আমার আম্মা

ma........2আশরাফ আবীর: বাংলাদেশ ব্যাংকে আজ আমার মা এর দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ দিন, যথারীতি আজকেও আম্মা আমার আগে অফিসে রওনা হয়েছে, আমার সাথে দেখা হয় নাই।

ইউনিভারসিটিতে পড়ার সময় রাতের বেলা ডাইনিং টেবিলে নোট লিখে রাখতাম “আম্মা, আমার জন্য ২০ টাকা / ৫০ টাকা রেখে যাইও”, ঘুম থেকে উঠে দেখতাম টাকা রাখা। নটরডেম কলেজে পড়ার সময় প্রায়ই আম্মার অফিসে বন্ধুদের নিয়ে যেতাম, আম্মা ঘরোয়া’র খিচুরি খাওয়াইতো।

আম্মার চাকরির সুবাদে আমাদের বেড়ে উঠা ব্যাংক কলোনিতে, কতো স্মৃতি। মনে রাখার দিনগুলো ছিলো স্কুল এর রেজাল্টের দিন, আর আম্মার অফিস থেকে ফেরার সময়। ভয়াবহ টেনশন: একবার আম্মার ট্রান্সফার অর্ডার হলো সিলেটে, আম্মা প্রতি সপ্তাহে ঢাকায় আসে, এক রাত থেকে, মন খারাপ করে পরদিন আবার সিলেটে রওনা হয়, অনেক চেষ্টা-তদবির করার পর বদলির মেয়াদ কমানো গিয়েছিল, এর জন্য সব সময় কৃতজ্ঞ থাকবোও পার্থদার (পার্থ প্রতিম মজুমদার) কাছে।

আমি সবসময় আমার সহকর্মীদের উদাহরণ দেই আমার মায়ের, আমরা সব সময় জানতাম সন্ধ্যা বা রাতে আম্মার কোন অসুখ হলেও পরদিন অফিস যাবার আগেই তা ঠিক হয়ে যাবে, হরতাল, আন্দোলন কোনকিছুই আম্মা তোয়াক্কা করেন নাই, আমরা দুই ভাই-বোন এইসব দিনগুলোতে খুব আতঙ্কে থাকতাম, কিন্তু আম্মা নির্বিকারভাবে অফিসে যেতো, আসত, কাজ করতো।

নিজের ক্যরিয়ার এর প্রায় সবটুকুই আমাদের পরিবারের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন, আম্মার শখ আহ্লাদ বলে কোন কিছু আছে বলে আমার মনে পড়ে না, ছোট বেলায় আম্মা সাজগোজ করে অফিসে গেলে আমি নাকি কান্নাকাটি করতাম, তাই সাজগোজই ছেড়ে দিলো, হালকা গালে পাউডার মাখা ছাড়া কোন বাড়তি মেয়েলি শখ দেখি নাই।

আমাদের বাসায় একবার ডাকাতি হলো, আম্মার সব গয়নাগাঁটিও গেলো। নিজের সব আয়, ইচ্ছা, শখ আমাদেরকে মানুষ করার পেছনেই ব্যয় করেছেন। আমাদেরও সব চাওয়া-পাওয়া, আহ্লাদ আম্মাকে ঘিরেই। টেবিল ভরা সাজানো খাবার দেখার পরও আমি যদি একবার বলি, ‘ইশ আজকে যদি ওই তরকারিটা দিয়ে খাইতে পারতাম’, সারাদিন অফিস করার পরও যতই ক্লান্ত থাকুক না কেন আম্মা তখনি রান্না ঘরে ঢোকে। অথচ নিজের খাবার দাবারের দিকে কোনদিনই মনোযোগ দেয় নাই।

এতোদিন আব্বার অবসর জীবন একা একা মোবাইল, কম্পিউটার আর আমার ছেলে রেহানকে নিয়েই ছিল, কালকে থেকে আম্মাও যোগ দিবে সেই দলে। আব্বা-আম্মার অবসর জীবন আনন্দে আর ব্যস্ততায় কাটুক।

এইতো সেইদিন আমরা দুই ভাইবোন বড় হচ্ছিলাম আমাদের দাদা-দাদির কাছে, আজকে আমার ছেলে আর আমার বোনের মেয়ে আরিশা দাদা-দাদিকে/নানা-নানীকে পাবে একইরকমভাবে, কতো দ্রুত সময় যায়।

(১৯৭৮ সালে কোন একদিন অফিস থেকে ফেরার পর তোলা আম্মার ছবি)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.