জন্ম ও মৃত্যু দুটোই যখন আড়ম্বরের

Frida_Kahlo_(self_portrait)ফারহানা রহমান: সৃজনশীল জগতের এক বিস্ময় ফ্রিদা কাহলো জন্মেছিলেন বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে (৬ জুলাই ১৯০৭)এক বৃষ্টিস্নাত দিনে, যে সময়টা ছিল নারীর জন্য উপেক্ষা  ও স্বীকৃতির দোলাচলের এক সন্ধিক্ষণ। তাঁর ঘটনাসংক্ষুব্ধ বর্ণিল জীবন, আত্মসম্মোহনের ব্যাখ্যাতীত শিল্পকর্মসমূহ ও রহস্যময়তার আবরণ, যা শিল্পামোদী মহলে ভীষণভাবে আকর্ষিত ও  আলোচিত হয়ে আসছে বহু  যুগ ধরে, -সেটা অল্পকথায় লিখে শেষ করা আমার পক্ষে এখন সত্যি অসম্ভব মনে হচ্ছে।

আজ ১৩ জুলাই, ফ্রিদা কাহলোর ৬১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ভেবেছিলাম এদিনে তাঁকে নিয়ে সংক্ষেপে কিছু লিখবো, তাঁর ডায়েরি আর বায়োগ্রাফি পড়তে পড়তে নারীর চোখ দিয়ে এমন এক সংগ্রামী, ব্যতিক্রমি ও  দুঃখী নারীকে আবিষ্কার করলাম, যার শরীর তাঁকে ভয়াবহ যন্ত্রণা দিয়েছে ,আর সে মনে-প্রাণে ভালবেসেছে এমন এক মানুষকে, যে ছিল আজীবন ব্যভিচারি ও বহুগামিতায় আসক্ত।

সন্তান ধারণে অক্ষম ফ্রিদা মাতৃত্বের লোভে আকুল হয়ে থেকেছেন প্রতিমুহূর্তে, আর যার প্রত্যেকটি ছবি হচ্ছে বেদনা ও অক্ষমতার এক একটি মহাকাব্য, যা শুধু  ফ্রিদার  পক্ষেই আঁকা সম্ভব বলে মনে হয় আমার। ফ্রিদা সম্পর্কে  যতই পড়েছি মনে হয়েছে  এমন বর্ণীল জীবনকে সংক্ষেপ করা খুব কঠিন কাজ। তাই আসলে আমাকে এখন একটা  সম্পূর্ণ বই-ই লিখে ফেলতে হবে বলে মনে হচ্ছে। যাহোক তবুও খুব সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করছি।

কিংবদন্তী প্রতিবাদী সংগ্রামী ও অকুতোভয় নারী চিত্রশিল্পী ফ্রিদা  কাহলো! জীবনভর যাকে নানা অঘটন আর আকস্মিকতায়  শারীরিক  ও মানসিক নানা যন্ত্রণায়, বেদনায় নীল হয়ে কাটাতে  হয়েছে। তাঁর স্যুররিয়ালিস্ট ছবিগুলো পরাবাস্তববাদী  রূপান্তরের সঙ্গে ক্লাসিক মেক্সিকান ধর্মীয় ঐতিহ্যের উপাদান সংযুক্ত করেছে, যা বিংশ শতাব্দীর শিল্পকলার জগতের মানুষের মনকে ভীষণভাবে  বিস্মিত ও চিন্তিত করেছে।

ফ্রিদার ছবি থেকে তাঁর নিজের একান্ত ব্যক্তিগত  কষ্ট-যন্ত্রণা-হাহাকার ছিঁড়ে-ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে যেভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে, সেটা দর্শকের পক্ষে সহজে গ্রহণ করা যেমন মুশকিল ছিল, তেমনি সে প্রতিবাদ উপেক্ষা করাও সম্ভব ছিল না কারো পক্ষে। তাই ছবিগুলো শিল্পমোদী জগতের মানুষের বিবেককে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিয়েছিলো।   

মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলের এক শহরতলি কইওয়াকানের ব্লু নামক বাড়িটিতে জন্মেছিলেন ম্যাগদালেনা কারমেন ফ্রিদা কাহলো কালদেরন।  তাঁর বাবা ১৯০৪ সালে এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। ফ্রিদার  জীবনের একটি দীর্ঘ সময় কেটেছে এই নীল বাড়ির প্রকৃতির সম্ভারে। এখানে তাঁর জীবনের শুরু এবং শেষ। গুলেরমো এবং মাতিলদা কাহলোর তৃতীয় সন্তান তিনি। ফ্রিদার বাবা উইলহেম গুলেরমো(১৮৭২-১৯৪১) কাহলো ছিলেন পেশাদার ফটোগ্রাফার। একজন শৌখিন চিত্রশিল্পীও ছিলেন তিনি। ফ্রিদার ছোটবেলায় তাঁকে তিনি ক্যামেরার ব্যবহারও শিখিয়েছিলেন।  

শৈশবেই ফ্রিদা ছিলেন খুব চঞ্চল প্রকৃতির একটি শিশু। মাত্র ছয় বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে সারা জীবনের জন্য তাঁর ডান পা সরু ও দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু মেধাবী ফ্রিদা একনিষ্ঠ সাধনার ফলে সব ধরনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯২২ সালে মেক্সিকোর অন্যতম সেরা স্কুল এসকিউলা ন্যাশনাল প্রিপারেটরিতে ভর্তি হন।

ফ্রিদা তখন প্রিপারেটরি স্কুলের ছাত্রী; সে সময় দিয়েগো রিভেরা সবে ফ্রান্স থেকে ফিরেছেন, আর নিজ দেশ মেক্সিকোতে এসে ফ্রিদাদের স্কুলের প্রেপার অ্যাম্ফিথিয়েটারের দেয়ালে তাঁর প্রথম ফ্রেসকো ম্যুরাল “ক্রিয়েশন” শুরু করেছেন। তিনি  মেক্সিকোর বিখ্যাত ম্যুরাল শিল্পী। তাঁর সময়ে দিয়েগো ‘মাস্টার অফ ম্যুরালস্’ নামে খ্যাত ছিলেন।লুকিয়ে লুকিয়ে দিয়েগোর ম্যুরাল তৈরি দেখতে দেখতে ফ্রিদা একসময় তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়লেন।  
Kahloকিন্তু দুঃখ ও দূর্ঘটনা যেন ফ্রিদার নিয়তি। ১৯২৫ সালের ১৭  সেপ্টেম্বর এক ভয়ঙ্কর এক বাস দুর্ঘটনা তাঁর জীবন ওলটপালট করে দিলো। এর ফলে ভেঙে যায় তাঁর মেরুদণ্ড, পাঁজর, কলারবোন ও পেলভিস।  চুরমার হয়ে যায় ডান পা; তাতে এগারোটা ফ্রাকচার হয়। নড়ে যায় কাঁধের হাড়। আর যে ব্যাপারটা ফ্রিদার জীবনকে একেবারেই তছনছ করে দেয়, তা হচ্ছে একটি অযাচিত লোহার দণ্ড। যা ভেদ করে যায় তাঁর উদর আর জরায়ু। আর সেই পেলভিস্ এবং জরায়ুর কঠিন আঘাতের  ফলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণে নিষেধাজ্ঞা  জারী হয় তাঁর উপর। প্রচণ্ড  মানসিক জোরের কারণে ফ্রিদা বেঁচে উঠলেন ও একসময়  আবার  হাঁটতেও শুরু করলেন ঠিকই। কিন্তু তাঁর আজীবনের সঙ্গী  হয়ে রইলো বিভীষিকাময়  প্রচণ্ড ব্যথা বেদনা। দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে  ছটফট করতে করতেই তিনি হাতে তুলে নেন রং তুলি ও ক্যানভাস।

নিজের কাজ সম্পর্কে দিয়েগো রিভেরার মতামত জানার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী ছিলেন ফ্রিদা। তিনি নিজের আঁকা চারটি ছবি নিয়ে মিনিস্ট্রি বিল্ডিং এ যান তিনি যেখানে ম্যুরাল আঁকার কাজ করছিলেন দিয়েগো। যে  ছবিগুলো তিনি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন তার মধ্যে তাঁর আঁকা প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি “সেল্ফ পোর্ট্রেট ইন আ ভেলভেট ড্রেস” ছবিটি ছিল।  ফ্রিদার আঁকা ছবি দেখে রিভেরা বললেন, ‘ তোমার  প্রতিভা আছে…’। তাঁকে তিনি ছবি আঁকা চালিয়ে যেতে বললেন।

১৯২৬ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত সময়ে ফ্রিদা এক ডজনের উপরে ছবি আঁকেন। প্রথমদিকে ছবিগুলো আত্মপ্রতিকৃতির ছিল কারণ শারীরিক অক্ষমতায় এসময় খাটের পাসের আয়নায় তিনি নিজেকে দেখতে পেতেন এবং সেই অনুযায়ী আঁকতেন।

ফ্রিদা এবং দিয়েগো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ১৯২৯ সালের ২১ আগস্ট। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শুধুমাত্র ফ্রিদার বাবা ও কয়েকজন খুব নিকট বন্ধু বান্ধব। রিভেরা ও ফ্রিদা প্রথম সংসার পাতেন দিয়েগোর ১০৪ পাসেও দ্য লা রিফরমার বাড়িতে। রিভেরার বাড়িটি ছিল দায়াজ একনায়কতন্ত্রের আমলে নির্মিত বিরাট এক বাড়ি, যার বাইরের অংশে ছিল ফরাশি গথিক স্টাইলের। এসময় ফ্রিদার  কাজগুলোতে দিয়েগোর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। চিত্রকর্মগুলোর প্রেক্ষাপটে ছিল উজ্জ্বল রঙের ব্যাবহার যা দিয়েগো করতো। এই বিয়ে যে ফ্রিদার  জীবনে কোন শান্তি আনতে পারেনি এর  পিছনে মূল কারণ হিসেবে ধরা হয় দিয়েগোর বহুগামিতাকে। প্রকৃতপক্ষে দিয়েগোর একাধিক নারীর প্রতি আকর্ষণ, পরবর্তী সময়ে ফ্রিদার  বারবার পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়া,  তাদের স্বল্পকালীন বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ এবং সর্বোপরি দিয়েগোর প্রতি প্রবল দৈহিক ও আত্মিক প্রেমের গভীর অনুভূতি তাদের দাম্পত্যজীবনে এক অনন্য ব্যঞ্জনা তৈরি করেছিলো। পরে জীবন সম্পর্কে  বলতে গিয়ে ফ্রিদা মন্তব্য করেছিলেন, “আমার জীবনে দুটো মারাত্মক দুর্ঘটনা, একটি বাসের দুর্ঘটনা, অপরটি হচ্ছে দিয়েগো।”

বিশ দশকের শেষের দিকে মেক্সিকোর রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এসময় ১৯৩০ সালে সানফ্রানসিসকো স্টক এক্সচেঞ্জ লাঞ্চিয়ন ক্লাব ও ক্যালিফোর্নিয়ার স্কুল অব ফাইন আর্টস দিয়েগোকে অ্যামেরিকায় ম্যুরালের কাজ করার জন্য কমিশন দেয়। রিভেরার উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবী শিল্পকলাকে আমেরিকার মত একটি পুঁজিবাদী দেশে নিয়ে আসা। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন শিল্পকলা শুধুমাত্র কৃষকশ্রেণীকেই নয় বরং অভিজাত, বিত্তবানদেরকেও বদলে দিতে পারে।   

ফ্রিদা প্রায়ই মেক্সিকোর তেহুয়ানা অঞ্চলের নারীদের পোশাক পরতেন।

মাটি পর্যন্ত লম্বা প্রচুর কারুকাজ করা এই পোশাক যে শুধু সুন্দর ছিল তা নয় এটি তাঁর পায়ের শারীরিক অসঙ্গতি আড়াল রাখার পক্ষেও সুবিধাজনক ছিল। এর সঙ্গে তিনি বিভিন্ন নকশার আংটি, প্রি-কলাম্বিয়ান জেড পাথরের কণ্ঠহার, অলংকৃত লকেট, কানের দুল পরতেন। তাঁর নতুন নতুন স্টাইলের কেসসজ্জা আর অনুপম প্রশাধন  তাঁকে করেছিলো সবার চোখে অনন্যা। তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন এক নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড, এক মানবরুপী শিল্প। বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর সময় এ পোষাকের কারণে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতেন ফ্রিদা। বিয়ের দেড় বছর পর ১৯৩০ সালে সানফ্রানসিসকোতে তিনি “ ফ্রিদা ও দিয়েগো রিভেরা” ছবিটি আঁকেন। এখানে বিশাল রেভারার পাশে ছোট্ট ফ্রিদাকে তেহুয়ানা পোশাকটি পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়।

ফ্রেসকোর কাজ শেষ হয়ে গেলে ১৯৩১ সালের জুন মাসে দিয়েগো দম্পতি মেক্সিকোতে ফিরে আসে। কিন্তু একবছর পর ১৯৩২ আবারও ডেট্রয়েটে ইন্সটিটিউট অফ আর্টসের আভ্যন্তরীণ কোর্ট ইয়ার্ডে ফ্রেসকো করার আমন্ত্রন পান ইউলিয়াম ভেলেন্তিনার কাছ থেকে। এসময় ফ্রিদা অন্তসত্তা হয়ে পড়েন। যদিও ১৯৩২ সালের ৪ জুলাই তাঁর গর্ভপাত হয়ে যায়। এতে ফ্রিদা অত্যন্ত মুষড়ে পড়েন। এসময় তিনি “ হেনরি ফোরড হাসপাতাল” “ফ্রিদা এন্ড এবরশন” ইত্যাদি বিখ্যাত ছবিগুলো আঁকেন।  

১৯৩৩ সালের মার্চ মাসের ১৩ তারিখে দিয়েগো আনুস্থানিকভাবে ডেট্রয়েটের ম্যুরালের কাজ শেষ করেন এবং ডিসেম্বরের ২০ তারিখে মেক্সিকোর উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক ত্যাগ করেন। ১৯৩৪ সাল থেকে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হতে থাকে আর একসময় তা সহ্যের বাইরে চলে গেলে ফ্রিদা ১৯৩৫ সালের প্রথমদিকে সান এঞ্জেলের বাড়িটি ত্যাগ করে মেক্সিকো শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি আধুনিক ফ্ল্যাটে উঠে যান। এসময় তিনি মানুসিকভাবে ভীষণ একাকি হয়ে পড়েন ও নানা সম্পর্কে জড়াতে থাকেন। এমনকি তিনি সমকামী সম্পর্কেও জড়িয়ে  পড়েন। ফ্রিদার প্রেমের সম্পর্কগুলোর মধ্যে ট্রটস্কির মত বিখ্যাত ব্যাক্তির সঙ্গে প্রেমটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

Farhana Rahman
ফারহানা রহমান

এছাড়াও তাঁর আরেকজন বিখ্যাত প্রেমিক ছিলেন ভাস্কর ইশামু নগুশি। নগুশি মেক্সিকো এসেছিলেন ম্যুরালের কাজ করতে ১৯৩৬ সালে এবং এসময় তিনি ফ্রিদা ও তাঁর কাজের প্রেমে পড়ে যান। একসময় দিয়েগো এ সম্পর্কের কথা জানতে পেরে বন্দুক দিয়ে নগুশিকে ভয়ভীতি দেখায় ফলে এ সম্পর্কের ইতি ঘটে। ট্রটস্কির সাথে পরিচয় ও প্রেম ফ্রিদার জীবনের একটি বিশেষ ঘটনা। ট্রটস্কি মেক্সিকোতে আসেন ১৯৩৭ সালে এবং ফ্রিদার নীল বাড়িতে অবস্থান করেন। এই বিপ্লবী নেতার প্রত্যয়ী স্বভাব ফ্রিদাকে আকৃষ্ট করে। এবার ট্রটস্কির স্ত্রী সম্পর্কটি আঁচ করতে পারেন এবং এই দম্পতি ফ্রিদার নীল বাড়ি ত্যাগ করে চলে যাওয়াতে তাদের প্রেমেরও ইতি ঘটে। এসময় ফ্রিদা আরও নিবিড়ভাবে ছবি আঁকতে শুরু করেন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত বিসটিরও ওপরে ছবি একেছিলেন তিনি।  

১৯৩৮ সালের ১ নভেম্বর ফ্রিদার একক প্রদর্শনীর উদ্বোধনলগ্নে নিউইয়র্কের জুলিয়েন লেভি গ্যালারী ছিল দর্শক সমাগমে পরিপূর্ণ। এক কথায় এ প্রদর্শনী ছিল অত্যন্ত সফল। এসময়টিতেই তিনি আলোকচিত্রী নিকোলাস মারের সাথে প্রণয় ঘটিত সম্পর্কে আবারও  জড়িয়ে পড়েন।

১৯৩৯ সালের জানুয়ারিতে ফ্রিদা একটি প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার জন্য প্যারিসে আসেন। নানা প্রতিকুলতা ও বাঁধা কাটিয়ে শেষে মার্চের ১০ তারিখে প্যারিসের পিয়্যের কোল গ্যালারীতে প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। ল্যুভর জাদুঘরের জন্য সেখান  থেকে তাঁর “দি ফ্রেম” ছবিটি কেনা হয়।

একই বছরের গ্রিস্মে ফ্রিদা নিকলাসের সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে মেক্সিকোতে তাঁর স্বামীর কাছে ফিরে আসেন কিন্তু ততদিনে ছোটবোন ক্রিস্টিনার সাথে রিভেরার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ফলে ৬ নভেম্বর এই  আলোচিত দম্পতির আনুস্থানিকভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। হতাশার চরমলগ্নে ফ্রিদা এসময় নিজের চুল কেটে প্রতিবাদ জানান এবং ১৯৪০ সালে তাঁর ভীষণভাবে বিখ্যাত ছবি “ সেলফ পোরট্রেড উইথ ক্রপড হেয়ার” আঁকেন। 

দিয়েগো রিভেরা থেকে বিচ্ছিন্ন ফ্রিদা, ছবিতে তাঁর প্রিয় মেক্সিকান গাউন নেই, দৃষ্টিতে কোন জীবনের ছোঁয়া নেই, তাঁর প্রিয় কেশগুচ্ছ পুরুষের মতো করে কাটা আর পুরুষের  পোশাকে ফাঁকা চেয়ারে একা বসে থাকা বিষণ্ণ ফ্রিদা, নিজের নারীত্বকে সমূলে উৎপাটিত করেছে। যদিও দিয়েগোর বহুগামিতার ফলে ফ্রিদার ভীষণ মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে তথাপি দিয়েগোর প্রতি সারাজীবন প্রবল আকর্ষণ ও ভালোবাসা বোধ করেছে ফ্রিদা আর একইভাবে দিয়েগোও তাঁকে ভালবেসেছিল। তাই পরস্পর থেকে বেশিদিন দূরে থাকতে পারেননি তাঁরা; ১৯৪০ সালের ৮ ডিসেম্বর, দিয়েগোর ৫৩ তম জন্মদিনে তাঁরা দ্বিতীয়বারের মত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

একাধারে কয়েক বছর ইউরোপ এবং আমেরিকায় তাঁর একাধিক প্রদর্শনী শেষে ১৯৪৩ সালে এডুকেশন মিনিস্ট্রিস্ স্কুল অব ফাইন আর্টসে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ফ্রিদা।
  
১৯৫১ সালে ফ্রিদার স্বাস্থ্য এতোই খারাপ হলো যে কিছুদিন তাঁর ছবি আঁকা সম্পূর্ণরুপে বন্ধ ছিল। জীবনের শেষ বছরগুলোতে প্রধানত স্টিল লাইফ আঁকেন ফ্রিদা। এসময় তাঁর ছবিগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব লক্ষ করা যায়। ১৯৫৪ সালে আঁকা তাঁর সর্বশেষ আত্মপ্রতিকৃতিগুলোর একটি ‘মার্ক্সইজম উইল গিভ হেলথ টু দ্য সিক’ পিসিএম-এর পক্ষে  এক শক্তিশালী রাজনৈতিক  বক্তব্য। কমিউনিস্ট থিম এর উপর পরে আঁকা একটি ছবি ‘সেল্ফ পোর্ট্রেট উইথ স্টালিন।’ ১৯৫৪-এর জুলাইয়ে  যখন ফ্রিদা মারা যান তাঁর স্টুডিওতে ইজেলের উপর স্টালিনের একটি অসমাপ্ত প্রতিকৃতি পাওয়া যায়।

ফ্রিদার ছবির বিষয়বস্তুতে যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি, সে হচ্ছে তাঁর নিজের জীবন। তাঁর কাজগুলো প্রায়শই দর্শককে এক ধরণের কষ্টের অনুভুতির মুখোমুখি করে। ফ্রিদার আঁকা ১৪৩টি পেইন্টিং-এর মধ্যে  ৫০টিই তাঁর নিজের প্রতিকৃতি, যার মধ্যে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই  প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শারীরিক এবং মানসিক ক্ষত। বিশেষত আত্মপ্রতিকৃতিগুলোতে তাঁর জীবনের ঘটনা কিংবা জটিলতা: তাঁর শারীরিক অবস্থা, সন্তান ধারণে অক্ষমতা, প্রকৃতি ও  তাঁর জীবন দর্শন আর সবার উপরে দিয়েগোর সাথে অশান্ত-উদ্বেগপূর্ণ সম্পর্কের চিত্র ফুটে উঠেছে।

১৯৫৩ এর বসন্তে জীবিতাবস্থায় ফ্রিদার একমাত্র এবং বহুপ্রত্যাসিত  চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় মেক্সিকোতে। ফ্রিদার শরীর ভয়ংকরভাবে ভেঙ্গে গেছে সে সময়। নানা ধরনের মেকআপ ব্যবহার করেও চেহারার বিবর্ণতা লুকানো আর সম্ভব ছিল না।  ডাক্তারের মানা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই প্রদর্শনীতে পৌঁছালেন ফ্রিদা। মোটর সাইকেল শোভাযাত্রাসহ একটি এম্বুলেন্সে করে  হাসপাতালের স্ট্রেচারে শুয়ে হাজির হন তিনি। ফটোগ্রাফার এবং সাংবাদিকরা বিস্মিত হয়ে গেলো। তাঁকে নিয়ে রাখা হলো গ্যালারির মাঝখানে। দর্শকরা একে একে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলো। ফ্রিদা দর্শকদের সাথে নানা ধরনের কৌতুক করলেন আর উচ্চহাসিতে উদ্ভাসিত করলেন হলরুম। গান  গাইলেন তাদের সাথে আর পান করলেন  সারাটি সন্ধ্যা ধরে। ভীষণ সফল একটি প্রদর্শনী হয়েছিলো সেটি।  

তবে সেটিই শেষ। ১৯৫৪ সালের ১৩ জুলাই ফ্রিদা মারা যান। ডায়েরিতে তিনি শেষ যে কথাটি ব্যক্ত করেন তা হচ্ছে, ‘ আই হোপ দ্য লিভিং ইজ জয়ফুল, এন্ড আই হোপ নেভার টু রিটার্ন’। কোইয়াকানের সেই ব্লু হাউস এখন ফ্রিদার জাদুঘর যেখানে তিনি জন্মেছিলেন এবং যে বাড়িতে কেটেছে তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটা সময় আর সেখানেই তাঁর মৃত্যুও হয়েছিলো।  

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.