দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সফলতার দেখা

susomaআমার নাম সুষমা সরকার, বয়স ৩০ বছর। স্বামীর নাম খোকন সরকার। আমি যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে বসবাস করি। আমি লেখাপড়া জানি না। আমার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৪ জন। আনুমানিক ৮/৯ বছর আগে আমার স্বামী আমাকে পরিত্যাগ করে। স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার পর আমি মহা সমস্যায় পড়লাম। কিভাবে সংসার চালাবো সেই চিন্তায় একেবারে ভেঙ্গে পড়ি। অনেক চিন্তার পরে আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নেই যে, পৈত্রিকসূত্রে প্রাপ্ত ভিটে বাড়িসহ মোট ৪২ শতক জমিতে কৃষি কাজ করবো। কিন্তু প্রথমে অভিজ্ঞতা না থাকায় সুবিধা হচ্ছিল না। আমি কীভাবে কৃষি উৎপাদন করবো বুঝতে পারছিলাম না। অনেক কৃষকের কাছে চাষাবাদের পরামর্শ চাই, কিন্তু কেউ আমাকে সে সময় পরামর্শ দেয় নি। আমি অনেকের সাথে যোগাযোগ করি কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণের জন্য, কিন্তু  নারী কৃষক হিসাবে প্রশিক্ষণের কোন সুযোগ  পাই নি। তখন আমি জীবনযাপনের জন্য কোন উপায় খুজেঁ পাচ্ছিলাম না। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম মাঝে মধ্যে অন্যের জমিতে দিন মজুর হিসেবে কাজ করবো। প্রথমে নারী হিসাবে অনেকে কৃষি কাজে নিতে চাইতো না, কেননা নারীদের কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করার প্রচলন তখন প্রায় ছিলই না। তারপরও আমি সবার কাছেই কাজ চাইতে থাকি। নিজের গ্রাম ছাড়াও অন্য গ্রামে কৃষকদের  কাছে যেতে থাকি। অনেক চেষ্টার পর অবশেষে আমি কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজের সুযোগ পাই। পরে আমার কাজের আন্তরিকতা ও পারদর্শীতা দেখে অনেকেই ডেকে নিয়ে কৃষি কাজ নেয়। কিন্ত নারী কৃষি শ্রমিক হওয়ায় আমি পুরুষ কৃষি শ্রমিকদের তুলনায় অর্ধেক মজুরি পেতাম। আমার আর কোন উপায় না থাকায় অল্প মজুরিতেই আমি কৃষিকাজ করতে থাকি। আমি উঁচু ভিটে জমিতে বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি লাগাই। ধানের জমিতে ধান ,কলাই ,সরিষাসহ অন্যান্য মৌসুমী ফসল লাাগাই। বাড়িতে গরু, ছাগল ও হাঁস মুরগী পালন করি। আমার নিজের  একটি পুকুর আছে, সেখানে  মাছ চাষ করি, সন্তানদের দেখাশুনা, রান্না-বান্নাসহ ঘর গৃহস্থালীর নানা রকম কাজকর্ম করি। বাজার থেকে ধানের বীজ কিনি। বিভিন্ন শাক সবজি ও ফল মূলের বীজ নিজে শুকিয়ে মাটির পাত্র ও বোতলে ভরে সংরক্ষণ করি। নিজে জমিতে বীজ বুনি, সার দেই, আগাছা পরিষ্কার করি ও ধান কাটি।
অন্যের ধানের জমি পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করি। শাক সবজি চাষের সময় কোদাল দিয়ে জমি কুপিয়ে নেই। বাগানের শাক সবজি নিজেরা খাই এবং কিছু কিছু বিক্রি করি। যে টাকা পাই তা দিয়ে সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাই। সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসার চালানোর সমস্ত খরচ  বহন করতে হয় আমাকেই । আমার মাসিক খরচ ৪,০০০/৪,৫০০ টাকা। এই টাকা যোগাড় করার জন্য আমি অন্যের জমিতে মজুরি খাটি। প্রতি দিন ৮ ঘন্টা কাজ করলে ১৫০ টাকা পাই। যেদিন মজুর খাটি সেদিন বাড়ির কাজসহ মোট  ৮/১০ ঘন্টা কাজ করতে হয়। এতে গৃহস্থালি কাজের অসুবিধা হয়না, তবে সংসারের জন্য অধিক কষ্ট করতে হয়।  কৃষি কাজের পরে নির্ভর করে আমার সংসার চলে, আমার পরিবারের সদস্যরা এটা মেনে নিয়েছে। স্কুল ছুটির দিনে আমার সন্তানেরা আমাকে কৃষি কাজে সাহায্য করে।

আমি ধাত্রী হিসাবেওপ্রশিক্ষণ নিয়েছি। গ্রামে অনেকের সন্তান প্রসবের সময় আমি ধাত্রী হিসেবে কাজ করেছি বিনা টাকায়, সেবা হিসেবে। কিন্তু এখন প্রায় সবাই সন্তান প্রসবের আগে ক্লিনিক অথবা হাসপাতালে চলে যায়।
আমার বাড়ির পাশের এক ধনী ব্যক্তি আমার কিছু জমি রেকর্ড করে নিয়েছে। কিছু জমি সে জোর করে দখলও করে নিয়েছে। এখন আমার ভিটে বাড়িও দখল করবে বলে হুমকি দেয়। কিন্তু আমি নারী বলে সেসব ঠেকাতে পারিনি। তাদের লোকবল ও অর্থবল আছে বলে সমাজের লোকজন তাদের পক্ষ নেয় বলে আমি মনে করি। আমি আমার সম্পত্তির ব্যাপারে ন্যায় বিচার পাইনি। আমি মনে করি নারী ছাড়া কৃষিকাজ পরিপূর্ণ হয়না এবং  পুরুষের সমান মজুরি পাওয়ার জন্য সরকারের আইন করা উচিত। আমার সংসারের সমস্ত সিদ্ধান্ত আমাকেই    নিতে হয়।

আমার দেখাদেখি এখন অনেক নারী বাড়িতে শাক সবজি লাগায়, গরু-বাছুর পালন করে। অনেক কষ্টের মধ্যে আমি আশায় বুক বেঁধে আছি যে আমার সন্তানেরা লেখাপড়া শিখে মানুষ হবে, চাকরি করবে এবং আমার কষ্টের অবসান হবে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.