এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে- ৪

0

cage 1লীনা হাসিনা হক: লিখেছি অনেক এ বিষয়ে, অনেকেই লিখেছেন, লিখছেন আরও অনেকেই, তবু আবার কলম ধরতে হল।
সেই পুরাতন একলা থাকা নারীর চরিত্রহননের চির পুরাতন কাহিনী। আমার বন্ধুটি ফোনে জ্বলে উঠতে উঠতে হাহাকার করে উঠলো- আমি তো হতবাক! হয়েছেটা কী বলবি তো! আমার এই বন্ধুটি তার দুটি সন্তানকে নিয়ে একা থাকে, স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়েছে বেশ কয়েকবছর। বনিবনা না হওয়াতেই তারা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে একথা বলাই বাহুল্য।

ভালই করেছে আমি বলি, অন্য আরও অনেকের মতন এক ছাদের নীচে বছরের পর বছর ঝগড়া, মারপিট, সন্দেহ নিয়ে যুযুধান সাপের মতন বিষ উগড়ে সন্তানদের জীবন দুর্বিষহ করে ফেলে, সেই তারাই আবার ফেসবুকে দুজনে দুজনার হয়ে ছবি আপলোড না করে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিঃশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছে। মা-বাবা মিলে একটি পূর্ণ পরিবার সবাই চায়। কিন্তু এই ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ছেলেমেয়ে দুটিও বা কি শেখে!
যাই হোক বন্ধুর কাছে জানা গেলো, ফেসবুকে লেখালেখির সূত্রে তার একজনের সাথে পরিচয়- ভার্চুয়াল পরিচয়, কিছু লেখা বিষয়ক ভাবের আদান-প্রদান এই-ই, বন্ধুটির ছবি তোলার নেশার সূত্রে কিছু ছবির আদান প্রদান। তো ভার্চুয়াল বন্ধুটির বাস্তব স্ত্রী মহোদয়া মেসেজ দেখেছেন! ভদ্রলোকের উপর দিয়ে কি গেছে তা সহজেই অনুমেয়। তারপরে শুরু হয়েছে আমার বন্ধুটির উপরে আক্রমণ। তাকে যথেচ্ছ ভাষায় গালাগালি করেও শান্তি হয় নাই। এখন স্ত্রীটি হাত ধুয়ে লেগে পরেছেন আমার বন্ধুটির চরিত্র হননে।

যেহেতু আমার বন্ধু ডিভোর্সড অতএব সে নষ্ট চরিত্রের নারী। নির্ঘাত তাকে বিবাহ বহির্ভূত প্রেমঘটিত কারণেই স্বামী ডিভোর্স দিয়েছে!

পাঠক, লক্ষ্য করুন, স্বামীই ডিভোর্স দিয়েছে, এটাই অবধারিত ধারণা। বিবাহ বহির্ভূত প্রেমঘটিত কারণ ছাড়া অন্য আর কোন কারণে এ ভূ- ভারতে কোন ডিভোর্স হয় না! বন্ধুকে ফোনে গালি গালাজ, ফেসবুকে গালি গালাজ!

এটুকু আমি লিখেছিলাম, বন্ধুকে বলেছিলাম পাগলা কুকুরকে তো আর কামড়ানো যায় না, তাই এভয়েড কর, ফেসবুক বন্ধ রাখ। বন্ধু ফেসবুক বন্ধ করে দিয়েছে! কিন্তু না, তারপরেও মা ক্ষান্ত হইলেন না, এখন তার সন্তানদের উপরেও মৌখিক এবিউজমেন্ট মূলক কথাবার্তা শুরু হয়েছে! আমার বন্ধুর সন্তানরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলিতে বৃত্তি নিয়ে অধ্যয়ন করছে। সন্তানরা আমার বন্ধুটির জীবন প্রবাহ। কাজেই এই সন্তানদের সম্পর্কে যখন নোংরা কথা বলা শুরু হয়েছে, এই পর্যায়ে এসে আমার বন্ধুটি রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। শান্ত করবার চেস্টা করলাম তাকে।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেলো, স্ত্রীটি উচ্চশিক্ষিত (সত্যি??) ভালো চাকরী করেন। আরেকটু চেষ্টা করে জানা গেলো স্বামীর সাথে এক ছাদের নীচে থাকেন, তিনি তবে স্বামীকে উঠতে বসতে ‘হাতেতে যদিও না মারেন তবে শত মারেন ঠোঁটে’।

তবে হ্যাঁ, স্ত্রীর ফেসবুকে তাঁদের গলাগলি ছবি দেখে এই নরক জীবনের কিছুই টের পাওয়া যাবে না!  যাই হোক এতে আমাদের কিছু এসে যায় না। আমার বন্ধু তার স্বামীর সাথে লেখার আদান প্রদান করে কলির মহাভারতকে অশুদ্ধ যেহেতু করেই ফেলেছে, অতএব নৈতিকতার ধ্বজাধারী স্ত্রী আমার বন্ধুকে গালিগালাজ করে এবং স্বীয় অধিকৃত স্বামীকে মেরে তার অনুযায়ী কাজ করেছেন।
মুশকিল হলো, আমার বন্ধুর সন্তানদের পিছনে কেন লাগা? এ কোন ধরনের অসুস্থ মানসিকতা। তার কি নিজের সন্তানদের কথাও মনে পড়ে না?

ও হ্যাঁ, উল্লেখ্য, বন্ধুর হয়ে একটু গোয়েন্দাগিরি করতে হয়েছে (অতীব ঘৃণ্য কাজ) এবং জানা গেছে, স্ত্রীটির ভালোসংখ্যক বন্ধু-বান্ধব আছে, পুরুষের সংখ্যা তাঁদের মধ্যে নেহাত কম নয় এবং সেই সব বন্ধুদের সাথে আদি রসাত্মক কথা বার্তাও চলে। ভাগ্যিস ফেসবুকের ইনবক্স মেসেজ অপশনটি ছিলো! নইলে এইসব নীতিবাহকদের কী যে হতো!
বন্ধুকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম। যেহেতু সে কোন অন্যায় করেনি কাজেই তার কোন দায় নাই আর তার সন্তানদের সম্পর্কে নোংরা কথা বলতে পারে যে নারী সে নিজের সন্তানদেরও একই কাতারে ফেলে বলেই ধারণা! এই সব মানুষরূপী কীটদের পাত্তা না দেয়াই উচিত।
বন্ধুকে তো বুঝিয়ে আসলাম, কিন্তু মনে ভাবছি, কেন এমন? কেন একলা একজন নারীর চরিত্রে নোংরা ছিটানো এতো সহজ? এমনকি তার কৃতী সন্তানদের সম্পর্কেও? কবে আমরা এই অসুস্থ মানসিকতা থেকে বের হতে পারবো?

…হায় এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে…
আমার সকল মানসিক সংকটে আমার সন্তানরাই আমার বড় অবলম্বন। বাড়ী ফিরে আমার তিন সন্তানকে ফোন করলাম- তিনজন তিন মহাদেশে থাকে- সম্পূর্ণ ঘটনা জানিয়ে জিজ্ঞ্যেস করলাম, তাদের একাকী মাকে যদি এই অবস্থার মধ্য দিয়ে কোনদিন যেতে হয় তারা কিভাবে ঘটনাটা নেবে।

ইংরেজীতে সমস্বরে যে কথাটি আমার আত্মজরা বলে উঠলো, তার বাংলা দাঁড়ায়,’ অসুস্থ মানসিকতার লোককে করুনা করা ছাড়া আর কি করা যায়!!

আমার বড় ছেলে বলল,’ আমি তার পরিবারকে সাহায্য করবো তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে!”

আমার ছোট ছেলে বলল, মা, কিছু মনে করো না, প্রথমে আমি তার মুখে থুথু ছিটাবো, ফর সিওর মা। ইন গডস আর্থ নো ওয়ান ক্যান ডেয়ার টু সে এনি সিংগল আগলি ওয়ার্ড টু মাই মম! ইফ হি ইজ আ ম্যান আই উড রিপ অফফ হিজ ট্যাং! আই সোয়ার!”

ছোট ছেলেটি একটু বেশী রাগী আমার।

আমার কন্যা বলল,’ আহারে, আমার তার সন্তানদের জন্য করুণা হচ্ছে! সাচ আ সিক মাদার দে হ্যাভ! পুওর থিং!”
আমি এখন জানি…এ খাঁচা ভাংতে শুরু করেছে, সময় লাগবে, লাগুক…কিন্তু ভাংবে…বাঁশি বাজছে…তবলা বাজছে………………।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৩৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.