পোশাক: মেয়েরা যখন মেয়েদের শত্রু

0

Lesbianতামান্না ইসলাম। আমরা সব সময় বলি, ছেলেরা কেন আমাদের পোশাক নিয়ে কথা বলবে? তাদের ভয়ে কেন আমাদেরকে নিজেদেরকে ঢেকে রাখতে হবে? আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে শুধু ছেলেরাই নয়, আমরা মেয়ে হয়েও অহরহ একে অপরের পোশাক  নিয়ে সমালোচনা করে যাচ্ছি। সামনে এবং পিছনে।

স্কুল, কলেজে, কাজে, পার্টিতে, আড্ডায় সর্বত্র। আর এই সমালোচনার কারণে তৈরি হয় হীনমন্যতা, তৈরি হয় পিয়ার প্রেশার। সমালোচনাকে উপেক্ষা  করার বা সমালোচনার প্রতিবাদ করার মত সাহস সবার থাকে না। বরং, আমরা  নিজেকে বদলাতে থাকি অন্যদের সাথে খাপ খাওয়ানর  জন্য।

একটা মেয়ে কৈশোরে পা দেওয়ার সাথে সাথে, মনে এবং শরীরে বয়ঃসন্ধির ছোঁয়া লাগতে লাগতেই শুরু হয়ে যায় খালা , চাচী, প্রতিবেশীদের হিতোপদেশ। মায়ের বান্ধবীরা যাদের একই বয়সী বা আরেকটু  বড় মেয়ে আছে তারা সব খবর জোগাড় করে আনতে থাকে কোথায় পাওয়া যাবে সেই সদ্য ফোটা যৌবনকে ঢেকে রাখার উপযুক্ত আবরণ।

বয়ঃসন্ধির বিভ্রান্ত  ক্ষনে অবুঝ মেয়েটি ভুল করে ফেললেই মেয়ে তো মেয়ে, মাকেও শুনতে হয় বিভিন্ন বাঁকা  কথা, উপদেশ, সামনে এবং পিছনে। মায়ের সেই রাগ, ক্ষোভ গিয়ে পড়ে মেয়েটির উপরে।  এদিকে বয়সটা নিয়ম ভাঙ্গার, বান্ধবীরা নিত্য নতুন ফ্যাশন করছে, মন সেদিকেও টানে। ওই বয়সে কটা মেয়ের আর প্রবল ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়?

এমন কি সেই বয়স পেরিয়েও, তারুণ্যে, যৌবনেও এই সমালোচনা পিছু ছাড়ে না। একটা মেয়ে বেশী সিম্পল, আমরা তাকে বলি বোরিং, তার চটক নাই।  শাড়ি, গয়নার নিত্য নতুন খবর না জানলে, ডিজাইনার ব্র্যান্ড না জানলে সে আবার কেমন মেয়ে?

আঁতেল টাইপের কিছু একটা হবে, অসামাজিক বা কৃপণ, এদের সাথে বন্ধুত্ব হয় না। আবার কোন মেয়ে অতিরিক্ত আধুনিক পোশাক, সাজগোঁজ করলে সেটাও কারো কারো সমস্য।

ব্লাউজের গলা এতো ডিপ কেন? কামিজ এতো ফিটিং কেন? ওড়নাটা আরেকটু চওড়া  হতে পারতো না?  এর চেয়ে আর পাতলা শাড়ি বাজারে নাই? মেয়েরা আজকাল প্যান্ট পরছে, দেশটাকে আমেরিকা বানিয়ে ফেলেছে। আরও ভয়াবহ সমালোচনাও চলে পিছনে পিছনে, এই ফিগারে এই পোশাক! এই সব আউটফিটের জন্য স্কিনি ফিগার লাগে। সাজগোজের কোন মা বাপ নাই, বয়স যে কতো হয়েছে সেটা মনেই থাকে না। এই সব সমালোচনার মুখোমুখি বা আগে পিছে হতে কারোরই ভাল লাগার কথা না।

ফলাফল কি? নিজেকে বদলাও। নিজের যেটা ভাল মনে হয় বা শখ হয় সেটাকে লাগাম পরাও।

এর পরে আসি সম্পূর্ণ উল্টো দিকে।

একথা ঠিক যে গত কয়েক বছরে, আমাদের দেশে মেয়েদের পোশাক আশাকে বিপুল পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া যেমন লেগেছে, পাশ্চাত্যের প্রভাব পরেছে, সেই সাথে মধ্য প্রাচ্যের যথেষ্ট প্রভাব ও পরেছে। মেয়েদের বিরাট একটা অংশ হিজাব পরছে। যারা হিজাব পরে না, তাদের বেশীর ভাগেরই হিজাবিদের প্রতি মনোভাব অত্যন্ত বিরূপ এবং তারা সেটাকে ঢেকে রাখারও কোন চেষ্টা করে না।

ভাবটা অনেকটা এরকম হিজাবি মানেই মৌলবাদী, নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী, খ্যাত, প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। হিজাবিদেরকে অবজ্ঞা বা সমালোচনা করার এই মনোভাব থেকেই তাদের মনেও হীনমন্যতা তৈরি হয়। তারাও অন্য দশজনের সাথে মিলে মিশে থাকতে চায়।

একই আড্ডার, ফ্রেন্ড সার্কেলের অংশ হতে চায়। আমাদের দেশে এবং সমাজে স্মার্টনেস মাপার একমাত্র মাপকাঠি যেখানে পোশাক, সেখানে হিজাবিদের অন্য আধুনিক নারীদের মত সমান গুরুত্ব পাওয়ার একমাত্র পথ হলো মাথায় হিজাব রেখে একই  সাথে অঙ্গে, পোশাকের অন্যান্য অংশে, মেকআপে  সেই তথাকথিত স্মার্টনেস নিয়ে আসা।

কিছুদিন আগে উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত একটা লেখা নিয়ে বেশ তোলপাড় হয়েছিল “হিজাবিদের সেক্স অ্যাপিল  কি শুধু চুলে?” আসলে হিজাবিদের এই কনফিউজিং মিশ্র  রূপ হল গোটা সমাজের সাথে মিলে মিশে যাওয়ার একটা চেষ্টা। একজন কঠোর হিজাবি যত জ্ঞানী-গুণী উদারমনা হোক না কেন,  আধুনিক মেয়েরা তার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াবে না, বরং সমালোচনা করবে, বড় জোর ভদ্র ভাবে এড়িয়ে যাবে।

আমরা মেয়েরা কি পারি না এই জিনিসগুলোর পরিবর্তন আনতে? অন্তত আমরা নিজেরা কি নিজেদেরকে শোধরাতে পারি না? আমাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকতে পারে, শখ বা রুচি থাকতে পারে। সেই অনুযায়ী আমরা নিজেকে সাজাবো, পোশাক পরবো। কিন্তু অন্য একটি মেয়েকে তার জিনস বা ওড়না, হিজাব বা মিনি স্কার্টের মাপে না মেপে তাকে মানুষ হিসাবে মাপতে  পারি না?  

আসুন আজকে থেকেই আমি আপনি সবাই অন্যর পোশাক, সাজ গোঁজের সমালোচনা বন্ধ করি। সামনে এবং আড়ালে। আমাদের সমালোচনার জন্য যেন আর একটি মেয়েকেও পরিবর্তন হতে না হয়, ঢাকা ঢাকি  করতে না হয়, অথবা ইউ টিউবে বসে নতুন করে নিখুঁত মেকআপ শিখতে না হয়।

আমরাই হবো আমাদের শক্তি, আমাদের বন্ধু।  

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,২৯০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.