রুমা বেগম: যুদ্ধ জয়ের গল্প

ruma1আমার নাম মোসাঃ রুমা বেগম। আমার বয়স (৩০) বছর। আমার স্বামীর নাম মোঃ আব্দুর রাকিব। আমি রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের তালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। আমি লেখাপড়া বেশিদূর পর্যন্ত করতে পারিনি। ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেছি। বর্তমানে আমার ৫টি মেয়ে। মেয়েদের পড়া লিখা শেখাচ্ছি। আমার স্বামী কৃষিশ্রমিক হিসাবে দিনমজুর এর কাজ করে। আমাদের ১টি ভিটা বাড়ি আছে এবং ১০ কাঠা আবাদি জমি আছে। অভাবী সংসারে আমার স্বামীর একার আয় দিয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছিলাম একসময়। তখন আমি সংসারে আয় উন্নতির জন্য  নারী শ্রমিক হিসাবে মাঠে কাজ করা শুরু করি। একজন নারী কৃষক হিসেবে আমি বেগুন, মূলা, ঢেঁড়স, ওল, কচু, লাউশাক চাষ করি, আগাছা পরিষ্কার করি, ক্ষেতে নিড়ানী দেই। মশুর, কালাই, মরিচ, কচু, পেঁয়াজ ও হলুদ উঠানোর কাজ করে থাকি।
আমি পরিবারের ব্যয়ভার বহনের জন্য অন্যের কাছ থেকে ধার নিয়ে ও কৃষি দিনমজুর হিসাবে কাজ করে খাদ্য দ্রব্য ক্রয়, সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য ব্যয় করে যাচ্ছি। আমি সকাল ৮.০০ টা থেকে দুপুর ১২.০০ টা পর্যন্ত মাঠে শ্রমিক হিসাবে কাজ করলে ১০০/= (একশত) টাকা মজুরি পাই। যেখানে পুরুষ শ্রমিকরা ৮ ঘন্টা শ্রম দিয়ে ৩০০/= (তিনশত) টাকা পায়। এ ক্ষেত্রে একই ধরণের কাজ করা সত্ত্বেও পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি কম পায়।
সমাজের অনেকে নারী কৃষি শ্রমিকদের মাঠে কাজ করা এখনও ভাল চোখে দেখেনা। সমালোচনা করে ও খারাপ মন্তব্য করে ।  ‘মাঠে কাজ করি দেখে অনেকে বাজে মন্তব্য করছে। এছাড়া মাঠে টয়লেটের ব্যবস্থা ও পানির ব্যবস্থা না থাকায় ভীষণ অসুবিধা হয়।’ কৃষক হওয়া সত্ত্বেও সমাজে কেউ আমাকে নারী কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায় না।
বর্তমানে আমার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭ (সাত) জন। আমি কর্মজীবী নারী (এনজিও) থেকে কিছু ঋণ গ্রহণ করেছি এবং তা থেকে হাঁস-মুরগী, ছাগল পালন করে সংসারের উন্নতি করেছি। তাছাড়া আমি বাড়ির উঠানে বেগুন, মূলা, ঢেড়ষ, ওল, কচু, লাউ চাষ করে বাজারে বিক্রি করি। আমার এ কাজে আমার স্বামী এবং মেয়েরা সহযোগিতা করেন। বাজারে কৃষিপণ্য আমি নিজে নিয়ে যাই না, বাড়ি থেকে বিক্রেতারা কিনে নিয়ে যায়। আমার মতে, ‘এত কষ্ট করে ফসল উৎপাদন করি, কিন্তু কখনই উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পাইনা’। ruma
আগে প্রয়োজন মত মাছ, মাংস, ডিম ও বিভিন্ন মৌসুমভিত্তিক ফল-মূল আমরা খেতে পারতাম না। এক কথায় যা দরকার তার তুলনায় কম খাওয়া হত। আমি মনেকরি কৃষিকাজ করে আমার পরিবারের দারিদ্রতা অনেকাংশে লাঘব হয়েছে। বিশেষ করে ‘কর্মজীবী নারী সংগঠনের’ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে সচেতন হয়েছি এবং আরও দক্ষভাবে কৃষিকাজ করতে সক্ষম হচ্ছি। এখন আমি প্রয়োজন মত মাছ, মাংস, ডিম ও বিভিন্ন মৌসুমভিত্তিক ফল-মূল দিয়ে সংসারের চাহিদা মেটাতে পারি।
আমার ইচ্ছা আমার মেয়েদেরকে শিক্ষিত করবো এবং কিছু সঞ্চয় করে সাবলম্বী হবো। একটি দোকান দিয়ে স্বাধীন ব্যবসা করবো। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে নারী কৃষকের ও নারী শ্রমিকের তালিকা নির্ধারণ করে নারী কৃষকদের  স্বীকৃতি দিতে হবে, নারীদের জন্য আলাদা কৃষি কার্ড প্রণয়ন করতে হবে। নারী শ্রমিকদেরকে সমান মজুরি দিতে হবে, সরকারি ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ এর ব্যাবস্থা করতে হবে এবং নারী কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করতে হবে এটাই আমার চাওয়া।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.