নারী , সন্তান ও একটি রায়

Momসারিতা আহমেদ: গতকাল ভারতীয় উচ্চ আদালতের ঘোষিত একটি ঐতিহাসিক রায়ে ভারতের গণতন্ত্রের উপর একচেটিয়া পুং মালিকানার মরচে একটু ঘষা খেল। একটি ব্যক্তিগত মামলার যুগান্তকারী রায়ে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল ভারতের গোটা নারী সমাজ।

আদতে কি ঘটেছিল ?

এক অবিবাহিতা মহিলা গেজেটেড অফিসার নিজের সন্তানকে একলা মানুষ করার জন্য আদালতে যান , সন্তানের অভিভাবকত্ব চান। কিন্তু নিম্ন আদালত তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিল এই বলে যে, “অভিভাবকত্বের দাবী সম্বলিত পিটিশন দাখিলের ক্ষেত্রে বাচ্চার বাবার পরামর্শ আবশ্যক “।

ব্যাখ্যা ছিল, ‘ The guardians and wards Act ‘ এবং ‘ Hindu minority and guardianship Act’ অনুযায়ী, অভিভাবকত্ব স্থানান্তর করতে গেলে বাবা-মা দুইয়ের অনুমতি লাগবে।

কিন্তু মহিলা যুক্তি দিলেন, তিনি অবিবাহিত। বাচ্চার বাবার সাথে মাত্র দু’মাস কাটিয়েছেন। বাচ্চা যেমন বাবাকে চেনে না , বাবাও তেমনি বাচ্চার কথা জানে ন। তাহলে কিসের অনুমতি?

এর পরেই তিনি গেলেন সুপ্রিম কোর্টে এবং অবশেষে গতকাল ৬ জুলাই পেলেন এক ঐতিহাসিক জয়। যার সুফল কেবল তিনিই নন, ভবিষ্যতে পাবেন আরো অনেক নারী, যারা ‘সিঙ্গল পেরেন্ট’ হিসেবে দায়িত্ব নিতে সক্ষম এক কচিপ্রাণের।

রাজনৈতিক নেতারা পর্যন্ত এবিষয়ে নিজেদের নোংরা নাক গলাতে ছাড়েননি। কিন্তু তাদের যুক্তিও সুপ্রিম কোর্ট খণ্ডন করেছে এই বলে যে, “ বাবার পরিচয়ের দরকার নেই। সন্তান বেড়ে উঠবে মায়ের একক অভিভাবকত্বেই।

নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের রায়ের তীব্র সমালোচনা করেও উচ্চ আদালত জানিয়েছে, ” শিশুর উন্নতির দিকটিই সবচেয়ে বেশী নজর দেওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু যে বাবা সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভুলে যাওয়াকেই বেছে নিয়েছেন, তাকে সন্তানের ভালমন্দের শরিক নাই বা করা হলো ।” সাথে এও জানিয়েছে,কোনো মহিলাকে সন্তানের পিতৃ পরিচয় প্রকাশ করতে বাধ্য করা যাবে না । একজন আর্থিক -মানসিক সক্ষম মা তাঁর একক অভিভাবকত্বেই স্বাধীনভাবে সন্তানের প্রতিপালন করবেন ।

গত বুধবারও এরমই আরো একটি যুগান্তকারী সাহসী রায় দিয়েছিল উচ্চ আদালত। বিচারপতি মিশ্র ও পন্থের বিভাগীয় বেঞ্চ একটি মামলার রায় দিতে গিয়ে বলেন, ” ধর্ষণের শাস্তি কমিয়ে আনতে ক্ষতিপূরণ বা বিবাহের প্রতিশ্রুতি কোনভাবেই গ্রাহ্য হতে পারে না।

আর গতকাল যে রায় বেরোল, তাতে এটারই প্রতিধ্বনী শোনা গেল ,” অবিবাহিত মায়েদের ক্ষেত্রে সন্তানের অভিভাবক হতে আর বাধা রইল না । শিশুর বাবার পরিচয় এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয় ।”

সন্তানের কাস্টডি নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। বরাবরই তা নামসর্বস্ব সন্তানের বায়োলজিক্যাল পিতার অনুকূলেই গেছে, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই পিতা সন্তানের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালেও শুধুমাত্র নারীকে মানসিক ও সামাজিক পীড়নের উদ্দেশ্যেই এটা ব্যবহার করে গেছে। সমাজের এই নাক উঁচু ভাবের পেছনে আছে দীর্ঘ পুরুষতন্ত্রের জং ধরা নারীবিদ্বেষী নিয়মকানুন এবং নারী স্বাধীনতা ও অধিকারকে দমিয়ে রাখার ইচ্ছে ।

ধর্ষণের বিচারে আজকাল প্রায়ই শোনা যায় ‘মেয়ে নষ্ট ‘ হয়ে গেছে, পেটে বাচ্চা এসেছে। তাই একে বাঁচানোর একমাত্র পথ হলো ওই ধর্ষক, ওই নিপীড়কের সাথেই বিয়ে দেওয়া। এতে মেয়েটির একটা ‘বৈধ সামাজিক অভিভাবক’ ও বাচ্চাটির একটি ‘বৈধ পিতৃ পরিচয়’ জুটবে। এটাই ভেবে আসছে এতোদিন সমাজ।

ধর্ষণ করবে পুরুষ, নষ্ট হবে মেয়ে। বাচ্চার জন্য বীর্য ঢালবে পুরুষ, নষ্ট হবে মেয়ে। বাচ্চা জন্মাবে সেই ‘নষ্ট মেয়ে’র পেট থেকে, ‘বাবা’ হবে পুরুষ। আর মা যদি সেই বাচ্চা একা রাখতে চায় , ধর্ষককেই বিয়ে করতে বাধ্য করবে পুরুষতন্ত্র। বাহ, কী সুন্দর সিস্টেম!

পৃথিবীর যাবতীয় ভোগ-সুখ- অধিকার-নাম -ক্ষমতা – পরিচয়ের একচেটিয়া মালিক পুরুষ। অথচ তার মালিকানা ফলাতে দরকার একটি নারী দেহ-মন-আত্মা। পুং মালিকানায় পুরুষ প্রভুটি যখন খুশি দাসী নারীটিকে যা খুশি নামে ডাকবে, তার পরিচয় দেবে। আর সমাজ সেটাকেই মান্যতা দেবে।

এই চলে আসছিল। কিন্তু এখন ঘটল এক উলোট পুরাণ।

অথচ এটা ঘটার কথা ছিল অনেক আগে, অন্তত এক দশক আগে তো বটেই। কারণ ‘সিঙ্গল পেরেন্টশিপের’ দাবি আজকের নয়। কয়েক দশক ধরে মেয়েদের যোগ্যতা ও সাহসিকতার ন্যায্য দাবী এটি।

একটি মহিলা যখন আর্থিকভাবে, মানসিকভাবে প্রস্তুত ও সক্ষম, সন্তান ধারণ ও ভরণপোষণের, তখন সমাজ কে তাকে বাধা দেবার?

আসলে, সমাজ জিনিসটা ধর্মবিশ্বাসের মতই অন্ধ-কালা-বোবা। একেবারেই প্রতিবন্ধী।

যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে কোন জিনিসকে বিচার করার মতো সহনশীলতা বা নমনীয়তা নেই একেবারেই।

নইলে যে সমাজে ডাস্টবিনে কুকুর মা পাহারা দেয় মানবশিশুকে, আস্তাকুঁড়ে ঠাঁই হয় কন্যাভ্রূণের; সেখানে একজন দায়িত্বশীল সক্ষম মা -কে তার সন্তানের দায়িত্ব নিতে আদালতে চক্কর কাটতে হয় ফি-বছর?

দেহ যখন নারীর, জরায়ু -গর্ভাশয়ও যখন মায়ের; তখন সেই মা-ই সিদ্ধান্ত নেবে তার সন্তান পৃথিবীতে আসবে কিনা। যদি আসে তাহলে তার শরীরের পুষ্টিরস দিয়ে যে ভ্রূণকে তিলেতিলে একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ তিনি দিয়েছেন সেই প্রাণটির অভিভাবক তথা সর্বময় ঈশ্বর সব হবেন সেই মা। আর কেউ না। কোনো যুক্তিতেই না।

পুরুষের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় বীর্য ঢেলে। এরপরে কী হলো, বা কী হবে তা নিয়ে মোটেও সে মাথা ঘামায় না । তাহলে, সেই বীর্য থেকে ‘মানুষ’ হলো না, ‘শুয়োর’ হলো, তা নিয়ে পিতৃত্বের ন্যাকামি থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

সুতরাং নারীরা কোনোভাবেই সন্তানকে বলতে বাধ্য নন, কে তার বাবা। যে বাবা কোনদিন সন্তানের দায়িত্ব নেয় না, সেখানে বাবার পরিচয় কোনমতেই প্রাধান্য পেতে পারে না। সব ধরনের দলিলপত্র, সরকারি নথিপত্র থেকে বাবার নামের অপশন তুলে দেয়া উচিত। সেখানে লেখা উচিত বৈধ অভিভাবকের নামে।

প্রশ্ন উঠবেই, বিজ্ঞানসম্মতভাবে যদি গর্ভাশয় ভাড়া দেওয়া একটি সারোগেট মাদার তার পরিচয় গোপন রাখতে পারেন আজীবন, তাহলে বীর্য ভাড়া দেওয়া একটি পুরুষ কেন ‘বাবার ‘ পরিচয় পাবে?

সারোগেট গরীব মা হয়তো টাকার বিনিময়ে কাজটি করেন, কিন্তু পুরুষ তো টাকার চেয়েও বড় জিনিসের বিনিময়ে লিঙ্গসুখের কাণ্ডটি ঘটায় — নারীর মাংস-হৃদয় ভক্ষণ, মানসম্মানের বলাৎকার দ্বারা। ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে একটি ফার্টাইল শুক্রাণু দরকার, যা যে কোন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ‘স্পার্ম ব্যাঙ্ক’ থেকে পাওয়া যায় । তাহলে এক্ষেত্রে সেই ভাড়ার শুক্রাণুর মালিককে ‘বাবা’ বলা যায় কি?

প্রশ্ন ওঠে।

প্রশ্ন আরো ওঠে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে পাসপোর্ট বানাতে হলে যেখানে বাবার নামধাম-ঠিকুজির দরকার পড়ে না , তাহলে স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে বাচ্চার গার্ডিয়ান হিসেবে মায়ের নাম কেন মান্যতা পাবে না?

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় এই সকল প্রশ্নের মুখে সপাট উত্তর জুগিয়েছে।

তবু…

তবু…

আশঙ্কা থেকেই যায়, উচ্চ আদালতের রায় আমাদের এই প্রতিবন্ধী সমাজের ‘চুঁইয়ে পড়া’ নীতি ফলো করে নিম্নস্তরেও পৌঁছাবে তো? লোকাল থানা বা স্থানীয় প্রশাসন অবধি লাগু হবে তো সত্যি ? নাকি এখনো ডাস্টবিনে পিঁপড়ে ছিঁড়ে খাবে কোনো শিশুকে? অথবা দত্তক আইনের মারপ্যাঁচে হন্যে হবে অন্য এক যোগ্য মা? অথবা স্কুল ফিরিয়ে দেবে ‘বাবার নাম জেনে তবে আসুন’ এই বলে?

আমরা আশায় বাঁচতে চাই। তাই ভাবতে চাই এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও আখেরে শিক্ষিত স্বনির্ভর মায়েরা নিশ্চয় ভাষা পাবেন তাদের অভিভাবকত্বের প্রশ্নে।

দেশে এখন ‘বেটি বাঁচাও , বেটি পড়াও ‘ নামে আন্দোলন শুরু হয়েছে সরকারিভাবেই। ভারতের বহু গ্রাম এখন মহিলা শুন্য। রাজস্থান-গুজরাটে কন্যাভ্রূণ হত্যার কুফল হিসেবে সেখানকার সমাজ ভুগছে সোনার ছেলেদের বিয়ে -সংসার ইত্যাদি প্রশ্নে। কারণ ওই যে, পুং মালিকানা ফলাতে হলেও তো চাই এক নারী শরীর।

তাদের নিজেদের কানেই একই প্রশ্ন বাজছে , বেটি নেহি বাঁচাওগে … তো বহু ( বৌ ) ক্যায়সে পাওগে?

উচ্চ আদালতের এই রায় হয়তো এই আন্দোলনকে এক অন্য দিশা দেবে, আশা রাখি। নারী শিক্ষিত হলে, স্বনির্ভর হলে পুরুষের অপদার্থতাকে লাথি মেরে নিজের একক মাতৃত্বের সংসার গোছাতে পারবে।

গোছাতে গিয়ে বাধা এলে অন্তত শিক্ষিত মেয়েরা সমাজের লালচোখকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে নিজেদের বুদ্ধি যুক্তি দিয়ে সন্তানকে বুকে নিয়ে পথে তো নামতে পারবে, আর সাথি হিসেবে পাবে সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়কে, আইনের রূপ পেতে যার খুব দেরি হয়তো হবে না।

এভাবেই ‘ পড়ে গা ইন্ডিয়া … তব হি তো বড়ে গা ইন্ডিয়া ‘ — আপ্তবাক্য সফল হবে।

কারণ, মনীষীরা যুগ যুগ ধরে বলে আসছেন, সেই দেশই প্রকৃত স্বাধীন ও শিক্ষিত… যে দেশের নারী জাতি স্বাধীন ও শিক্ষিত ।

দেশ ও সমাজের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের ন্যায়ের মুকুটে আরো অনেক উজ্জ্বল পালক যুক্ত হোক, এই আশা নিশ্চয় খুব বেশি কিছু চাওয়া নয় ।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.