এতো আমাদের ভেতরকারই অন্ধকার

3_Sylhet-Child-Murder-9আলী রীয়াজ: সীমাহীন নিষ্ঠুরতার খবর পড়ছি আমরা সবাই। একেকটি মর্মান্তিক ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে চরিত্রে, প্রকৃতিতে। গতকাল যে নিষ্ঠুরতার খবর দেখে মনে হয়েছে ‘এও কি সম্ভব?’

আজ আরেক ঘটনায় তাকে মনে হচ্ছে শিশুতোষ। অথচ দেখুন যারা এসব পৈশাচিক ঘটনা ঘটাচ্ছে এরা কিন্ত অতি সাধারণ মানুষ; আপনার চারপাশে যে মানুষগুলোকে আপনি প্রতিদিন দেখেন, চেনেন এঁরা তার চেয়ে ভিন্ন নয়।

ফেসবুকে যার কথা আপনি ‘পছন্দ’ করেন এঁরা কি তার চেয়ে খুব বেশি আলাদা? আপনি ভাবেন – কী করে মানুষের মধ্যে এই সীমাহীন বিকারগ্রস্থতার জন্ম হয়েছে? কিন্ত আসলে এই প্রশ্নের উত্তর আপনি জানেন, চাইলেই বুঝতে পারবেন। এই সব ঘটনায় যে সব প্রতিক্রিয়া সেগুলো দেখুন তা হলে বুঝতে পারবেন। ক্ষোভ ও ক্রোধের প্রকাশ হিশেবে আমার-আপনার বন্ধুর প্রতিক্রিয়ার ভাষা লক্ষ্য করুন, তা হলেই স্পষ্ট হবে।

নিষ্ঠুরতা, বর্বরতার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আমি-আপনি যে ভাষায় আক্রমণ করছি, এই সব অপরাধীদের যে সব শাস্তির পরামর্শ দিচ্ছি সেগুলোই আসলে বলে দেয় এই মনোভাবের শেকড় কত গভীরে। মানুষকে কতভাবে শাস্তি দেয়া যায় বলে যে পরামর্শ দেয়া হয় তার যদি একটি তালিকা করার চেষ্টা করেন তা হলে দেখবেন এগুলোর মধ্যে নির্মমতার কত নগ্ন প্রকাশ আছে।

আর যারা প্রতিক্রিয়া দেখালেন না তাঁদের মধ্যে আছেন সেইসব মানুষ যাঁদের নির্লিপ্ততা সীমাহীন। আমার গায়ে এসে লাগেনি, সেটা ধর্ষনের ঘটনাই হোক কি হত্যার ঘটনাই হোক, অতএব এ নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা নেই।

এই দুই-ই বলে দেয় যে মানুষের মনের কোণে যে অন্ধকার তা দূর তো হয়ইনি, বরঞ্চ আরো বেশি করে গেড়ে বসেছে। বাইরের উজ্জ্বল চোখ ধাঁধানো আলোয় আমরা তা দেখতে পাইনা বটে, কিন্ত আরেক অন্ধকারের দেখা পাওয়া গেলে আমাদের মনের সেই অন্ধকার আমাদের গ্রাস করে। গত কয়েক বছরে কথা বলার ভাষায়, আলোচনার ভাষায়, ভিন্নমত প্রকাশের ভাষায় কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন? এই যে ফেসবুক, কিংবা ধরুন অন্য সোশ্যাল মিডিয়া, সেটা একার্থে এই সময়ের এক অনন্য দলিল, সমাজ বদলে যাবার একটি দলিল।

শুধু এই কারণে নয় যে সেটা প্রযুক্তির উৎকর্ষের প্রমাণ, এই কারণেও নয় যে তা দূরকে কাছে এনেছে – আমার কাছে মনে হয় এই কারণে যে আমার-আপনার ভেতরের মানুষকে এই প্রযুক্তি উন্মুক্ত করেছে।

ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে আমরা যখন কথা বলি তখন আসলে আমরা কথা বলি একা একা, যে কথাটা যে ভাষায় আর দশজনের সামনে বলতে আমাদের দ্বিধা হতো এখন তা নির্বিবাদেই বলি। ফলে যতটুকু মানসিক বাধা; সামাজিকতার যতটুকু লেশ আমাদেরকে আটকে রাখতো, এখন সেই বাধা নেই। একান্তে আমার আমি যে কি রকম মানুষ তারই প্রকাশ ঘটে এই সব নির্মমতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিক্রিয়ায়; শুধু তাই নয়, অন্যের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয় না।

অন্ধকারকে অন্ধকার দিয়ে দূরে ঠেলতে পারা যাবে এমন আশা বাতুলতা মাত্র; আমাদের ভেতরের অন্ধকার বিষয়ে আত্মোপলব্ধি দেখতে পাই না। মনের সেই অন্ধকারের মধ্যে যে আলো প্রবেশ করছে না, সে কথা বলবার সময় কোথায়? বিত্ত, প্রাচুর্যের অহংকার আর আপাত সাফল্যের ঘোর কি আমাদেরকে অন্ধ করে দিচ্ছে?

শিক্ষক: ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

(ফেসবুক থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.