মনে পড়ে আয়রার মুখ

Ayraহাসিনা আকতার নিগার: ভালোবাসা বা প্রেম শব্দটির উল্টো পিঠের অবিশ্বাস বা নির্মমতা শুধু দুজন মানুষকে  ধ্বংস করে দেয় না। তার চেয়েও বেশী অসহায়ত্বের দিকে নিয়ে যায় তাদের ঘরের সেই সন্তানটিকে, যার নেই কোন অপরাধ।

এ মূহূর্তে অনেক সন্তানের মতো সে পরিস্থিতির শিকার আয়রা। তন্বী যা পেরেছে তা একজন নারী হিসাবে সকলে পারে না। কিন্তু তন্বীর প্রতিবাদের সাথে যন্ত্রণার কথাগুলো অনেক নারীর জীবনের নিরব বেদনা। যা সে সয়েছে দিনের পর দিন। ভালোবেসে ঘর বেঁধে  মুকুলের সাথে সংসার করবে সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে এটাই তো চেয়েছে তন্বী।

কিন্তু হলো না আর তা।

চন্দ্রমুখী চলে যাবার পরও আবার সমাজ সংসারের রীতি-নীতি মেনে সামাজিক মর্যাদায় পরিবারকে হেয় হতে দেয়নি সেদিনও, যেদিন তার স্বামী নামের মানবিকবোধ বিবর্জিত মুকুল তার বান্ধবীকে বিকৃত ভালোবাসার পরিতৃপ্তি দিয়েছে স্ত্রীকে নির্যাতনের শব্দ টেলিফোনে শুনিয়ে।

এমন বর্বরতায় মুকুল-সিঁথি যে সুখ আর আনন্দ পেয়েছে তাতে কি একবারও ভেবেছে তন্বী তার সন্তানের মা। একজন নারী হয়ে সিঁথির কাছে বড় জানতে ইচ্ছে হয়, কী পেলে তুমি? নারী তো মায়ের জাত। সকল কিছুর পরেও একজন মা তার সন্তানের জন্য মাথা পেতে নিতে পারে চরম কষ্টটুকু। আর সেটাই করেছে তন্বী আয়রার জন্য।

চন্দ্রমুখী যেটুকু বাবার ভালোবাসা পেয়েছে, তার সিকিটুকু পেলো না আয়রা। সিঁথি তোমার সন্তান যদি থেকে থাকে তবে কেমন করে তুমি পারলে আয়রার সাথে এ অন্যায় করতে? লজ্জিত হই সিঁথির মতো নারীদের জন্য।

মানুষের জীবনে ভালোবাসা চিরস্থায়ী নয়। পদ্মপাতার পানির মতো টলমলে জীবনে ভালোবাসাকে আকঁড়ে সবাই বাঁচতে পারে না। তাই সিঁথি সব জেনে মুকুলের মতো মানুষের সান্নিধ্যকে উপভোগ করেছে নিজের স্বামী সংসার ছেড়ে। পুরুষের বহুগামিতা কিংবা একাধিক স্ত্রী সহনীয় হয় অনেক ক্ষেত্রে, কিন্তু একজন নারী দুই পুরুষে প্রকাশ্যে আসক্ত তা বোধ করি বাঙালী সমাজে গ্রহণীয় নয়। সিঁথি হয়তো সেই প্রথাই ভাঙতে চেয়েছে।

মুকুল, তন্বী, সিঁথি – তিনজনের টানাপোড়নের যে ঘা তার আঁচড়, আয়রার জীবনে কেমন করে থাকবে তা সবাই বোঝার কথা নয়। সাদা চোখে মুকুলের শাস্তি হলে এ সমাজ বলবে উচিত শিক্ষা হয়েছে। তবে সন্তানের কাছে বাবার এ ঘৃণ্য আচরণ কতটা বেদনার তা বলে বোঝানো যায় না। তা বুঝে কেবল সেই পরিবার আর সন্তান। আইন তার আপন গতিতে চলে কি করবে তা সময় সাপেক্ষ বিষয়।

হয়তো মুকুলের সমর্থেন তন্বীকে নানাকিছু বলা হবে। এসব কিছুর বাইরে গিয়ে যখনই একান্তভাবে একটি বার তন্বী আর আয়রাকে নিয়ে চিন্তা করলে তখন একটা অজানা শঙ্কা মনে বেজে যায়। মনে হয় তন্বী জীবনের চলার পথে এক কর্মজীবী নারী। সে জানে এ সমাজে একলা চলার পথে নারীদের পথ কতটা দুর্গম।

হয়তো তার চলার পথে পাবে সহযোগিতার হাত কিন্ত আয়রাকে সে কেমন করে বলবে – তার বাবা চায়নি তাকে, অথচ স্কুলের ভর্তি ফরমে লিখতে হবে সেই বাবার নাম। পাসপোর্ট করতে গেলেও রেহাই পাবে না। জীবনের প্রতিটা মূহূর্তে ‘মুকুল’ নাম থেকে তোমার মুক্তি নেই এই সমাজে। এ যন্ত্রণার ভার সইতে গিয়ে তন্বী বোন আমার তুমি টলে যেও না। এখন আয়রার কাছে তুমি সেই পৃথিবী হবে- যেখানে বাবা আর মা সবটাই তুমি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.