নারীসত্ত্বার অন্য নাম সিস্টার জোসেফ মেরি

Joseph Mary 2মারজিয়া প্রভা: হলিক্রস কলেজের প্রথম দিন ছিল ফ্রেশারস। ক্লাসে গিয়ে বসেছিলাম। ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে চকচক করে লেখা “Once crossian is crossian forever”. কথাটা পুরোপুরি সত্য।

বাবার ভার্সিটি লাইফের এক বন্ধু বাবাদের ট্রিট দিয়েছিল, আমরাও গিয়েছিলাম। আন্টি মানে আঙ্কেলের স্ত্রী ছিলেন এক্স ক্রসিয়ান। অত অত মানুষের মধ্যে ভারিক্কি স্বভাবের সেই আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল “তুমি এক্স ক্রসিয়ান, আমিও”। এরপর পরই  একটা রেগুলার প্রশ্ন, সব ক্রসিয়ান করে “ সিস্টার জোসেফ মেরির ক্লাস পেয়েছ ? উনি কি এখনও আগের মতন আছেন”?

আগের মতন থাকা কাকে বলে জানি না। কারণ আগে দেখিনি। তবে অনুমান করে নেই। আমি যখন তাঁকে দেখেছি ৮০ বছর বয়স্কা রমণী। কী প্রাণবন্ত, কী উচ্ছল, কী চাঞ্চল্যতায় ভরপুর!  আমি ২০১১ এর ব্যাচ হলিক্রস কলেজের। ক্লাস পেয়েছিলাম জোসেফ মেরীর। মঙ্গলবার দিন প্রথম পিরিয়ড ছিল তাঁর ক্লাস।

ক্লাস অফিসার, কালচার কমিটির মেম্বার হ্যানত্যান দায়িত্ব পালন করতাম বলে জোসেফ মেরির ঝাড়ি খুব কাছ থেকে খেয়েছি। আমি উনার ক্লাসে জীবনে পাঁচ বার ঠিকঠাক এটেনডেন্স পেয়েছিলাম। দেরি হয়ে যেত, পাবলিক বাসের অহেতুক দাঁড়িয়ে প্যাসেঞ্জার নেওয়ার কারণে। আর উনি ছিলেন ভীষণ পাঙচুয়াল। আটটা মানে আটটা। যথারীতি আমি attendance  মিস করতাম।

তো এমন একদিন, আধা ঘণ্টা লেটে এসেছি, যেখানে ক্লাস হয় ৪০ মিনিট। সিস্টার এমনিতেই খেপে ছিল। সিটে বসে খাতা বের করতে গিয়ে পেন্সিল পড়ে গেল, আমি নিচু হয়ে তুলতে গেলাম । সাথে সাথে হুঙ্কার । চেঁচিয়ে উঠল “What are you doing under your chair?”। আমি সরি চাইলাম। সিস্টার তাঁর বিখ্যাত ডায়লগ দিল “Sorry can not be a excuse”।

এই ডায়লগ মুখে মুখে ছিল আমাদের। কেউ সরি চাইলেই ছেড়ে দিতাম এই কথা।

আরেকদিন লজ্জায় পড়েছিলাম সিস্টারের সামনে। তখন পদার্থবিদ্যার নতুন স্যার দেবাশিস মাত্র এসেছেন কলেজে। যাই হয় আর কি, বয়সটা ওইরকম, তার উপর নতুন স্যার। আমি এ সেকশনে ছিলাম, বি সেকশনে স্যার ক্লাস নিচ্ছিল, আমি স্যারের পড়া শুনে মুখটা কেমন বিকৃত করলাম।

আচ্ছা, থাক বেরিয়ে তো এসেছি কলেজ থেকে, বলেই দেই, আমি মে বি স্যারকে ভেঙাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি সিস্টার জোসেফ মেরী হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি মাথা নিচু করে ফেললাম, আমার কাছে এসে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল “No”।

কলেজে শেষের দিকে রেপুটেশন বরবাদ হয়ে গিয়েছিল। ক্লাস অফিসার হিসেবে সবাই ভালবাসলেও, আমার এটেনডেন্সের বেহাল দশার জন্য, প্রায় সিস্টার পলিন ডাক পারতো আমাকে। একদিন সিস্টার জোসেফ মেরী বসে ছিল সিস্টার পলিনের রুমে। আমাকে ঝাড়ছে সিস্টার পলিন। সিস্টার জোসেফ মেরি হাস্য মুখে জিজ্ঞেস করল “Tell me please, actually what’s your problem, lady? ”

অত ঝাড়ি খেয়ে যা হয়নি, তাই হলো, অত আদুরে কথায়, আমার চোখ দিয়ে গরম জল গড়িয়ে পড়ল।

যতদূর মনে পড়ে আমরা ফেয়ারওয়েল দিয়েছিলাম বড় আপুদের, সেইবার সিস্টার জোসেফ মেরীর বড় ভাই এসেছিলেন । উনার ভাষণে শুনেছিলাম “ জোসেফ মেরী কঠোর পরিশ্রম করেছেন এই কলেজ গঠনের পিছনে। সিস্টার অগাস্টিন মারী, হলিক্রসের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে শিক্ষকতা শুরু করেন। কেবল ব্রত নেবার টানে ১৯৫৬ সালে তিনি বাংলাদেশে, তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে আসেন। এই হলিক্রস প্রতিষ্ঠানের পিছনে শুধু শ্রম না, অর্থও প্রদান করেছেন। ”

আমরা ইংরেজি পেলেও, আগে তিনি অর্থনীতি ও যুক্তিবিদ্যা ক্লাসও নিতেন। তিনিই একমাত্র শিক্ষক যিনি ১৯৫৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত নিরলসভাবে পড়িয়ে গেছেন। মাঝে প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন কলেজের। প্রিন্সিপ্যাল পদ থেকে অব্যহতি নেওয়ার পরেও থেমে থাকেনি তাঁর শিক্ষকতা।

একদিন তো মানুষকে থামতেই হয়। দেহের কোষ সব মরে যায়, আর রিজেনারেট হবার উপায় থাকে না, বয়স বাড়তে থাকলে। তারপর নিঃশ্বাস থেমে যায়, লাগাম টানতেই হয়।

সিস্টার জোসেফ মেরীকেও সময়ের তাগিদে থামতে হলো ২৮ জুলাই ২০১৫ সালে, সকালে ৬:৫০ এ । কিন্তু আমরা যারা ক্রসিয়ান আছি, তাদের কাছে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল ধরে। এখানেই সিস্টার যোসেফ মেরির সার্থকতা।

মরে গেলে সব কি শেষ হয়ে যায় ? তাঁর দেওয়া নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের শিক্ষা, বয়সকে জয় করার মন্ত্র, জরা ব্যাধির উর্ধে জীবনীশক্তির প্রতিটি ফোঁটা কে কাজে লাগানোর দীক্ষা, এইসব তো বয়ে যাচ্ছে , ছড়িয়ে দিচ্ছে আপামর মানুষের মাঝে, তাঁর পালিত ক্রসিয়ানরা!

মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর একটা কথা তাঁকে বলতে ইচ্ছে করছে, তিনি যেভাবে আমাকে বলেছিল “ Tell me please, what do you earn from your life, lady?”

ভালো থাকুন ওপারের পৃথিবীতে, সিস্টার। যখন দেখা হবে, এই প্রশ্নটা করব নিশ্চয়ই!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.