুক্কু বলা ভালো, কাকে ‘বেয়াই’ আদরে রাখে! এইদেশে মুক্তিযুদ্ধ আজ ভাত পায় না, ভাত পায় বিরোধীরা। চিকন চালের ভাত পায়। খেয়ে খেয়ে একেকজন নাদুস-নুদুস হয়ে উঠেছে। এরা খাবে সবাইকে একদিন। কেউ বাদ যাবে না।

চুরি না, ডাকাতি না, খুন না, ধর্ষণ না, দুর্নীতি না, রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কোনো কাজ না করেই আজ সিনিয়র সাংবাদিক, শহীদ সন্তান প্রবীর সিকদার কারাগারে। তাঁর হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে মানুষটা একাত্তর শিশু অবস্থায় চোখের সামনে পরিবারের দেড় ডজন সদস্যকে খুন হতে দেখেছিলেন, যে মানুষটা বড় হয়ে, একজন সৎ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, যে মানুষটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, একাত্তরে রাজাকারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বোমায় একটি পা হারিয়েছেন, শরীরে অসংখ্য বোমার স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন, সেই ব্যক্তির হাতে আজ হাতকড়া। যে মানুষটা এক পা নিয়ে, আরেকটা ক্র্যাচে ভর করে হাঁটেন, তিনি কি দৌড়ে পালিয়ে যেতেন! তাঁকে একজন চোর-ডাকাতের সম্মান দিতে হবে কেন? আমাদের বড় ভাগ্য যে, গোয়েন্দা পুলিশ তাঁর সামনে কতগুলো ফেনসিডিলের বোতল রেখে বলেননি, তাঁকে গ্রেপ্তারের সময় এগুলো তাঁর অফিস থেকে উদ্ধার করা হয়। তাহলে শতভাগ পূর্ণ হতো আমাদের নাটকের।

যে প্রবীর সিকদার একাত্তরে ১৪জনকে হারিয়েছেন পরিবারের, তাঁর দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও হারিয়েছেন পরিবারের সবাইকে (যদিও একাত্তরে নয়)। তাহলে দু:খবোধটা একজনের ক্ষেত্রে বেশি, আরেকজনের ক্ষেত্রে কম হবে কেন? স্বজন হারানোর কষ্টের রং কি একইরকম নয়? প্রবীর সিকদাররা তাহলে এইদেশে অতি সাধারণ, দুবেলা খেয়ে-পরে থাকেন কেন? তাঁরও তো অট্টালিকায় থাকার কথা। তাঁকেও তো রাষ্ট্রীয়ভাবেই পুনর্বাসিত হওয়ার কথা! ঢাকায় বাড়ি পাওয়ার কথা সরকার থেকেই। কেন তিনি সেটা পাননা? কেন তাঁকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় তাঁকে এই স্বাধীন দেশে?

প্রধানমন্ত্রী পঁচাত্তরে হারিয়েছেন সবাইকে, আর প্রবীর সিকদার হারিয়েছিলেন তারও আগে, একাত্তরে। প্রধানমন্ত্রীর পিতাও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কারণে, রাষ্ট্র নায়ক হওয়ার কারণে সেদিন এতিম হলেও তাঁর মাথার উপর থেকে আশ্রয় সরেনি। কিন্তু সাধারণের ঘরে জন্ম নেয়া এতিম প্রবীর সিকদার জীবনের বেঁচে যাওয়া সময়টুকু কিভাবে পাড়ি দিয়েছেন, তা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না। প্রধানমন্ত্রীও গ্রেনেড হামলার শিকার হয়েছেন, প্রতিনিয়ত তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন, প্রবীর সিকদারও তাই। তিনি বোমা হামলায় পা পর্যন্ত হারিয়েছেন। শরীরে তাঁর অসংখ্য স্প্লিন্টার। তাঁর ধন নেই, তাই মানও নেই। কোনরকমে সংসারটাকে টেনেটুনে চালিয়ে যাচ্ছেন।

এতোক্ষণ অনেক মিলের বা সাদৃশ্যের কথা বললাম। এবার পার্থক্যটা বলি। প্রবীর সিকদার এক্ষেত্রে মহান। তাঁর রক্তে আপোস আছে, আবার নেইও। তাঁর আপোস বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের সাথে। তিনি বিনাবাক্যে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের সব অন্যায়-অত্যাচার দিনের পর দিন মেনে নিয়েছেন, শুধু কি তাই, তিনি তা সমর্থনও করেছেন। কোনদিন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধ তাঁকে সোচ্চার হতে দেখিনি। ভুলটা এখানেই। তিনি যে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেন, সেটা ছিল বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ। যা এখন আর নেই। এই আওয়ামী লীগে কোনো নীতি নেই, আদর্শ নেই, রাজাকারে সয়লাব। এখানে চলছে টাকার খেলা। যত খুনি, অপরাধীই হোক না কেন, টাকা হলে যে কেউ এখন আওয়ামী লীগ করতে পারে। তার পিছনের ইতিহাস এখানে গৌণ।

আর প্রধানমন্ত্রী? তিনি আপোস করেছেন কতগুলো রাজাকারের সাথে, শুধু তাই নয়, আত্মীয়তাও করেছেন। তাঁর বৃহত্তর পরিবার এখন আর শুধুই একাত্তরের স্বাধীনতাকামী মানুষের মিলনমেলা নয়। তাঁর পরিবারে একাত্তরের বিরোধিতাকারীরাও সদর্পে বিরাজমান। এ নিয়ে কম আলোচনা-সমালোচনা হয় না, কিন্তু তিনি তা কানে তুলেন না।

আমরা যারা সাধারণ মানুষ আছি প্রবীর সিকদারের কাতারে, তারা কখনই এই আপোসটুকু করিনি জীবনে। কোনো রাজাকারের পরিবারের সাথে আমাদের কোনো স্বজন বা আত্মীয় আত্মীয়তা করেনি। বর্ণ-গোত্র অনেক ক্ষেত্রে মেনে চলার পাশাপাশি রাজাকার নামক গোত্রটাও আমরা মেনে চলেছি। এটা নতুন গোত্র আমাদের অনেকের জন্য। টাকার কাছে আমরা কখনও মাথা নোয়াইনি।

আর সেকারণেই আমরা সাধারণ মানুষ, আমাদের জীবন সাধারণের হলেও আমরা বিবেকের কাছে হেরে যাইনি, মাথা তুলেই চলি এখনও।

আমি তো ভেবেই পাই না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের বঙ্গবন্ধুর মতোন একজন মহান নেতার মেয়ে হয়ে কি করে খন্দকার মোশাররফকে বেয়াই বানাতে পারেন! কি করে এই দেশে আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মূসা বিন শমসেররা রাজত্ব করতে পারে। সালমান এফ রহমানদের কথাও বলা যায় একইভাবে। শেখ সেলিমও আত্মীয়তা করেছেন এদেরই সাথে। তাহলে কী বলবো যে, আজ যদি শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল বেঁচে থাকতেন, তাহলে তারাও এমনভাবেই আত্মীয় বাড়াতেন, এই রাজাকারদের সাথেই? তাহলে কী তারা মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন? বা আমাদের বাঁচিয়ে গেছেন?

কথাটা খুব রূঢ় শোনাচ্ছে আমি জানি, কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, এতোক্ষণ যা বলেছি, তা কী সত্য নয়?

আমরা যারা স্বজন হারিয়েছি একাত্তরে, আমাদের বুকে খুব বিঁধছে আজ প্রবীর সিকদারের হাতের ওই হাতকড়াটা। ক্র্যাচে ভর করে তাঁর দাঁড়িয়ে থাকাটা।

তাই বলছিলাম কি প্রধানমন্ত্রী, অনতিবিলম্বে, এই মূহূর্তে প্রবীর সিকদারকে মুক্তি দিন, আর ৫৭ ধারা বাতিল করুন। প্রবীর সিকদার কারাগারে থাকা মানে আপনার সরকারের বিপদ ডেকে আনা। সিদ্ধান্ত নিন, রাজাকারদের সাথে থাকবেন, নাকি আমাদের মতোন সাধারণ, স্বজন হারানো মানুষের পাশে থাকবেন। মনে রাখবেন, প্রকৃত দেশপ্রেমিক খুঁজতে গেলে আপনাকে রাস্তায় নেমে এসে আমাদের কাতারে দাঁড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। ওইসব দখলবাজ, দুর্নীতিবাজ, চোর-বাটপাররা যতোই আপনার বেয়াই হোন না কেন, তাদের কেউ শ্রদ্ধা করে না। সম্মান করে না। টাকা দিয়ে মানুষের মনের ভিতরটা কেনা যায় না প্রধানমন্ত্রী।

একবার ভাবুন আমাদের কথা। মুক্তি দিন প্রবীর সিকদারকে। নইলে ওই একটি পা-ই আপনার সর্বনাশ ডেকে আনতে বাধ্য। অতোটা হেলা করবেন না প্লিজ। মানুষ জাগলে খবর আছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,৩৮৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.