মাছ ও সবজি চাষ করে অঞ্জনা একজন সফল কৃষক

anjanaআমি অঞ্জনা মন্ডল। খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের বৃত্তিশলুয়া গ্রামে আমার বাড়ি। দুই কন্যা ও স্বামীসহ চার জনের ছোট সংসার আমার। আমার স্বামী মার্কনী মন্ডল পৈত্রিক সূত্রে জমি পেয়েছিল মাত্র ২৫ শতক ও বাড়ির জায়গা মাত্র ১৫ শতক। মার্কনীর সাথে আমার যখন বিয়ে হয় তখন তার সংসার চলে আবার চলে না টাইপের। বিয়ের পর আমি স্বামীর সাথে পরামর্শ করে জমিতে ঘের তৈরি করা শুরু করি। ঘেরের পাড় একটু বড় করে তৈরি করি। এ জন্য আমার পরিবারকে  স্থানীয় মহাজনদের নিকট থেকে ৩০,০০০/- টাকা ও ‘হীড বাংলাদেশের’  নিকট থেকে ৩৫,০০০/- টাকা ঋণ গ্রহণ করতে হয়। সুদ ও কিস্তির খেলা চালাতে চালাতে আমি দুই কন্যার জননী হই। ফলে সন্তানদের লালন পালন, ভাঙ্গা সংসার জোড়াতালি দেওয়া, সুদ ও কিস্তি দিতে শুধু সময় কেটে যেতে থাকে। সুদ ও ঋণ এর কিস্তিতে জর্জরিত থাকার কারণে লাভের মূল বসে যায় কোথায় তা আমি বুঝতে পারতাম না। তাই তখন আমি লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি করার প্রয়োজন বুঝতে পারি। কিন্তু আমার মাছ চাষ বিষয়ক পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার কারণে আমি কোনভাবেই মুনাফা বৃদ্ধির উপায় খুজেঁ পাচ্ছিলাম না। আমি আমার প্রতিবেশীদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাই, কিন্তু তারা তেমন কোন পরামর্শ দিতে পারেনি। তখন আমি কৃষি অধিদপ্তর এর সাথে যোগাযোগ করতে থাকি, কিন্তু নারী হওয়ায় আমি প্রশিক্ষণের কোন সুযোগ পাচ্ছিলাম না। তারপরও হতাশ না হয়ে নিজের প্রয়োজনেই আমি মৎস্য অধিদপ্তর ও কৃষি অধিদপ্তর এর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি।
তখন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘লোকজ’ এর সাথে সম্পৃক্ত হই। ‘লোকজ’ আমাকে কৃষি বিষয়ক কিছু পরামর্শ প্রদান করে। এক সময় মৎস্য অধিদপ্তর ও কৃষি অধিদপ্তর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।  ‘লোকজ’ আমাকে  সেখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। আমি প্রশিক্ষণ শেষে প্রাপ্ত জ্ঞান কাজে লাগাতে কোমরে কাপড় বেঁধে নেমে পড়ি। আমার সীমিত জমিকে ও জ্ঞানকে কাজে লাগাতে ঘেরে গলদা চিংড়ির পাশাপাশি রুই ও কাতলা জাতীয় মাছের চাষ করি এবং ঘেরের ভেড়িতে লাগাই চালকুমড়া। যার মাচা তৈরি করা হয় ঘেরের ভিতরের দিকে। বরবটি লাগাই ভেড়ির উপর দিয়ে। ফসল চাষে দেই গোবরের সার আর ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করি নিমপাতা ও মেহগনির ফলের নির্যাস। ঐ বছরই আমি ঘেরের সবজী বিক্রয় করে ৪৪,০০০/- টাকা পাই।
সেখান থেকে সংসারের খরচ চালানো পর ‘হীড বাংলাদেশ’ এর ঋণ পরিশোধ করি। আমি প্রতিজ্ঞা করি আর কখনও কিস্তিতে কোন ঋণ নিবো না। চালকুমড়া ও বরবটি উঠে যাবার পর আমি আমার ক্ষেত ভরে তুলি শীতকালীন সবজিতে। শীতকালীন সবজি বিক্রয় করে লাভ করি ১২,০০০/- টাকা। চিংড়ি বিক্রয় করে পাই ৬৮,০০০/- টাকা, রুই ও কাতলা মাছ বিক্রয় করে পাই ৩৪,০০০/-টাকা। যেখানে খরচ করেছিলাম মাত্র ২৬,০০০/-টাকা। এতে আমার লাভ হয় ৮৮,০০০/-টাকা। তা দিয়ে ঐ বছর  মহাজনের ঋণ পরিশোধ করেও  বছরের খোরাকি ধান কিনে মজুদ করে রাখি। পরের বছর ঘের থেকে লাভের টাকা দিয়ে দুইটি দেশি গাভী ক্রয় করি। বর্তমানে আমার ৬টি গরু রয়েছে। গরুর দুধ বিক্রয় , মাছ চাষ ও সবজি চাষ করে সংসার চালিয়েও কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়েছি। পাশাপাশি আমার মেয়েদের লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ চালিয়ে যাচ্ছি। এখন আমি আর কারও কাছে ঋণী নই। স্বামী অক্ষম হওয়ার পরও আমি নিজের শ্রম ও বুদ্ধি দিয়ে সংসার সংগ্রামে একজন সফল নারী কৃষক হতে পেরেিেছ বলে আমি মনে করি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.