রাজনের চোখ দুটো দেখতে চেয়েছিলাম

0

3_Sylhet-Child-Murder-9নাজিয়া জেরিন হোসেন: আমি শুধু রাজনের চোখ দুটো দেখতে চাইছিলাম। মিলিয়ে নিতে চাইছিলাম আমার ছেলের চোখের সাথে। ও যখন ভয় পেয়ে যায় তখন কি ওর চোখ দুটো এমনই দেখায়? না অন্যরকম। আমি দীর্ঘ ১২ মিনিট ভিডিওটা দেখলাম, চেষ্টা করলাম চোখ দুটো দেখতে।

কিন্তু বিশ্বাসঘাতক তো আমার নিজেরই চোখ দুটো। পারা গেল না। আমি ভাঙলাম, যতবার দেখার চেষ্টা করলাম ভেঙ্গে ভেঙ্গে লুটিয়ে পড়লাম। তাই বলে এখন কি আমার খুব আত্মপ্রসাদ অনুভব করা উচিত? যে আমি হয়তো এখনো কিছুটা  হলেও মানুষ আছি? মানুষ মনুষ্যত্ব এই শব্দগুলো এখন কেমন যেন গালির মতো মনে হয়।

কারও নিকৃষ্টতা বা নিচতা বোঝাতে কোন পশুর নাম নেয়ার কোন মানে হয় না। ছেলেবেলা থেকেই ‘কুকুর’ শব্দটা সাধারণ একটা প্রাণীর নাম হিসেবে যতবার না শুনেছি, তার থেকে বেশি শুনেছি গালি হিসেবে। কিংবা বিড়ালের মত বিশ্বাসঘাতক বা সাপের মত ধূর্ত। মাঝে মাঝে মনে হয় প্রাণী জগতের বাকি সবার কথা যদি বুঝতে পারতাম। ওরা নিশ্চয় আমাদের নিয়ে হাসে। সব পশুর পশুত্ব মিলিয়ে এক করে দিলেও কি একটা মানুষের সমান হয়? হয়তো হয় না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কল্যাণে দেখতে পাচ্ছি। আবার সবাই প্রশ্ন তুলছে মানবতা কই? কোনো একজন মানুষ কি ছিল না সেখানে? আমরা যারা এই প্রশ্নগুলো তুলছি আমরা যদি ব্যক্তিগতভাবে সেখানে থাকতাম কি করতাম? কি করতে পারতাম?

কিচ্ছু না। একটা বড় অংশের মানুষ পাশ কাটিয়ে চলে যে্তেন জানের মায়ায় বা প্রিয়জনের মুখের কথা চিন্তা করে। কিছু মানুষ পুরো বিষয়টা ভিডিও করতেন এবং ইন্টারনেট এ ছেড়ে দিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করতেন, আমি আর কিছু  করতে না পারি গণসচেতনতা তো তৈরি হবে।

একেবারে সামনে গিয়ে এটা অন্যায়, এটা বন্ধ কর, বলার সাহস কারও কি অবশিষ্ট আছে? একটা মানুষের? সবার প্রশ্ন ঘাতকদের কি বিচার হবে না? কি হবে আর বিচার করে? আজ যদি একজন ঘাতকের কঠিন কোন বিচার হয়, কাল কি এই ঘটনাগুলো বন্ধ হবে?

ন্যায়-অন্যায়, মানবিকতা-অমানবিকতার পার্থক্য করার জন্য আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশটা আছে সেই অংশটা তো ঘুমিয়ে গেছে চিরতরে অনেক আগেই তার ঘুম কি আর কোনদিন ভাঙবে? প্রতিদিন এতো এতো ঘটনা কোনটা আমরা বন্ধ করতে পারছি?

আমাদের নিজেদের স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতায় তো ঘুণ ধরেছে। গোল্ড ফিশের মেমোরির মত সন্ধ্যায় রাজনের জন্য কান্না করে, রাতের খাবারে ক্রিকেট নিয়ে তুমুল উত্তেজনা আর খুশী। কাল সকালে দেশ নিশ্চয় আমাদের আর কয়েকটা ধর্ষণ আর খুন উপহার দেবে। অতএব কালকের উত্তেজনার উপকরণ তো তৈরি। তাই আর চিন্তা কি!

আমি ব্যক্তিগতভাবে এই মুহূর্তে যতই রাগ আর হতাশা দেখাইনা কেন আমার নিজের কাছেও কি মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ব ফিরিয়ে আনার বীজমন্ত্রটি আছে? না নেই। কাজেই আমার মত সহমত মানুষগুলোর কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কোন গতি নেই। যদি কারো কাছে থাকে সেই বীজমন্ত্র প্লিজ একবার আসুন একবার সামনে এসে দাঁড়ান।

পরিশেষে নিজের কথা বলি, আজ থেকে আমার মনুষ্যত্বের অধিকার ছেড়ে দিলাম। নিজেকে মানুষ ভাবার থেকে জন্তু-জানোয়ার ভাবাটাই অনেক সাচ্ছন্দের। এই যুগে পশুর ভালবাসার ক্ষমতা বা মানবিক গুণ মানুষের থেকে বেশী। তাই পশুত্ব বরণ করছি।

পুনশ্চঃ আমার এক বড়ভাই প্রায়ই আমাকে বলেন, রাগবেন না, রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। হেরে গেলে ক্ষতি নেই, আমিতো হারতেই চাই, তবু এমন একটা দিন আবার ফিরে আসুক যখন নতুন করে মানুষ হবার ইচ্ছেটা ফিরে আসবে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৫০১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.