বাঁচুন, বেঁচে থাকাকে ভালোবেসে !!!

Nodiনাদিরা সুলতানা নদী: সুমাইয়া’র সাথে মাহফুজের প্রেম ও বিয়ের বয়স এই নভেম্বর’১৫ তে এক যুগ ছাড়িয়ে যাবে। ম্যাড বা মেইড ফর ইচ আদার বলতে যা বুঝায় এদের দু’জন কে দেখে ওদের বন্ধু-পরিজনের সব সময় তাই মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দুর্দান্ত প্রেমময় সময় এবং এরপর সুখে শান্তিতে বসবাস এর রাজা-রানী হয়ে সংসার জীবন শুরু।

বিয়ের পর পড়ুয়া মেধাবী সুমাইয়া বছর দুই একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করলেও প্রথম সন্তানের আগমনের কিছু সময় আগে থেকেই জব থেকে সাময়িক অব্যাহতি নিয়ে নেয় এবং ‘’বাচ্চাটা একটু বড় হলেই কাজে ফিরবো’’ এই রকম ভাবনাতেই আরও বছর দুই কেটে যায়। দুই বছরের সময় যেয়ে তিন বছরে এ পা রাখার আগেই ‘’দ্বিতীয় সন্তানের’’ আগমনী বার্তা। শুরুতে কাজে ফিরতে না পারার জন্য মন কেমন করলেও দ্বিতীয় সন্তান এর জন্যে আবার নুতন ঘোর লাগা, ভাল লাগা নিয়ে অপেক্ষার সময়।

সব মিলিয়ে প্রকৃতির উজাড় করা আশীর্বাদে সুমাইয়া’র রাজকন্যা’র সাথে যোগ দেয় আরেক রাজপুত্তুর। পারিবারিক সুখে টুঁই-টুম্বুর সুমাইয়া ক্যারিয়ার ও অন্যান্য সব চিন্তা-ভাবনা আপাতঃ চাপা দিয়ে ‘’দুইটা যাদু বাচ্চা’’র মুখের দিকে তাকিয়ে পূর্ণ উদ্যমে সংসার সাজাতে আর মাহফুজকে তার ক্যারিয়ারের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতেই পূর্ণ মনোনিবেশ করে।

‘’বাচ্চাদের সুস্বাস্থ্য’’ ‘’বাসায় থাকা গৃহ পরিচালিকা’’ ‘’ড্রাইভার’’ কে খুশী রাখা ‘’দুই পরিবারের স্বজন পরিজন’’ দের খোঁজ খবর ‘’নুতন নুতন রেসিপি’’ ট্রাই এবং মাহফুজ অফিসের কোন মিটিঙে কোন দিন কোন শার্টের সাথে কোন টাই পড়ে যাবে এই রকম এক সংসার ছকের মাঝেই আটকে যায় জীবন। সুমাইয়া উপভোগ করে, বেঁচে থাকাকে প্রায় প্রতিদিনই নুতন করে অভিবাদন জানায় কোন অভাব অনুযোগ ছাড়াই।

তারপর হঠাত এক সময় মাহফুজের বদলে যাওয়া। ‘’প্রথম এবং শেষ প্রেম সুমাইয়া’’ এই ধ্রুব বাক্যটি ভুল প্রমাণিত করিয়া অফিসের জুনিওর কলিগের প্রেমে পড়ে নুতন করে ডুব সাঁতার। সুমাইয়াকে ঘিরে মাহফুজের প্রেম কখন কিভাবে ফিকে হয়ে আসে সুমাইয়া সেটা একদমই বুঝতে পারেনা। কারণ সুমাইয়া তখন ছিল মগন “পর্দার’’ রংটা ঠিক কোন রঙে বদলালে বসার ঘরটা আরও বেশী সুন্দর হয়ে উঠবে সেই মিশনে।

মাহফুজের তখন এমনি করে যায় যদি দিন যাক না… ‘সময়’। এর মাঝেই একদিন সুমাইয়া বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে মাহফুজের জন্যে দুপুরের বিশেষ খাবার নিয়ে অফিসে যাবে একটা সারপ্রাইজ দিতে এমনটা ভাবতে ভাবতেই ধানমণ্ডির ওদের দু’জনেরই প্রিয় যে চাইনিজ সেখানে যাওয়া। মাহফুজকে সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে নিজেই যে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত জীবন বদলে যাওয়ার মত সারপ্রাইজ পাবে তা এক সেকেন্ড আগেও কল্পনা করেনি সুমাইয়া।

মাহফুজ তাকে ছাড়া যে কারো সাথে এতোটা অন্তরঙ্গভাবে বসতে পারে তা তার কল্পনায়ও ছিলনা। সুমাইয়া নিজেকে ঝাকি দিয়ে বুঝাতে চায় সে যা দেখেছে ভুল দেখেছে। সুমাইয়ার ভিতর থেকে সবটুকু মরে গিয়েও আপ্রাণ চেষ্টা করে স্বাভাবিক থাকার। মাহফুজকে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করে তার আজ অফিসের কোন মিটিং ছিল কিনা। মাহফুজ ভীষণ অবাক হয়ে বলে না, সে আজ অফিসেই ছিল। সুমাইয়া ভীষণ অনিচ্ছায় অল্প কিছুদিন পর মাহফুজের মুখোমুখি হয়। আরো বেশ কিছু ঘটনা দুর্ঘটনায় যখন মাহফুজ বুঝতে পারে সুমাইয়া সব জেনে গেছে সে সবটুকু বিনীত হয়ে সুমাইয়াকে কথা দেয় ‘’একটা সুযোগ দিতে’’ সে ভুল করেছে।

সুমাইয়া বুঝতে পারে না মাহফুজকে ঠিক কি বলা উচিত, কীইবা বলবে, কেনই বা বলবে? সে শুধু জানে ভিতর থেকে লজ্জা অপমানে অনেকটাই বোবা হয়ে গেছে। সংসার গোছাতে গোছাতে যে মানুষকে ঘিরে এতো আয়োজন সে-ই তার এমন বদলে যাওয়া, বিশ্বাস ভাঙা কোন শান্তনায় মেনে নেবে!!!

Nodi Aus
নাদিরা সুলতানা নদী

অকালে মা-বাবা হারানো সুমাইয়া একটা সময় পর্যন্ত জীবনকে দেখেছে ভীষণ নির্মম ভাবে। তারপর প্রেম বিয়ে সংসার নুতন করে ভাবতে শিখিয়েছিল জীবন সুন্দর এবং কাংখিত হয়ে উঠতে পারে কোন না কোন একটা সময়। আর এই ভালোবাসা ভালোলাগা ঘোরের মাঝে পড়ে সে ভুলেই গিয়েছে স্বামী-সন্তানকে ঘিরে যে জগত তাকে ছাড়াও যে একান্ত জীবন বলে কিছু থাকতে পারে বা থাকা উচিত। স্বামী মানুষ’টা কোন অজানা কারনে বদলে গেলেও যে জীবনে বেঁচে থাকার, আগামীর পথ চলার আর কোন নিমিত্ত থাকতে পারে সেটা বুঝার বোধ শক্তি হারিয়ে সুমাইয়া অনেকটাই মানসিক ভারসাম্য হারানো জড় পদার্থে পরিণত হয়ে যায়!!!

সাবেরা’র ঘটনা সুমাইয়ার মত না হলেও অনেকটাই কাছাকাছি। বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রেম দুই পরিবারের সুমতিতে বিয়েতে গড়ায়। তারপর বছর দুই মধু সময় কাটিয়ে সংসারে প্রথম শিশুর আগমন। চাকুরী বাচ্চা সংসার বেশ চলছিল। সাবেরা শুধু বুঝতে পারে স্বামী মানুষ’টার ক্রমশঃ বদলে যাওয়া, সংসারে থেকেও যেন নাই। দিন যাওয়ার সাথে সাথে সাবেরার শ্বশুর বাড়ীর অন্য লোকদের অসহযোগিতা, স্বামীর অবহেলা, এই সব সামলিয়ে চাকরী ঠিক রাখতে রীতিমত হিমশিম।

পাশাপাশি চলে দিন রাত্রির দাম্পত্য কলহ। জীবনকে একটু বদলালে যদি সময় গুলো আবার নিজের অনুকুলে আসে সেই আশায় ছেলেটাকে নিয়ে আলাদা সংসার এবং নিজের ভিতরের সব আকুলতা দিয়ে ছেলের বাবাকে আরো একবার সংসারে ফেরানোর চেষ্টা করে সাবেরা। ওভাবে লাভ কিছু না হলেও সাময়িক একটু স্বস্থি নিয়ে আরো বছর দুয়েক। সাবেরা স্বামীকে যেভাবে সংসারে চায় সেভাবে আর পায়না। খুব ব্যস্ত স্বামী আজ তাদের কাছে তো কাল নিজের মায়ের কাছে থাকতে চলে যায়। তারপরও সাবেরা একজন ভালো গৃহ পরিচালিকার সাহায্যে অন্তত তার চাকরীটা সামাল দিয়ে দিন শেষে একটু শান্তিতে খেয়ে পড়ে রাতে ছেলেটাকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে দিন কাটাতে পারছে এটাই একটা আপাতঃ সান্ত্বনা হয়ে দাড়ায় সংসার জীবনে।

এরপর একদিন মাথায় আকাশ ভাঙার মত করেই সাবেরা জানতে পারে তার ছেলের বাবা বিগত বছর ধরে আরো একটা সংসার চালিয়ে যাচ্ছে। আরেক ভদ্রমহিলা কে স্ত্রীর সম্মান দিয়ে তাকে নিয়ে আলাদা একটা সংসার চালিয়ে যাচ্ছে। সাবেরার ছেলেটার বয়স পাঁচ না ছুঁতেই এই রকম একটা ঘটনা ওকে কাল বৈশাখী ঝড়ের মতোই জীবন থেকে একদম ছিটকে ফেলে দেয়; জীবন হারায় তার সব স্বাভাবিক রঙ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুমাইয়া বা সাবেরা আমাদের প্রায় সবার জানা দেখা বা শোনা কেউ। কথা হচ্ছে সুমাইয়া বা সাবেরার মত এমন ঘটনা কেউই সংসার শুরু করার আগে কলপনা করেনা। একটা মেয়ে যখন সংসার’কে আগলেই তার এক জীবন কাটিয়ে দিতে চায় তখন আসলে তার জীবনের একান্ত অনেক চাওয়া গুলোই ভুলে যায় বা অন্য ভাবে ভাবার প্রয়োজনই বোধ করেনা। কিন্তু এমনটি ঘটতেই পারে একজন সুমাইয়া, সাবেরা বা একজন পুরুষের জীবনেও!!!

একটা মানুষ বিশ্বাস ভাঙলে বা কষ্ট দিলে ‘আপনাকে’ ঘিরে অন্য সব বন্ধু পরিবার পরিজনের টান কে ভুলে জীবনকে অবহেলা করবেন। বেঁচে থাকাটাই এক ফুঁৎকারে অর্থহীন হয়ে যাবে তা কি ঠিক!!!??? হয়তো একটু সময় লাগবে তারপরও ঘুরে দাঁড়ান। জীবনে বেঁচে থাকার মানেটা বদলাতে হলে বদলান, বাঁচুন বেঁচে থাকা’কে ভালোবেসে!!!

এটা ঠিক মনোবল বা ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি সবার থাকেনা। এই যেমন সুমাইয়ার’ জীবন জগত ছিল শুধুই মাহফুজময়। মাহফুজ’কে কেন্দ্র করেই তার সারা দিনমান। মাহফুজের বদলে যাওয়া আবার তার কাছে ফিরে আসা এই সব সুমাইয়া’কে আর কোন ভাবেই জীবনে ফেরাতে পারেনা। অসময়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে গেলে ওর শুধু মনে হয় আর যদি ঘুম না ভাঙ্গতো এই জীবনে। নিজের ছেলে-মেয়ে দুটি যদি তাকে ছাড়াই শিখে নিতে পারতো বেঁচে থাকাটা, চলতে পারাতো; তাহলে এই পোড়া জীবন’টা নিয়ে চলে যেতে পারতো সে যেদিকে চোখ যায়!!!

সাবেরাও সাময়িকভাবে অনেকটাই হারিয়ে ফেলে ভিতরের সব ইতিবাচক শক্তি, হারিয়ে ফেলে মানসিক দৃঢ়তা। তারপরও জীবনের বেশ কিছু কালো অধ্যায় কাঁটিয়ে একমাত্র ছেলেটাকে নিয়ে বিদেশ পাড়ি জমায় বেঁচে থাকবার আশায়। কাংখিত হয়নি জীবনটা, তারপরও আয়নায় নিজেকে দেখে, নিজেকে সুস্থ সুন্দর করে তোলে নিজেই নিজেকে বলে  ‘’তবুও জীবন যাক কেটে যাক জীবনের নিয়মে’’!!!

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.