আমরা যারা প্রতিদিনকার সাইবার ধর্ষণের শিকার

Freedom of speechমারজিয়া প্রভা: অভিনেত্রী সাদিয়া জাহান প্রভার ব্যাক্তিগত ভিডিও যখন ছড়ানো হয়েছিল আমরা কি করেছিলাম? হ্যাঁ, আমরা সবাই মিলে প্রভাকে গালাগাল পেরেছিলাম। এ! মা ! ছি ছি! মেয়েটা এইসব কি করেছে? এতো খারাপ! প্রভা মিডিয়া থেকে এক বছর টাটা বাইবাই করল। আর প্রভার সাথে এই মহা অন্যায় করে আমাদের মহামান্য রাজীব পার পেয়ে গেল। প্রভা-রাজিবের মিউচুয়াল রিলেশন ছিল সেটা। তারা নিজেদের বোঝাপড়ায় তা ভিডিও করতেই পারে! কিন্তু ব্যাক্তিগত সেই গল্প যখন ছড়িয়ে দেওয়া হল জনসাধারণের মাঝে, সেটা ছিল একটা বিশাল মাপের সাইবার ক্রাইম। প্রভা মামলা করেছেন কি না জানি না, রাজীব জেলে ঢুকেছে এরকম খবরও আসেনি!

আমার এক পরিচিত মেয়ের মুখের সাথে ন্যুড পিক জুড়ে দিয়েছিল তার এক্স বয়ফ্রেন্ড, এবং তারপর তার নামে ফেক আইডি খুলে আমাদের পরিচিত সবাইকে রিকু পাঠাতে লাগল, আইডির নাম ছিল যথাসম্ভব “ আনিকা মাগি’। মেয়ের আসল নাম ছিল আনিকা, তার সাথে ম অক্ষরের এই নাম জুড়ে দিয়ে ফেক আইডি খুলা হয়, সেই আইডির কভার ফটোতে থাকে সেই ফটোশপ করা ন্যুড পিক। খুব দ্রুত সেই আইডির ফ্রেন্ড হয় যায় অনেকে, মেয়ের মোবাইল  নম্বর দেওয়া ছিল।

Prova
মারজিয়া প্রভা

খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, মেয়ে আসল ফেবু আইডি ডিএকটিভ করে  ফেলেছে, ভার্সিটি যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, সুইসাইডের অ্যাটেম্পট নিয়েছে। এরপরে আর কোন খোঁজ নেই। আমি বলেছিলাম মামলা করতে, মেয়ের এক বন্ধু আমাকে বলেছে “ওর মা চায় না, ব্যাপারটা আর ছড়াক!” ফলাফল, হয়ত মেয়েটা এখনও হতাশায় আচ্ছন্ন।

অনলাইনে গালিগালাজের জন্য বিখ্যাত সিপি গ্যাং (সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় যার পথচলা) ঢালাওভাবে সাংবাদিকের মেয়েকে রেপ করতে চেয়েছে। একটা মেয়েকে পাবলিকলি আউটরেজ যারা করে, তারা কি ধর্ষক নয়?

বিভিন্ন সেনসিটিভ ইস্যু নিয়ে লেখার কারণে প্রায় প্রত্যেকদিন আমাকে ইনবক্সে ‘বেশ্যা’ গালি শুনতে হয়। এছাড়া ‘চ’ বর্গীয় শব্দসম্বলিত মেসেজে আমার ইনবক্স ভর্তি।

এমনকি আমার লেখা শেয়ার করে, আমাকে ট্যাগ দিয়ে গালিগালাজ করা হয়েছে, আমার বুকের সাইজ জানতে চেয়েছে। ইগনোর করতে চেয়েছি, কিন্তু নপুংসকদের কার্যক্রম বন্ধ করতে পারিনি।

আমি যে কাহিনীগুলো বলেছি, তা আমরা যারা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর সঙ্গে যুক্ত তাদের প্রত্যেকের গল্প। খুব কম মেয়েই নিরাপদ সাইবার জীবন পেয়েছে। যারা পায়নি, দিনের পর দিন যাদের সাইবার ক্রাইমের ভিক্টিম থেকেছে, তাদের জন্য কি কোন আইন নেই?

চলুন দেখা যাক!

আইসিটি ৫৭ (১)  ধারায় বলা আছে “কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তাহা ইহলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ’।

একজন আইনজীবী ভাই এর সাথে কথা বলে শুনেছি, এই আওতায় সর্বোচ্চ শাস্তি হবে যাবজ্জীবন।

কিন্তু এই আইনে কিছু ফাঁক রয়ে গেছে। বর্তমানে সাইবার সন্ত্রাস ব্যাপক হারে ছড়াচ্ছে, নারীদের জীবনকে অনিরাপদ , হতাশাগ্রস্ত সর্বোপরি একজন নারীকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে দিচ্ছে।

যে নারীর ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে তার অনুমতির বাইরে,  তা কেবল পর্ণোগ্রাফিক আইনের আওতায় ফেলা হয়। এক্ষেত্রে কিন্তু ধর্ষণের ইফেক্টের মতই নারী জীবন হুমকির মুখে পড়ছে!  তাই ভিডিও ছড়ানোর মতো অপরাধের অপরাধীকে ধর্ষণের শাস্তি দেওয়াই বাঞ্ছণীয়।

সাইবার বুলিং বা আমাকে আপনাকে যে যৌন হয়রানিমুলক ম্যাসেজ পাঠানো হচ্ছে তা বন্ধ করার জন্য আইনের যথেষ্ট ব্যবস্থা আছে। সাইবার দুনিয়ায়, আপনাকে কেউ যদি উত্যক্ত করে, যৌন হয়রানী বা অশালীন প্রস্তাব দেয়, আপনার নামে ফেইক একাউন্ট খোলে, আপনার অনুমতি ছাড়া আপনার ছবি কোন পেইজ বা একাউন্টে ব্যাবহার করে, আপনাকে পর্ণোগ্রাফিক কোন ছবিতে ট্যাগ করে বা পাঠায়, আপনি যথা সময়ে আইনের আশ্রয় নিন।

আপনি BTRC তে ফোন করে বা ইমেইল করেও আপনার অভিযোগ জানাতে পারেন। আমার জানামতে তারা খুব দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহন করেন। BTRC’র ঠিকানা, ফোন, ইমেইল, ওয়েবসাইট নিচে দেয়া হলো।

Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission (BTRC),

IEB Bhaban (5,6 & 7 floor) Ramna, Dhaka-1000Phone

(PABX): + 88029611111Fax: +880 29556677

Email: [email protected]

Website: www.btrc.gov.bd

আমরা যারা প্রতিদিনকার সাইবার ধর্ষণের শিকার, তারা নিজেদের উপর চাপ নেই প্রচুর। চুপ থাকি। একাউন্ট ডিএকটিভ করে দূরে থাকি, সাইবার জীবন থেকে।  আমি নিজে প্রচুর মানসিক টর্চার পেয়েছি। এরপর থেকে আর পেতে চাই না। ভবিষ্যতে এরকম ম্যাসেজ আসবে আমি জানি, তখন সাইবার হ্যারাসমেন্টের প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নিব। যদি তাতেও কিছু না হয়, সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে মামলা করব।

আমি একা নই, আপনারাও সামনে আসুন। যতচুপ করে থাকব, ভিক্টিমের উপর মানসিক অত্যাচার বাড়িয়ে দিব, তত সাইবার ক্রাইম বাড়বে।

তার চাইতে চলুন পদক্ষেপ নেই! নারীর সাইবার জীবন হোক, স্বচ্ছ সুন্দর ও নিরাপদ।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.