সাংবাদিক নই, রাজনের খালামনি বলছি

0

Mothers Day 1সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: এটা কী দেখলাম? কেন দেখতে গেলাম? কী বিভৎস দৃশ্য!

গতকাল বাংলাদেশ-সাউথ আফ্রিকা খেলা দেখার উচ্ছাস নিয়ে টিভির সামনে বসা অনেক মানুষ বুক চেপে ধরে, মাথা ঠেসে ধরে এমন কথা বলেছে। শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণী থেকে অনেক বৃদ্ধও গতকাল টিভির সামনে বসে ছিল খেলা দেখতে।

যে দর্শকদের অনেকে আজকাল চ্যানেলগুলোর একপেশে খবর প্রচার ও খুন, হত্যা, গুম, দুর্নীতির হিংস্রতার খবরগুলোতে উপস্থাপকের নাটকীয় উপস্থাপনায় অতীষ্ঠ হয়ে খবরের সময় টিভির রিমোটে চাপ দিয়ে অফ করে দেয়, গতকাল তারা টিভির খবর দেখেছে খেলা দেখার সময়ের ফাঁকে। এই খবরের বড় একটা অংশ জুড়ে ছিল শিশু রাজনের হত্যার দৃশ্য ভিডিও।

যা দেখে অনেক দর্শকই বীভৎসতায় অসুস্থ বোধ করেছে। আমার এক বন্ধুর নবম শ্রেণী পড়ুয়া ছেলে দৃশ্যটি দেখে ভয়ে বমি করেছে। ভাত খেতে পারেনি। রাতে ঘুমাতে পারেনি।

আমার জানা মতে ইস্পাত কঠিন আমার এক বন্ধু রাজনের সাথে তার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কোন দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ফোনে হাউ মাউ করে কেঁদেছে। সে বন্ধুটি রাজনের খবরটি দেখেছে ফেসবুকের ভিডিও লিঙ্ক থেকে। সহকর্মীদের অনেককে দেখেছি ঘটনাটার জন্য মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন আচরণ করতে। আমি নিজেও কি কম কষ্ট পাচ্ছি?

কথা হচ্ছে যারা এমন নির্মম নিষ্ঠুর আচরণ করেছে তারা তো সকল হিংস্রতাকে হার মানিয়েছে। যারা এই ভিডিওটি ফেসবুকে, ইউটিউবে যেভাবে ছড়িয়েছে তা কতটা নীতির মধ্যে পড়ে আমার বোধগম্য নয়। কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলো এই ভিডিওটি দেখানোতে কতটা প্রচার নীতিমালা অনুসরণ করেছে সেটা তো আমাদের অজানা নয়।

যে দৃশ্যগুলো দেখে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে সেই দৃশ্য প্রচার করা কোন ধরনের বিনোদন তা নীতিনির্ধারকরা একবার ভেবে দেখবেন আশাকরি।

আমিও ঘটনাটি যেভাবে জেনেছি, দেখেছি তাতে সুস্থতা আমার মাঝেও নেই। তবুও আমার সামান্য দায়বদ্ধতা আমাকে মুক্তি দেবে যদি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটনোর আগে টিভি চ্যানেলগুলো একবার ভেবে দেখে।

রবিবার সকালে বাসে করে আমি ঢাকার সাভার থেকে ফিরছিলাম। ব্যাগে ফোন বাজছে।

অনেকটা বিরক্তি নিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম আমার এক ভাগনি। সে অনেকটা আতঙ্কিত গলায় জরুরি বলে শুধু বলল, খালামনি এসব কী দেখছি ফেসবুকে? ঘটনা কি সত্যি? কি দেখেছো জানতে চাইলে রাজনের ঘটনাটি বলে।

আমার নিকটাত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব অনেকে উদ্ভট, বীভৎস, রোমাঞ্চকর ও ভয়ানক কোন খবর পেলে ঘটনার নিশ্চয়তার জন্য আমাকেই ফোন করে। আমি বললেই তবে তারা কিছুটা নিশ্চিত হয়।

প্রথমে খানিকটা খেই হারিয়ে চুপ হয়ে যাই। ফোন কেটে যায়, ফোনটি আবার বেজে ওঠার শব্দে সম্বিত ফিরে পাই।

সে শুধু বলছে, একি দেখলাম খালামনি! একি দেখলাম! এটা কি সত্যি? খোদা, এটা যেন কোন অভিনয়ের দৃশ্য হয়! খালামনি তুমি দেখতে যেওনা ভিডিওটি। শুধু নিশ্চিত করো এটা সত্যি ঘটনা কিনা।

আমি দেখছি, বলতেই সে আবার চিৎকার করে বললো, ভিডিওটি দেখতে যেও না, খালামনি। সহ্য করতে পারবে না। আমি বললাম, খোঁজ নিচ্ছি। তারপর ফেসবুকে ঢুকলাম। সত্যিই এমন একটা ঘটনার লিঙ্ক যা দেখার সাহস আমার হলো না। শত শতবার শেয়ার দেয়া হয়েছিল তখনেই। আমি সিলেটে আমার পরিচিত সাংবাদিক ও বন্ধুদের ফোন দিলাম। তারা জানালো ঘটনা নির্জলা সত্যি।

বিস্তারিত বলতে থাকলো, আমি কিছু কথা শোনার পর বার বারই খেই হারিযে ফেলছিলাম। কথা শেষ হয়ে যাচ্ছে, ফোন কেটে যাচ্ছে, আমার চোখে ফেসবুকে খুঁটিতে লটকানো একটি শিশুর কান্নার্ত মুখ ভাসছিল। যেন চিৎকার করে শিশুটি আমাকেই বাঁচাতে বলছে। আমার কাছেই যেন পানি খেতে চাচ্ছে।

আমাকেই যেন বলছে, খালামনি, আমি মরে যাচ্ছি, আমার চোখদুটো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পিপাসা ও যন্ত্রণায়। চোখ দুটো বন্ধ হওয়ার আগেই তুমি আমার মাকে নিয়ে এসো আমার সামনে। আমি যেন একবার দেখে নিতে পারি শেষবারের মতো!

কানে বাজছে, খালামনি—-! খালামনি——! খালামনি——।

নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে বার বার দেখেছি আমার হাত-পায়ের নখগুলো কতটা হিংস্র হলে হায়েনার চেয়ে বেশি হিংস্র দেখায়। মুখটি ছুঁয়ে দেখেছি কতটা বীভৎসতা দেখে দেখে রাজন ভয়ে চোখ বন্ধ করেছে। দাঁতগুলোতে আঙুল ছুঁয়ে দেখেছি কতটা ধারালো ও তীক্ষ্ণতা নিয়ে সেগুলো কামড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে ছোট্ট রাজনের কলিজা!

বারবারই মনে হচ্ছিল, আমরা সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী মানুষ!

বিকেলে বাস থেকে নেমে উন্মাদের মতো ঘরে ঢুকে টিভি ছেড়ে দিলাম। একি! সবগুলো চ্যানেলের স্ক্রলে যাচ্ছে খবরটি। আমি শুধু স্ক্রল দেখতে দেখতে চ্যানেল ঘুরাচ্ছিলাম। যদি এমন কোন চ্যানেল বলে দেয়, খবরটি ‍ভুয়া! আজকাল তো কত ভুয়া খবর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। কত কাল্পনিক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভিডিওসহ কথাটি লিখে ফেসবুক ও চটি নিউজ সাইটগুলোতে ছড়াছড়ি হয়। খুব বিরক্তি নিয়ে আমি সব সময় ফেসবুকের সেই আইডিগুলোকে ও সাইটগুলোকে ব্লক করতাম।

কিন্তু আজ যদি কোন চ্যানেল এই খবরটি ভুয়া বলে নিউজ দিতো আমি খুব খুশি হতাম। চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে হঠাৎ এক চ্যানেলে দেখলাম ফেসবুকে শেয়ার দেয়া শিশুটির ছবি এবং ভিডিও নিউজ স্ক্রিনে। যেখানে শিশুটি ঘুরে ঘুরে সে ‘চোর নয়’ বলে চিৎকার করছে। ভয়ার্ত চোখে পানি খেতে চাইছে। আধবোজা চোখে কাতরাচ্ছে। হাতপা বাঁধা অবস্থায় আধঝোলা অবস্থায় পড়ে আছে। আমি আর দেখতে পারিনি। নিজেও চিৎকার করে কেঁদেছি। আমিও খেতে পারিনি। ঘুমের ঔষধ নিয়েও ঘুমাতে পারিনি।

ন্যুনতম পেশাদারিত্ব ও দায়বোধ থাকলে কোন সাংবাদিক এমন ছবি দেখাতে পারে না। বিশ্বব্যাপী নানা সহিংসতা খবরের যখন বীভৎস ছবি দেখায় না কোন সভ্য দেশ, তখন মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ইতর জাতিদের মতো আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোও প্রতিযোগিতা করে বীভৎসতা দেখায়।

টুইনটাওয়ার ধ্বংসের কোন হতাহতের ছবি প্রকাশ করেছিল মিডিয়া? তাই বলে কি এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বাসযোগ্য হয়নি কারো কাছে? বন্দুকধারীর গুলিতে যখন স্কুলের শিশুদের হত্যা করা হয় উন্নত দেশে তার কোন ছবি দেখা যায় না। কিন্তু পাকিস্তানের মতো বর্বর দেশ দেখিয়েছে।

এর আগেও বাসে পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়িয়ে মারা বীভৎস লাশের ছবি দেখিয়েছে চ্যানেলগুলো প্রতিযোগিতা করে। বিশ্বজিৎকে কোপানোর দৃশ্য দেখিয়েছে, মিরসরাইয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের কুপিয়ে মারার দৃশ্য দেখিয়েছে। বিশ্বজিৎকে তো টিভি ক্যামেরার সামনেই কুপিয়েছিল, সাংবাদিকরা তখন তাকে বাঁচানোর বদলে ছবি তুলতে ব্যস্ত ছিল। ভাগ্যিস কেউ তাকে ওই মূহূর্তে জিজ্ঞাসা করেনি, ‘আপনার এখন কেমন লাগছে?’

টিভিওয়ালাদের ভাষ্য, বীভৎসতা না দেখালে সাধারণ মানুষ বুঝবে কী করে! তাদের মধ্যে এই বীভৎসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইচ্ছা জাগবে কীভাবে! মানুষের ভিতরে মানবিকতা জাগানোর জন্যই তাহলে এসব দৃশ্য পরিবেশন করা? নইলে মানুষ মানবিক হতে পারবে না? কী অসাধারণ ব্যাখ্যা!

সংবাদ ও সাংবাদিকতার ঈশ্বর বলে যারা উ্চ্চ আসনে থেকে টিভি চ্যানেলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জন্য তাদের কি কোন রকম দায়বদ্ধতা রাখতে পারছেন একবার ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।

সাংবাদিক ও লেখক

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.