বিশ্বাসের কষ্টিপাথরে গয়নার পরখ

0
Laily

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: গয়না নাকি নারীর নিরাপত্তা বাড়ায়! তাই হয়তো অনেক মেয়েই গয়না ভালবাসে। আমার কখনও তেমন নিরাপত্তার বোধ হয়নি। নিরাপত্তার গয়না বলতে যা বোঝায় আমার তেমন গয়না যেমন পরা হয়নি, পরার সম্ভাবনাও আর জীবনে নাই। তাই বলে আমি মোটেও নিরাপত্তাহীনতা বোধ করিনি কখনও। আমার আত্মবিশ্বাস ও সাহস আমার গয়না হয়ে উঠেছে। গয়নার শক্তি আমার অনুমেয় হয়নি কখনও। কিন্তু গয়নাহীনতায় বিব্রত করার চেষ্টা চারপাশ থেকে কম হয়নি কখনও।

কয়েকদিন আগে আমার ছোট ভাইয়ের বিয়েতে যেতে হলো। নানা কারণে বিয়েতে থাকার ইচ্ছে আমার একবারেই ছিলনা। কিন্তু সবার ছোট প্রবাসী ভাইটি বিয়ে করতে চাচ্ছিলই না। কিন্তু তাকে বিয়ে দেয়ার জোরজবরদস্তি যখন পরিবারে, কয়েকদিনের জন্য দেশে এসেছে, আলোচনার মাধ্যমে তড়িঘড়ি বিয়ের আয়োজন পাকা।  আমি যাচ্ছি না শুনে ভাইটিও মন খারাপ করল। অন্যরা তো আমাকে বিব্রত করার ইস্যু খুঁজে হয়রান আগে থেকেই এবার বড়সড় যেন একটা পেয়ে গেল। যাক, আমি আর বাড়াতে না দিয়ে চলেই গেলাম।

বরযাত্রি যখন বরের সাথে তৈরী হচ্ছে, আমিও হলাম। কিন্তু সেই যে ইস্যু খোঁজা জনেরা আমার পোশাকে আপত্তি তুলল। সালোয়ার কামিজ পরে যাওয়া যাবে না। অবশ্যই শাড়ি পরতে হবে। কোনভাবেই কাউকে মানাতে পারলাম না। ঠিক আছে শাড়ি একটা ছিলই ব্যাগে, সেটাই ভরসা হল।সবাই যখন গয়নার বিজ্ঞাপনের আদলে শরীরে যত সয় গয়না পরল, আমি গলায় ও কানে পুঁথির গয়না পরলাম শাড়ির রংয়ের সাথে মিলিয়ে।

এপর শুরু হলো ভিন্ন রকম কথা। জনে জনে জানতে চাচ্ছে আমি কেন সোনার গয়না পরছি না।পুঁথির গয়না নাকি বিয়েতে বেমানান। সোনার গয়নাই পরতে হয়। এর আগেও যত আত্মীয়-স্বজনের বিয়ে হয়েছে প্রতিবার আমাকে একই কাজ করতে হয়েছে। প্রতিবার একই প্রশ্ন, জবাবও একই রকম ছিল। কিন্তু কৌতুহলী স্বজন(!) বলে কথা। কেন সোনার গয়না থাকবে না আমার? আর সবার মতো না থাক, অন্ততঃ কিছু তো থাকা চাই।

বললাম, আমার কোন সোনার গয়না নাই। এই পুতির গয়নায় অন্যদের সম্মানহানী হলে আমি যাওয়া থেকে বিরত থাকতে চাই। না, সে সুযোগ নাই। আরো কিছু মানুষের এমন প্রশ্নের জবাব আমি কিভাবে দেব সেটা উপভোগ করা যে বিয়ের আনন্দের চেয়ে বেশি অনেকের কাছে। কিন্তু আমার নির্লিপ্ততা আমার গয়নাহীনতায় নয়, আমার বিশ্বাসে ছিল।

আমার কখনই সোনার গয়না পরা হয়নি। যখন বিয়েতে যৌতুক নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। হবু জামাই নিজেই হবু শ্বশুরের সাথে কথা বলছে। বিয়েতে একখানা ১শত সিসি মোটর সাইকেল ও ৫ ভরি সোনার গয়না দিতে হবে। তবে কথা এই, সেসমযের বাজার দর অনুযায়ী মোটর সাইকেল বাবদ ২৫ হাজার টাকা ও গয়না বাবদ ২০ হাজার টাকা দিতে হবে। কষ্ট করে কিনতে যেতে হবে না শ্বশুরকে। জামাই না হয় এটুকু কষ্ট নিজেই করবেন শ্বশুরের প্রতি দয়া করে।

হবু শ্বশুর মোটর সাইকেল বাবদ টাকা দেয়ার ব্যাপারে আপত্তি না করলেও মেয়ের গয়না বাবদ টাকা দেয়ার কথায় বললেন, গয়না ঠিকমতো না কেনা হলে মেয়েটা কি পরে বিদায় নেবে? এটুকু কষ্টে আমার কোন আপত্তি নাই। আমাকে মেয়ের গয়নাগুলো কিনতে দেন, বাবা। জামাই নাছোড়বান্দা। তার টাকাই চাই। তিনি বললেন, গয়না নিয়ে ভাববেন না। আমার মায়ের অনেক গয়না আছে। মা নাহয় বউয়ের গলায়েই সেদিন ৫ ভরির হার পরিযে নিয়ে যাবেন। আব্বা আর আপত্তি করেননি।

আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথা গুলো শুনছিলাম। আব্বাকে কাছে ডেকে বললাম, এ বিয়ে আমি করতে চাই না, তবু কেন এতো কিছু দিতে চাচ্ছেন? আর লোকটির এভাবে কথা বলা আমার পছন্দ হয়নি। আপনি না করে দেন। আমি বিয়ে করব না।

আব্বা দুই হাতে আমার হাত দুটো ধরে ফেললেন। আদ্রকণ্ঠে আমাকে বললেন, এভাবে বলিস না মা। তুই আপত্তি করলে গ্রামে আমার সম্মান থাকছে না। দেখ, কয়দিন আগে তোর বড় বোন নিজে সংসার করবে না বলে জামাইকে তালাক দিয়েছে। এ ঘটনায় সমাজে আমি মুখ দেখাতে পাচ্ছি না। ঘটনাটি ঢাকতে আর সম্মান ফেরাতে আমি ঘটা করে তোর বিয়ে দিচ্ছি। তিন গ্রামের মানুষের কাউকে বাদ দেব না দাওয়াতে। তুই রাজি না হলে আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে।

আমারো দু’চোখ জলে ভরে উঠেছিল। আমি মুখ ঘুরিয়ে ঘরের পিছনের বাগান বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। তারপর জামাইকে দেয়া কথা মতো বিয়ের দিন প্রায় সবটাকা বুঝিয়ে দেযা হয়েছে। মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা বিয়ের আয়োজনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।

আমি প্রায় মুর্তির মতো অনুসরণ করে যাচ্ছি যা যা করতে বলা হচ্ছিল। একটা ব্যাপার খেয়াল করছিলাম আমার সদ্য তালাকদাতা বড় বোনকে আমার কাছে আসতে দেয়া হচ্ছে না। আমি নিজে কখনও তার কাছে চলে গেলে আমার বোনকেই তাড়িয়ে সরিযে দেয়া হচ্ছে। যেন সে অচ্ছ্যুত হয়ে গেছে। মহাপাপী হয়ে গেছে কোন অন্যায় করে।

রাতে নাকি বরযাত্রি আসবে, আমার বিয়ে। বাড়িতে সাজসাজ আয়োজন। আমাকে স্কুলে যেতে বারণ করা হয়েছে। সবাই চোখে চোখে রাখছে। স্কুল না থাকায় সকালের পরপরই আমি অস্থির বোধ করছিলাম।কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বাড়ির পিছনের বাগান বাড়িতে মাটিতে গর্ত করে একসাথে বড় তিনটি চুলা বানানো হচ্ছে।অনেক লোকের রান্নার আয়োজন। আমি চুলার পাশের জাম্বুরা গাছটায় গিয়ে উঠে শেষ মৌসুমের কয়েকটা জাম্বুরা ছিল তার মধ্যে ২টা পেড়ে ফেলেছি ততক্ষনে।

আমার পাড়াতো এক ভাবি এসে চিৎকার করতে করতে আমাকে গাছ থেকে নামিযে নিয়ে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল নানীর সামনে। বলল, দেখেন নানী আম্মা, আজ ওর বিয়ে, আর ও কিনা জাম্বুরা গাছে চড়ে বসে আছে। আমি ভাবির হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জাম্বুরা কাটতে বসে গেলাম। সবাই যেন একটু বেশি বেশি খাতির করছে আমাকে। কেউ জাম্বুরা খোসা ছড়াতে হাত বাটাচ্ছে। কেউ লবন-তেল এনে দিচ্ছে। নানী অন্যদের বলছে, তোরা কেউ খাস না, ওকে সবটুকু খেতে দে। কাল তো সে অন্য বাড়িতে চলে যাবে। সবার এমন যত্ন যত্ন ভাবটা আমার একটু ভালোই লাগছিল এতক্ষণ। কিন্তু অন্য বাড়িতে চলে যাওয়ার কথাটা বুকে খচ করে বিঁধে গেল।

জাম্বুরা গিলতে কষ্ট হতে লাগল। নানীর বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। তারপর বাকী দিনটার কথা তেমন মনে নেই। রাতে বরযাত্রি এসেছে বলে শোরগোল আমার কানে এসেছিল। আমি কিন্তু বউয়ের মতো সাজানো ছিলাম না। আমার অনেক কান্না পাচ্ছিল। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। একদল ছেলে-মেয়ে আমার নিজের বয়সী, আমার চেয়ে ঢের বড় অনেকে গিয়ে আমাকে চাচি-ভাবি বলে ডাকতে ডাকতে ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে ঘুম থেকে জাগালো। আমাকে দুলাভাই ও দাদা-নানারা জানালো আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমার খুব বিরক্ত লাগা শুরু হয়েছে তখন। কী বিশ্রী ব্যাপার! আমাকে কেন ওরা চাচি-ভাবি ডাকবে?

সকালে বিয়ে বিদায়ের আগে আমাকে শাড়ি পরানো হলো। কিন্তু গয়না কই? জামাইয়ের এক ভাতিজা বউ নিজের শরীর থেকে কিছু গয়না খুলে আমাকে পরালেন। আমার আব্বা আমাকে একফাঁকে একা কাছে পেয়ে বললেন, জামাই হয়তো গয়না বানাতে পারেনি। তুই মন খারাপ করিস না। আমিও সব টাকা দিতে পারিনি বলে ঘটক চাপ দিল। আমার সম্মান তোর হাতে। ও বাড়িতে গিয়ে কেউ কিছু বললে তুই মন খারাপ করিস না। চুপ করে শুধু শুনবি।

সেই অন্য বাড়িতে যাওয়ার পর জামাইয়ের ভাতিজা বউ এসে আমাকে কানে কানে বলে গেল আমি যেন ঘুমানোর সময় গয়নাগুলো খুলে রাখি, নইলে ভেঙ্গে যেতে পারে। সেগুলো যেন এমন জায়গায় রাখি যেন হারিয়ে না যায়। তিন দিন পর আমি যেদিন বাড়ি ফিরব তিনি নিজেই এসে আমার শরীর থেকে গয়নাগুলো খুলে নিয়ে গেলেন। আমার আর কোনদিন গয়না পরা হয়নি।

আমার অন্য বোনেরা যখন কোন বিয়ে বা অন্য কোন অনুষ্ঠানে শাড়ি ও গয়না পরে, আমি তখন জামা-সালোয়ার পরি। জামাটা যেন ফুলহাতা হয়, গলাটা যেন বন্ধ থাকে। আমি মোটেও হীনমন্যতায় ভুগি না গয়নাহীনতায়। বরং অন্যদের অযথা কৌতুহলের জবাব দেয়ার আগ্রহ আমার কাজ করে না।

মাঝে মাঝে আমার এক সহকর্মী বলতেন, আপনি গলায় একটা হার পরতে পারেন। খালি গলায় আপনাকে রাজহাঁসের মতো দেখায়। আমি হেসে বলতাম, হার পরে আমি রানিহাঁস হতে চাই না। নিকট কাছের বয়স্ক নানী-দাদীরা প্রায়ই বলতেন, শরীরের কোথাও তোর গয়নার লেশ থাকে না। কেমন যেন মরা মানুষের মতো লাগে। রিপোর্টের কাজে দূরের কোন গ্রামে গেলে প্রায়ই অনেক কৌতুহলী নারী কণ্ঠে শুনতে হয়, আপা আপনার গাযে গয়না নাই কেন? এমন অনেক প্রশ্নই তাদের মাঝে কাজ করে। সব প্রশ্নের জবাব দেয়ার সাধ্য আমার থাকে না বোঝানোর অক্ষমতায। তেমন কোথাও গেলে আমি পারলে মাটি বা পুতির গয়না পরে নেই কানে যাতে বিব্রত হতে না হয়।

আমি সত্যিই গয়নার প্রতি ভালবাসা তৈরী হয়নি কোনদিন। হয়তো নিজের ছিল না বলে। থাকলে যে হতো তেমনও বিশ্বাস করতে পারি না। আমি বিশ্বাস করতাম আত্মবিশ্বাসের চেয়ে আর কোন গয়নার দরকার নেই। আজকাল আমার মেয়েও আমাকে বলে গয়না নাকি অনেক দরকারী কিছু। তাকে বুঝাই ‘গয়না বা সম্পদ মানুষকে বরং নিরাপত্তাহীন করে। জীবনের ঝুঁকিও বাড়ে। চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ভয় থাকে না। উত্তরাধিকারীরাও কোন্দলের সুযোগ পায় না।’

মেয়ে তার নিজের মতো করে পাল্টা বুঝায়। তার কথায় আমি দ্বিধায় পড়ে যাই। হয়তো বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের আত্মবিশ্বাস ও সাহসের ঘাটতিও হতে থাকে। তখন দ্বিধাগ্রস্ত হতে হয় বাধ্য হয়ে।

গয়নার নিরাপত্তা কি সত্যিই মানুষকে সাহসী করে তোলে? আজো মানতে চাই না।

লেখক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৪৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.