মুক্তমনাদের এই বিভাজন কেন?

Communalismতামান্না কদর: যে কথাটি সংক্ষেপে আগে একবার বলেছিলাম সে কথাটা আরেকবার বিস্তারিত বলি। ফেসবুকেই শুধু নয়, বাস্তবেও মুক্তমনারা বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে। একজন মুক্তমনা আরেকজন মুক্তমনার কাছে বিতর্কিত হয়ে পড়ছে। এখানে বলে রাখি মুক্তমনা হলেই যে ভালো মানুষ হবে-এমন নয়। ভালো মানুষ হওয়ার জন্যে ভালো উদ্দেশ্য থাকতে হয়।

নারীবাদ নিয়ে লিখে অতি সম্প্রতি একজনের সন্দেহের শিকার হয়েছি।

আমার ব্যাপারে তার মন্তব্য- ‘আপনি কোন ধরনের নারীবাদী আমি বুঝি না।’ এ ব্যাপারে অবস্থানটা একটু স্বচ্ছ করার প্রয়োজন মনে করছি। নাম, যশ, খ্যাতি, সম্পদ এসব অর্জনে আমার কোনই আগ্রহ নেই; আমি শুধু চেয়েছি, অন্তত এই বাঙলাদেশের প্রতিটি নারী পুরুষের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত স্বাধীন জীবনযাপন করবে।

আজকেও হয়তো অনেকে তথাকথিত সুশীল, ছাগু ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে দিতে সচেষ্ট হবেন। আমি শুধু আজকের কথা ভেবে এই লিখাটা লিখতে বসিনি, আমাদের পথ যেতে হবে আরো বহুদূর। আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী রসদ কতোটা আছে তা অবশ্যই আমাদের মগজে রাখতে হবে।

একটা অসম যুদ্ধ কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। এই যুদ্ধে সঙ্গীদের কেউ প্রাণ হারাবে, যারা বেঁচে থাকবে তাদের মধ্যে কেউ সুবিধাবাদী হবে। এমনটি যে হতে পারে-এ বিষয়টিও মগজে রাখতে হবে। আঘাত ছাড়া, ভাঙ্গা ছাড়া কোনো কিছু গড়া যায় না। আঘাত করা জরুরি, ভাঙ্গাও জরুরি; তবে আঘাত করার আগে, ভাঙ্গবার আগে অবশ্যই ভাবতে হবে কতোটা গড়া যাবে বা আদৌ গড়া যাবে কীনা!

না, আমি মোটেও সুশীলতার পথ হাঁটছি না। নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করতে চাইছি, নিজেদের আরো ভালো মতো চিনতে চেষ্টা করছি। কারোর ভক্ত হলে যুক্তিবুদ্ধি লোপ পায়। আস্তিকরা ভক্ত বলেই তাদের যুক্তিবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। এখন মুক্তমনারও এই পথে হাঁটলে কথা ও ফল তো সে একই দাঁড়াবে।

২০১৫ সালে যে কজন খুন হলো চাপাতির আঘাতে তাদেরই একজন বলেছিলো- ‘বিদেশে বসে বা ছদ্মনামে লিখে, নবীকে কটাক্ষ করে, বা এইরকম সব আইটেম ফেসবুকে নিয়ে এসে বাঙলাদেশের সাধারণ নাস্তিকদের জীবন হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।’

আমিও তাই মনে করি। আমরা কেউ যদি শুধুমাত্র কটাক্ষ বা সমালোচনার মাধ্যমে আঘাত করে বদলে দিতে চাই বাঙলাদেশ, তাহলে যেনো নিজ নামে, ঠিকানা দিয়ে, ছবি দিয়ে লিখি। আসুন দেখি কার কতোটা সাহস, কার শরীরে কয়টা কল্লা আছে।

যারা খুন হয়ে গেলো তাদের জন্যে আমরা মাত্র কটাদিন শোক পালন আর মানববন্ধন ছাড়া কী করতে পেরেছি? কী করতে পারবো আমরা তাদের জন্যে? এতো মূ্ল্যবান প্রাণ কটা চলে গেলো কোনো দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলাম না, আমাদের অবস্থানটা তাহলে কোথায়?

প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে গিয়ে নিজের শক্তিটাও বাড়িয়ে তুলতে হয়, নইলে বোকার মতো নিজের অথবা সহযোদ্ধার প্রাণটাই দিয়ে দিতে হয়। আড়ালে থেকে, অন্য নামে সাহস দেখিয়ে আমরা কেনো অন্য সাহসী, প্রকাশ্যদের জীবন বিপন্ন করে তুলবো? বিপন্ন যদি করতেই হয় নিজেরটাই করি। অন্ধরা কিন্তু বাছাই করছে না-কে আঘাত করলো কে করলো না, তারা শুধু দেখছে একই মতাদর্শী কীনা। আর তেমন হলেই কোপ। যুক্তি যেখানে সীমাবদ্ধ সেখানে গালি এবং আঘাতই একমাত্র কর্ম।

পৃথিবীর আলোকিত অর্জনগুলি কেউ আঘাত করে আনেনি। নিজের মেধা, সততা আর শ্রম দিয়ে এনেছে। দৌড়ে জিততে হলে তিনটি উপায় আছে- ১. সবাইকে পেছনে ফেলে নিজে দৌড়ে যাওয়া, ২. ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে একাই দৌড়ে যাওয়া; ৩. ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজে আগে দৌড়ে যাওয়া।

বদলাতে চাই আর তাই প্রশ্ন করি, ত্রুটি ধরিয়ে দিই, ত্রুটি সরাবার উদ্যোগ নিই-এটি হোক পদক্ষেপ। নিজে ভালো দৌড়বিদ হলে সঙ্গীকে ল্যাঙ মারা বা ধাক্কা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। নিজের পরিবারেই তো আমরা কোনো পরিবর্তন আনতে পারি না, আঘাতটা জোরেশোরে আনতে পারি না, তাহলে ফেসবুকের পাতায় এসে সমালোচনার ঝড় তুলে অন্যের জীবন হুমকিতে ফেলবার দায় কেনো নেবো আমরা?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.