ডাক্তারের কাছে যাওয়া মানেই জীবন বাজি রাখা

Woman-depressed-500x368কাবেরী গায়েন: তসলিমা নাসরিন বাংলাট্রিবিউনে ‘ব্যক্তিগত শোক’ শীর্ষক লেখায় যা লিখেছেন, তা অতিশয় সত্যি কথা। ডাক্তারের কাছে যাওয়া আর জীবনটা বাজি রাখা – একই কথা, উন্নত দেশের শ্রেষ্ঠ হাসপাতালেও সমস্যা। কিন্তু দ্বিমত পোষণ করি তাঁর বক্তব্যের এই অংশে যে বাংলাদেশের চিকিৎসা ভালো। আমি শুধু অসংখ্য ঘটনা থেকে কয়েকটা উদাহরণ দেবো, যার সবগুলো আমার পূর্ণ বয়সকালে খুব কাছে থেকে দেখা নয় শুধু, এসব অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগতভাবে পার করা।

১। আমার বাবা পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন, নেয়া হলো হাসপাতালে। এগারো দিন ফেলে রাখা হলো কোরবাণীর ছুটি চলছিলো বলে। তারপর অপারেশনে ভালো হলেন, হাঁটলেন হাত ধরে। বাসায় আনা হবে, কিন্তু জ্বর। বুক ফুটো করে প্লাস্টিকের নল লাগিয়ে রাখা হলো দু’দিক থেকে। চোখের সামনে সেকেন্ডারি ইনফেকশনে মারা গেলেন।

২। আমার মণিদা-র হাত সামান্য ভাংলো, এতোই সামান্য যে পিজি-তে ব্যন্ডেজ দিলো কোন অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই। আমার ছোটবোন অদিতি তখন ভীষণ অসুস্থ, হাসপাতালে- তাই কেউ আর তার সাথে ছিলো না। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট। কিছুদিন পরে ব্যন্ডেজ খুলে দেখা গেলো ভুল হয়েছে। ফের অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে ব্যান্ডেজ করা হলো। হাত ভালো হলো বটে, কিন্তু বা-দিকে কবজি নাড়াতে সমস্যা।

৩। আমার জ্বর, র‍্যশ। কিছুতেই ভালো হয় না। গেলাম বিখ্যাত এক ব্রিগেডিয়ার ডাক্তারের কাছে, ঢাকার সবচেয়ে দামি হাসপাতালে। তিনি ওষুধ দিলেন তিন মাসের জন্য। খেলে মাথা ঘুরতে থাকে, চোখে অন্ধকার দেখি, চোখ লাল থাকে সবসময়। সবচেয়ে বড় হলো, মাথায় সবসময় যন্ত্রণা। ভয় লাগে ওষুধ খেতে। ফ্লোরিডা গেলাম কনফারেন্স-এ। ফেরার পথে বড়দার বাসায় নিউইয়র্কে। ছোড়দাও এসেছে। ছোড়দা ডাক্তার। ওষুধ দেখতে চাইলো। সে কিছুতেই এই ওষুধ চিনতে পারে না। পরে ইন্টারনেট ঘেটে, অনেকের সাথে আলাপ করে জানালো, এই ওষুধ বহু বছর আগে পাশ্চাত্য থেকে ঊঠে গেছে। শেষ ব্যবহার করা হয়েছে আশির দশকের প্রথম দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে, আলঝাইমার রোগীদের জন্য। ছোড়দার বিস্ময়, তাঁর সহকর্মীদের বিস্ময়, এই ওষুধ কে লিখলেন, আর ওষুধই-বা বাজারে পাওয়া গেলো কীভাবে? ছোড়দা ওষুধের প্যাকেট ধরে ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ফেলে দিলো এখনো দেখতে পাই। আমি সেই ওষুধ বন্ধ করে বেঁচে গেলাম। কেস করতে বলেছিলো কেউ কেউ, আমি ডাক্তারদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আইনজীবিদের খপ্পরে যাবার সাহস করে উঠতে পারিনি।

৪। আমার ছোটবোন অদিতি। সতেরো-আঠারো বছর বয়সে জ্বর হলো। ডাক্তার দেখানো হলো। কিছু দিন পরে বমি হতে শুরু করলো, কিছু খেতে পারে না। ডাক্তাররা বলেন, ‘বেটার হচ্ছে’ সেজন্য। এরপর জানালেন, ‘ব্রংকাইটিস’ হয়েছে…চললো চিকিৎসা। অবস্থা আরো খারাপ। তখন বলা হলো, ‘যক্ষা’। চললো চিকিৎসা। শেষে অবস্থা যখন বেশি খারাপ, হাসপাতালে নেয়া হলো, তখন আবিস্কৃত হলো ওর বুকে জল জমেছে আর ফুস্ফুসে টিউমার। একদিন পরপর পিঠে বিশাল সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে জল বের করা হয়, ও মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকে। সে কষ্ট যারা দেখেনি তারা বুঝবে না। হাত-পা ফুলে গেলো। কিছু খায় না, জলও খেতে পারে না মুখে, শুধু অস্পষ্টভাবে কিছু বলে। হাসপাতালে থাকার তেরোদিন আমি প্রতিটা মূহূর্ত সাথে ছিলাম, দেখেছি কীভাবে প্রতি মূহূর্মূতে অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মেডিক্যাল বোর্ড বসলো। জানালো ক্যান্সার হয়েছে, বাঁচার আশা নেই। মানে আর হাতেগোনা কয়েকদিন বাঁচবে। এখন বাড়িতে নিয়ে, সবার সাথে রাখাই ভালো। ছোড়দা তখন এডিনবরায়, এমআরসিপি দ্বিতীয় পার্ট পরীক্ষার্থী। পরীক্ষার আগের দিন টাকা-পয়সা সব ব্যাঙ্ক থেকে তুলে বোনের চিকিৎসার জন্য চলে এলো ঢাকায়। একদিনের মধ্যে সব ঠিক করে নিয়ে গেলো বোম্বের টাটা মেমোরিয়াল-এ। অনেকটা শেষযাত্রার মতো বিদায় দিলো সবাই। ডাক্তাররা তখনো বলছেন, নিচ্ছেন বটে কিন্তু নিজেদের ভেতর থেকে মরাই কি ভালো ছিলো না? গোটা পরিবার তখন বিধবস্ত। সতেরো দিন পরে সেই বোন আমার আমাদের সবাইকে চিঠি লিখলো। হয়েছিলো ননহস্কিন্স লিম্ফোমা। সাত মাস চিকিৎসা নিয়ে ফিরে এলো সুস্থ হয়ে। বাংলাদেশে থাকলে ডাক্তারদের কথাই সত্যি হতো। এখন সে বাংলাদেশের সেরা গল্পকারদের একজন।

অদিতি ফিরে এলো বটে, কিন্তু বছর না ঘুরতেই পায়ের সমস্যা, হাঁটতে কষ্ট। তখন ফের ডাক্তার আর চিকিৎসা আর ডাক্তার আর রিপোর্ট। বাংলাদেশের প্রখ্যাত এক শল্যচিকিৎসক সেই ১৯ বছরের মেয়ের সামনে অবলীলায় বললেন, পা-টা ‘কেটে ফেল্লেই হবে’। যাই হোক, অনেক খোঁজ-খবর করে কোলকাতায় ডক্টর বকশি-র খোঁজ পাওয়া গেলো সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের কাছ থেকে। যে পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হয়, তার নামই ‘বকশি-মেথড’। সেখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে পা না-কেটেই বহু বছর কেটে গেলো। কিন্তু অদিতি নিজের যত্ন করেনি, যে বিশ্রাম নেবার কথা ছিলো, নেয়নি। ওর ফের বড় অপারেশন সামনে। আমি আতঙ্কে ঘুমাতে পারি না। তসলিমা নাসরিনের লেখাটা পড়ে ভয়ের স্রোত বয়ে গেলো ফের শিরদাঁড়া বেয়ে ।

বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আমার একবিন্দু আস্থা নেই, একথা বলতে আমার কোন দ্বিধা নেই। আমার দেশপ্রেম নিয়ে যতোখুশি কটাক্ষ করা যেতেই পারে। সত্যি বলতে, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় দ্বিধা আছে যখন দেখি ‘ম্যালেরিয়া’ সারলেও ‘কুইনাইন’ সারানোর ব্যবস্থা তৈরি হয়নি, তবু যেতে হয় উপায় নেই বলে। চিকিৎসা আধুনিক হলেই হয় না, আনুষঙ্গিক পরিচর্যা ব্যবস্থা এখনো মানবিক নয় আর তার সাথের যে খরচ! আমার মনে আছে, ডাক্তারদের জন্য বিলের খাম নগদ ধরিয়ে দেবার পরে ছয়জন ডাক্তার অদিতির জন্য মেডিক্যাল বোর্ডে বসেছিলেন। তাও যদি রোগ নির্ণয় করতে পারতেন!

তসলিমা নাসরিনের মূল লেখাটা: http://m.banglatribune.com/tribune/single/103718?fb_ref=Default

 

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.