নৌকা এবং জাল: আলেয়া বেগমকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়

Aleya 2উইমেন চ্যাপ্টার: আমার নাম আলেয়া বেগম, আমার বয়স ৪৮ বছর। আমার স্বামী শাহজাহান  একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। আমার বাবার অংশে জমির ভাগের ৪ শতাংশ জমি ছিল যা আমার বাবা আমাকে দেন। স্বামীর বাড়িতে আমার কখনও যাওয়া হয়নি।

আমি আমার মেয়েদেরকে নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতাম। কখনও দুই বেলা ,কখন এক বেলা খেয়ে আমাদের কাটতো। মেয়েরা একটু বড় হলে আমার একার আয়ে সংসারের খরচ ও স্বামীর চিকিৎসার খরচ বহন করা কষ্টকর হয়ে পড়ে।

বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার কাজিরাবাদ ইউনিয়নের আয়লা চান্দখালী গ্রামের বাসিন্দা আমি।

আমি তখন দিনের বেলা মানুষের বাড়িতে কাজ করে এবং রাতের বেলা মেয়েদেরকে নিয়ে বাড়ির উঠানে ও অন্যের জমিতে সবজি চাষ করে ও খালে মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চালাতে থাকি। সবজি বিক্রি করে খাবার কিনি ও চিকিৎসার খরচ যোগায় আর মাছ বিক্রির টাকা জমাতে থাকি। এই জমানো টাকা দিয়ে একমসয় আমি মেয়েদের বিয়ে দেই। মাছ ধরে ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে ভালভাবেই চলছিল আমাদের দুইজনের সংসার। কিন্তু চার বছর পর আমার বড় মেয়ের স্বামী দুই ছেলে মেয়েসহ তাদের আমার কাছে রেখে চলে যায়। তখন ৫ জন মানুষের খরচ চালানো আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। দেড় বছরের মধ্যে বড় মেয়ের মত ছোট মেয়েও এক সন্তানসহ স্বামী সংসার ছেড়ে  আমার কাছে চলে আসতে বাধ্য হয়। আমি তখন ভীষণ অসহায় হয়ে পড়ি। সেইসময় মানুষের বাড়িতে কাজ করে ও ধার দেনা করে সংসারের খরচ চালাতে থাকি।

সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে থাকি কিন্তু কোন সাহায্য পাইনি তখন। কেননা আমার অঞ্চলের সরকারি সেবাসমূহ শুধুমাত্র পুরুষ কৃষকদেরকেই দেওয়া হয়ে থাকে। এইভাবে রকমভাবে যখন আমি সংসার এর ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি, তখন আমি উন্নয়ন সংস্থা ‘‘জাগো নারী’’-র রি-কল প্রকল্পের আওতাভুক্ত হই।

Aleya২০১১ উন্নয়ন সংস্থা জাগো নারীর কাছ থেকে আমি নৌকা ও জাল ক্রয় করার জন্য ১০,০০০ হাজার টাকা পাই। এই টাকা দিয়ে ছোট একটি নৌকা তৈরি করে এবং কিছু জাল ক্রয় করে আমাদের পার্শ্ববতী খালে মাছ ধরা শুরু করি। রাত্রের বেলা মাছ ধরি এবং দিনের বেলা অন্যের  বাড়িতে  কাজ করে  ও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে  বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করতে থাকি। আমি আমার নিজের বুদ্ধিমত বিভিন্ন সবজি যেমন, লাউ, শিম, পুঁই শাক , আলু, লালশাক, শশা ইত্যাদি চাষ করে নিজে খাই এবং কিছু বিক্রি করি। এরপর থেকেই আস্তে আস্তে আমাদের অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।

এক বছর আগে আমার স্বামী মারা গেছেন। বর্তমানে ৬ জনের সংসারের  খরচ আমি মাছ ধরে ও সবজি চাষ করে ভাল ভাবেই বহন করছি। কিছু টাকা দিয়ে আমি কিছু জমি বন্ধক নিয়েছি। বর্তমানে এই বন্ধক নেয়া জমিগুলো আমার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

আমি মনে করি,  ‘‘জাগো নারীর কাছ থেকে যে সুবিধা পেয়েছি তা দিয়ে আমি খেয়ে পরে ভালো আছি । শুনেছি সরকারিভাবে নারীদের অনেক সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়  আমরা যদি  এ সকল সুযোগ সুবিধা যেমন, সেলাই মেশিন  দেওয়া, হাসঁ-মুরগী পালন ও কৃষি লোন দেওয়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি থাকত তাহলে আমরা আরো ভালভাবে কাজ করতে পারতাম’’

আমার স্বপ্ন ভাল ভাবে সংসার চালানো ও  বসবাসের জন্য একটি জমি কেনা। বড় একটা নৌকা তৈরি করা ও জাল কেনা। আমার দেখা দেখি বর্তমানে এই এলাকার অনেকেই মাছ ধরে তাদের সংসারের খরচ বহন করার চেষ্টা করছে। আমি এখন গ্রামের অনেক নারীকেই মাছ ধরা বিষয়ক পরামর্শ প্রদান করছি এবং তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা তাদের সংসারে অবদান রাখছেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.