এই যুগের এক কালো মেয়ের আখ্যান

লেখাটি নজরে আসে ১২ আগস্ট একজনের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে। এক বড় ভাইয়ের বেদনার কথা, তার কালো বর্ণের বোনের আত্মাহুতির কথা। গায়ের রংয়ের কারণে যে বোনকে চলে যেতে হয়েছে পৃথিবী ছেড়ে, দিনের পর দিন অপমান, গঞ্জনা সইতে না পেরে। যে বোনটি ছিল ঋজু, স্বাবলম্বী, হাসিখুশি, উজ্জ্বল, সে কীভাবে মলিন হয়ে যায় এই যুগে এসেও, তা উঠে এসেছে লেখাটিতে। সেই বড় ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে লেখাটি এখানে তুলে দেয়া হলো।

Sumi
মাঝের মেয়েটি সুমি, এমনই প্রাণবন্ত ছিল সে

আবদুস সোবহান বাচ্চু: পঞ্চম বারের মত সুমনের জানিমের আবেদন নামঞ্জুর করেছেন ঢাকার সি এম এম আদালত। সুমিটার কপালে বর্ণবাদী নগ্ন থাবার এত বড় ক্ষত লুকিয়ে ছিল!! দেখতে না দেখতেই সুমিটা (শাম্মি আক্তার সুমি) চলে যাবার আটত্রিশ দিন পার হয়ে গেল। কাছে পিছের আত্মিয়-সজন, বন্ধু পরিজন যারা তারা মোটামুটি সবাই স্বাভাবিক। শুধু আমাদের বুকের কান্না সীমাহীন রয়ে গেছে।

(পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী: রাজধানীর মিরপুরে শিক্ষিকার ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ০৫ জুলাই আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টার দিকে ৬৬৯, মধ্য মণিপুর, মিরপুরের বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে শাম্মি আক্তার সুমির (২৮) ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পারিবারিক কলহের জেরে তিনি আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে পুলিশ ধারণা করছে।  সুমি নামের ওই শিক্ষিকা মনিপুর স্কুলের চারুকলার শিক্ষিকা ছিলেন। তার স্বামী সুমন হাবিব ঘটনার সময় বাড়িতে ছিলেন না। চার বছর আগে তারা ঘর বাঁধেন। দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়াশোনা করেন। তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়া। সূত্র: বাংলানিউজ)

আমাদের বয়বৃদ্ধ বাবা আজও জানেন না তার আদরের মেয়েটির চলে যাবার করুণ কঠিন সত্যটি। আমরা বলতে পারিনি তাকে, তবে মাকে জানিয়েছি। আমাদের বাবা এখন গাড়ি দেখলেই আতংকিত হন, ভয়ে কুঁচকে যান। রাস্তায় একা নামতে সাহস করেন না। এই রাস্তা আর গাড়ি, এই সড়ক দুর্ঘটনায়ই যে তার আদরের মেয়েকে অকালে তার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাকে নিঃশ্ব করেছে। আমার বাবাকে যে আমরা এমনটিই জানিয়েছি। সত্যি জানলে বাবা সে কষ্ট সহ্য করতে পারবেন না। আমরা সহসাই এতিম হয়ে যাবো..!!

সুমিটা আমার সাথেই, আমার পরিমন্ডলে শিশুকাল থেকে বেড়ে উঠেছে। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক মজার মজার ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করেছে। আমি আমার স্টুডেন্ট এর বাড়িতে গিয়েছি, আমায় দেখে কাজের বুয়া বলেছে- ‘আফা, রং মিস্ত্রি আইছে।’ লঞ্চে ঢাকা যাচ্ছি, এক কেবিন থেকে আমাকে ডেকে বলেছে-‘এই শোন, আমাদের জন্য ভাত নিয়ে আসো তো।’ আমার বন্ধুর অফিসে গিয়েছি তার এক ক্লায়েন্ট বলে-‘এই যে, আমার এই ব্যাগটা রিক্সায় তুলে দাও তো।’ আমার ইস্কুলে ম্যাগী নুডুলস এর প্রোগ্রাম করতে আসা প্রতিনিধি বলে- ‘ বাবা, আজব ইস্কুল! ম্যাডামরা সব চুপ, দারোয়ান ব্যাটার কি চোট দেখছেন!’ কেউ রং মিস্ত্রি, কেউ লঞ্চের কেবিন বয়, কেউ অফিসের পিওন, কেউ ইস্কুলের দারোয়ন মনে করে অনেক অপ্রস্তুত অথচ মজার স্মৃতিময় ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। সুমিটার সাথে এসব নিয়ে অনেক হাসাহাসি করতাম।

আমাকে কেউ কালো বললে, আমি তাকে আমার এক চক্ষু ডাক্তার বন্ধুর ঠিকানা দিয়ে বলতাম এবং এখনো বলি, ‘চোখের ডাক্তার দেখাও, তুমি তো কালার ব্লাইন্ড হয়ে যাচ্ছো। আমি কালো নয়, “উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ”। আবার কেউ শুকনা বললে বলেছি এবং এখনো বলছি, ‘তোমার দেখছি ভাষাজ্ঞানের স্বল্পতা আছে, আমি শুকনা নয়, “স্লিম”। এগুলো সংক্রামিত ছিল সুমির মধ্যেও..। নিজেকে নিয়ে অনেক কৌতুক সৃষ্টির ক্ষমতা ছিল সুমির।

সুমি কখনো্ই নিজেকে কৃশকায় বা কৃষ্ণবর্ণের মনে করতো না। মেধায়, মননে, যোগ্যতায়, সৃজনশীলতায় সে আর পাঁচ জনের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। এটা সুমিকে যারা দেখেছেন সবাই বিনাবাক্যে সম্মত হবেন। সেই সুমিটার মাথার মধ্যে সে কৃশকায় তাই তার বেবি হলে সেও কৃশকায় হবে, রোগা হবে। সুমি কৃষ্ণবর্ণের তাই সুমির বেবি হলে সেও কালো হবে। এই রং নাম্বার ঢুকিয়ে দিয়েছিল বছরের পর বছর ধরে নিরবধি, নিরলসভাবে, নিকৃষ্ট পন্থায়, নীচুমানের এই সুমনের গোটা পরিবার। সুমনের পরিবারের সদস্যরা মাঝে মাঝেই বলতো, সুমনের বেবি প্রয়োজন হলো কোথাও থেকে ফর্সা ও স্বাস্থ্যবান বেবি দত্তক নেবে। সুমির গর্ভের সম্ভাব্য কালো ও রোগা বেবি তাদের চাইনা। আর তাই, সুমির ইচ্ছার বিরুদ্ধে চার চারবার ভ্রুন হত্যা। ওর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে হত্যা করেছে সুমনের গোটা পারিবার মিলে। হয়তো আজ সুমির একটা বেবি থাকলে, সেই অকলংক মুখের দিকে চেয়ে সুমিটা এমন সিদ্ধান্ত কখনোই নিতে পারতো না। আমাদের দুর্ভাগ্য, সুমিটা বেঁচে থাকা অবস্থায় ওর জীবনের এই অন্ধকার দিকগুলোকে আমাদের দেখতে দেয়নি। নিজের অন্ধকার আঁড়াল করতে গিয়ে আমাদের গোটা পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দিল..!!

ভাবতে অবাক লাগে, একে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দেশের সবোর্চ্চ বিদ্যপীঠ। তায় চারুলা অনুষদ। যেখানে সর্বদাই মানব জীবনের, সমাজের যত্ত অনাচার, অন্ধকার, কুসংস্কারের প্রথা ভাঙ্গায় লিপ্ত টগবগে ক্ষ্যাপা সব স্বপ্নভূখ প্রাণ। সেখানে এই সুমনের মত বহুগামী, সমকামী, মদপ্য, লম্পট, বর্ণচোরা, বর্ণবাদী নর্দমার কীট এলো কিভাবে?

শুধু সুমি কেন? আমাদের গোটা পরিবারে কারো মধ্যে নিজের চেহারা, স্বাস্থ্য নিয়ে কোন হীনমন্যতা নেই। আমার সেলফোনে আমার মেঝো বোন মুন্নির নাম লেখা আছে কাইল্লা। ওকে আমি ওই নামেই ডাকি। সেজো বোন সুখির নাম লেখা আছে দুঃখি। ওকেও আমি ওই নামেই ডাকি। আমার ভাগ্নি জান্নাতুল ফেরদৌস রূপা ওকে ডাকি গাধা। ওরা এখনো জীবিত, আমি এভাবে না ডাকলে যেমন তৃপ্তি পাই না, তেমনি ওরাও ধরে নেয় আমার বোধহয় মন ভালো নেই..।

সুমিটার সাথেও আমি যেভাবে উচ্ছ্বাসিত হয়ে, প্রাণ খুলে বন্ধুর মত কথা বলতাম, সেখানে সামান্য একটু কমতি থাকলেই জিজ্ঞেস করতো, “দাদা, আপনার কি মন খারাপ?” চলে যাবার মাত্র তিন দিন আগে ২ জুলাই সন্ধ্যায়ও এই একই কথা জিজ্ঞেস করেছিল সুমিটা আমার! এতটা বন্ধুসুলভ সম্পর্কের পরেও কেবলমাত্র ভুল লোককে নির্বাচন করে জীবনে হেরে যাওয়ার অধ্যায়টাকে আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারে নাই সুমি..। হয়তো সে ভেবেছিল, এসব জানলে আমরা কষ্ট পাবো..।

হতভাগী, হেরে যাওয়াটাই যে পরাজয় নয় এটুকু না বোঝার মত মেয়ে তো তুই ছিলিস না। আর আমাদের এখন আর কোন কষ্ট স্পর্শ করবে না নিজেই কষ্ট পাবার ভয়ে। আমাদের জীবনে কষ্টকে উপেক্ষা করার, উপহাস করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে তোকে কে বলেছিল..?

 

শেয়ার করুন:
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.