আমার না বলা গল্প-১১

Kannaসুরঞ্জনা চৌধুরী: ফজলুল বারী ভাই, রিপোর্টার রকিবুল ইসলাম মুকুল এবং মেহেরুন বিনতে ফেরদৌস সিঁথিকে নিয়ে লেখাটা আপনার ওয়ালে পড়ার পর ভেবেছিলাম আপনাকে কিছু লিখি। ভেবেছি, আর বার বার পিছিয়ে গেছি। কারণ একটাই, কেউ মূলত বিশ্বাস করে না সত্যিটা। আমি জার্নালিজমে অনার্স-মাস্টার্স করেছি।

আমার হাজব্যান্ডও একজন জার্নালিস্ট ছিল, সবসময় নারী অধিকার আর আদিবাসী অধিকার নিয়ে লিখতো, এখনও লিখে। কিন্তু বাসায় সে একজন ভিন্ন মানুষ। এমন মেন্টাল আর ফিজিক্যাল টর্চার নাই যে সে আমার ওপর করেনি গত তিন বছর। আমি সাফার করেছি, কারণ আমার বাবা-মাও বুঝতে পারতো না ও এমন আচরণ আসলেই করে। আমার কোনো দায়িত্ব সে নেয়নি কখনও।

বারী ভাই, ও আসলে আমার সেকেন্ড হাজব্যান্ড। আর অনেক ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে গেছিল, যখন আমি ক্লাস নাইনে পড়তাম। দুটা বাচ্চা রেখে হঠাৎ করেই সেই স্বামী মারা যায়, তখন আমি কলেজও শেষ করিনি। তারপর বাবার বাসায় থেকে পড়াশোনাটা চালিয়ে গেছে। অনার্সের প্রথম বর্ষ থেকে ফ্রিল্যান্ড কাজ করতাম, ফিচার রিপোর্টিং, ফটোগ্রাফি করতাম। এমন সময় এই দ্বিতীয়জনের সাথে আমার পরিচয়। আমাকে সে যখন প্রস্তাব দিয়েছিল, আমি একটা কথাই বলেছিলাম, আমার বাবা-মা যদি একমত হয় বিয়ের ব্যাপারে, তাহলেই বিয়ে করবো।

আর কোনো প্রেমে জড়াবো না, এটাই ছিল আমার সিদ্ধান্ত। আমি জানতাম, সমাজ যতোই আধুনিক হোক না কেন, সিঙ্গেল নারী, মা, বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তাদের জন্য এই সমাজ এখনও স্বাভাবিক না, এখানে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা খুবই কঠিন।

বারী ভাই, আরেক কথা ভুলে গেছিলাম। আসলে যারা সব থেকে বেশি আধুনিক, তাদের ঘরেই সব থেকে অন্ধকার। যা হওয়ার তাই হলো। সামাজিক যে কোনো প্রোগ্রামে সে আমাকে অথবা বাচ্চাদের নিয়ে যেত না। এমনকি ওর পারিবারিক প্রোগ্রামেও। সেইসাথে আস্তে আস্তে আমার কাজ করা বন্ধ করে দিল।

রোজ সে মাতাল হয়ে ঘরে ফিরতো, অত্যাচার করবো। এসবও সহ্য করেছিলাম ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। কিন্তু যখন দেখলাম আমার সন্তানদের ওপরও সে অত্যাচার করছে, তখন আর পারিনি নিতে। ডিভোর্স দিয়ে দেই।

যাওয়ার আগে সে বলে গিয়েছিল যে, মিডিয়াতে আমি জব করলে ও আমার সর্বনাশ করবে। বাবা-মাও মেয়েকে জব করতে দেবে না, ঘরে বসে আছি। চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম গত বছর এমবিএ করার জন্য। তাও ভিসা পাইনি।

জানি না বারী ভাই, কেন এই কথাগুলো আমি আপনাকে বলছি। কিন্তু বলতে পেরে মনটা হালকা লাগছে অনেক। আমি কখনও জুয়েলানি, দামী উপহার বা টাকা-পয়সা এসব কিছু চাইনি, শুধু শ্রদ্ধা, একটু যত্ন আর ভালবাসা চেয়েছিলাম। খুব বেশি কি চেয়েছিলাম আমি, বলেন তো বারী ভাই?

বাইরে যদি কখনো একসাথে বের হতাম, কোনো লোক আমার দিকে তাকালেও এটার জন্য টর্চার করবো, গালি দিতো।

আমরা কোথায় বাস করি, আমার অপরাধীটা কী ছিল, বলতে পারেন বারী ভাই? যেদিন আমার গলা টিপে দেয়ালে আমার পিঠ লাগিয়ে দিয়েছিল, আমার মেয়ে ভয় পেয়ে দৌড়ে আম্মাকে ডেকে নিয়ে আসছিল, তাই বেঁচে আছি, নাহলে হয়তো আপনার ওয়ালে আমাকে নিয়েও এমন কোনো লেখা পোস্ট হতো, তা পড়ে চোখ ভিজে যেতো আমার মতো অন্য কোনো মেয়ের। রুমানা মঞ্জুর মেম এর নিউজটা মনে আছে আপনার? আমাকে রোক হুমকি দিতো, ঠিক ওইভাবে আমার চোখ উঠিয়ে ফেলবে।

বাইরে সবার সামনে আমাকে সোনাবাবু বলে ডাকতো, কারও কল্পনাতেও ছিল না বাসায় ও কী করে। আসলে সাংবাদিক তন্বীকে নিয়ে আপনার লেখাটা পড়ে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, তাই লিখে ফেললাম নিজের কথা।

 

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.