পাশেই আছি তন্বী বোন আমার

Tonni
নাজনীন আখতার তন্বী

প্রভাষ আমিন: তন্বী-মুকুল দম্পতির সাথে আমার পরিচয় ছিল না। এই দম্পতির কন্যা চন্দ্রমুখীর অকাল মৃত্যু আরো অনেকের মত আমাকেও কাঁদিয়েছে। এই গভীর ট্র্যাজেডির পর এই সাংবাদিক দম্পতির প্রতি গভীর আত্মিক সহমর্মিতা উপলব্ধি করেছি। সহমর্মিতাটা অ্যাকচুয়েল হলেও, প্রকাশটা ছিল ভার্চুয়াল। সন্তান হারানোর শোকে পাগলপ্রায় তন্বী পাঁচ তলা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ, কষ্টকর ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রক্রিয়া শেষে তন্বী আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।

২১ মাস পর যোগ দিয়েছেন তার কর্মস্থল জনকণ্ঠে। তন্বীর সাথে আমার এখনও দেখা হয়নি। তবে মুকুলের সাথে বইমেলায় আমার কয়েকবার দেখা হয়েছে। মুকুল শুধু ভালো সাংবাদিক নয়, ভালো লেখকও। অল্প-স্বল্প আলাপে তাকে আমার সংবেদনশীল মানুষ, স্নেহশীল পিতাই মনে হয়েছে। গতবছর বইমেলায় তাকে দেখেছি চন্দ্রমুখীকে নিয়ে বই করতে অনেক দৌড়ঝাঁপ করছেন। চন্দ্রমুখীর পিতা বলে সবসময় আমি বাড়তি সহানুভূতি নিয়েই তার সাথে কথা বলতাম।

চন্দ্রমুখীর অভাব পূরণ করতে ডাক্তারের পরামর্শে তন্বী-মুকুল দম্পতি আবার সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। তারপর নানাভাবে ধোঁয়ার গন্ধ পেতে থাকি। তন্বীর অভিযোগ, সে অসুস্থ হওয়ার পর, বিশেষ করে অন্তস্বত্বা (মা হওয়ার প্রক্রিয়া মোটেই অসুস্থতা নয়, এটা আনন্দের খবর) হওয়ার পর পাল্টে যায় মুকুল। তন্বীর অভিযোগ, অন্য এক নারীর সাথে সম্পর্কের জের ধরে মুকুল তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। এমনকি সন্তান নষ্ট করতে তার পেটে লাথি মারে। মুকুল বারবার তন্বীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। মুকুল তার প্রেমিকাকে টেলিফোনে রেখে স্ত্রী তন্বীকে নির্যাতন করে, যাতে স্ত্রীর চিৎকার প্রেমিকা শুনতে পায়।

একবার তন্বীর বন্ধুরা গভীর রাতে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ভারতে তন্বীর চিকিৎসা হয়েছে বন্ধুদের টাকায়। আর মুকুলের বন্ধুদের ভাষ্য, তন্বীর আত্মহত্যার চেষ্টাটাকে ভালোভাবে নেননি মুকুল। এমনকি এত তাড়াতাড়ি আবার বাচ্চা নেয়াতেও নাকি সায় ছিল না তার। এসবই আমরা দীর্ঘদিন ধরেই শুনে আসছিলাম।

Probhash Amin
প্রভাষ আমিন

অনেকেই ভেবেছিলাম, নতুন সন্তান তাদের সম্পর্কে নতুন মাত্রা দেবে। মুকুলের মাও নাকি তন্বীকে ধৈর্য্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, বাচ্চার মুখ দেখলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। বদলে যাওয়া মুকুলকে ফেরাতে পারেনি এমনকি চন্দ্রমুখীর স্মৃতি নিয়ে আসা আয়রাও। শেষ পর্যন্ত তন্বী মামলা করেছেন। আর সেই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে মুকুল এখন রিমান্ডে।

সাংবাদিক দম্পতির এই পরিণতিতে আমরা গভীরভাবে ব্যথিত। এর আগে সাংবাদিক দম্পতি আলীমুল-জয়শ্রীর বিচ্ছেদ, তাদের দুই সন্তানের আত্মহত্যাও আমাদের কাঁদিয়েছিল। আমার সহকর্মী মাশহুদুল হককে দেখলাম খুবই মন খারাপ করে বসে আছে। কারণ তন্বী-মুকুলের বিয়ের অল্প কয়জন সাক্ষীর মধ্যে সেও একজন।

আমি জানি আর সব বাঙালি নারীর মত বোন তন্বীও সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে সংসারটি টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেরিতে হলেও নিশ্চয়ই বাধ্য হয়েই তিনি আইনের আশ্রয় নিয়েছেন। এখন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তবে আমি ঠিক জানি না, আলাপ-আলোচনায় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব ছিল না। নিশ্চয়ই তাদের কমন বন্ধুরা সে চেষ্টা করেছেনও।

মুকুল একজন স্বাধীন মানুষ। তার তন্বীকে আর ভালো নাও লাগতে পারে, অন্য কাউকে ভালো লাগতেই পারে। মতে না মিললে তন্বীর সাথে ছাড়াছাড়িও হয়ে যেতে পারতো। পৃথিবীতে অনেক সংসার ভেঙ্গেছে। তবে ভাঙ্গার চেয়ে টিকে থাকা সংসারের সংখ্যা বেশি বলেই এখনও সভ্যতা টিকে আছে। এক-আধটু খিটিমিটি হলেই যদি আলাদা হয়ে যেতে হয়, তাহলে পৃথিবীর কোনো সংসারই টিকতো না। কিন্তু তন্বী যেহেতু থানা পর্যন্ত গেছে, তার মানে ব্যাপারটি নিশ্চয়ই আয়ত্বের বাইরে চলে গিয়েছিল। সংসার ভাঙলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় সন্তানের।

সব ঠিক আছে। মানলাম সবাই স্বাধীন। যে কারো যাকে ইচ্ছা তাকে পছন্দ করার, অপছন্দ করার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু প্রেমিকাকে ফোনে রেখে স্ত্রীকে নির্যাতন করে সেই চিৎকার প্রেমিকাকে শোনানোর মধ্যে যে স্যাডিস্ট মানুষের পরিচয় মেলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্বামী বা স্ত্রী, যে কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করা আইনের দৃষ্টিতেই অপরাধ। অপছন্দ করা আর আঘাত করা এক নয়। আপনাকে অপছন্দ করা আমার স্বাধীনতা। কিন্তু আমার স্বাধীনতা আপনার নাক পর্যন্ত। আপনাকে আঘাত করা আমার স্বাধীনতা নয়। অপছন্দ করা স্বাধীনতা, আঘাত করা অপরাধ। মুকুল সে অপরাধ করেছে। আমরা এর বিচার চাই, ন্যায়বিচার চাই। সবসময় যেমন ছিলাম, আমরা বোন তন্বীর পাশেই আছি।

আমার অতি প্রিয় কয়েকজন বোন, এই ইস্যুটিকে আবার নারী ইস্যু বানিয়ে ফেলতে চাইছেন। কেন তন্বীর পক্ষে পুরুষরা সোচ্চার নয়, সেটা নিয়ে দুয়েকজন অভিযোগও করেছেন। আমি কিন্তু ইস্যুটিকে নারীবাদী দৃষ্টিতে দেখতে চাই না। আমি ইস্যুটিকে দেখতে চাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তন্বীর বন্ধুদের বেশিরভাগ নারী বলেই হয়তো সামাজিক মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ছে। কিন্তু সংবেদনশীল পুরুষ বন্ধুরা তার পাশে নেই, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

তবে আমি তন্বীর পাশে আছি, সে নির্যাতিত বলে, নারী বলে নয়। আমি ন্যায়ের পক্ষে। আমার কাছে যদি মনে হতো এই ঘটনায় তন্বী দোষী, আমি অবশ্যই তাকে দায়ী করতাম। কোনো বিষয়কে চট করে নারী পুরুষ ভাগ না করে মানবিকভাবে বিবেচনা করলে ভালো। আর মুকুল যার সাথে প্রেম করছে, যাকে টেলিফোনে নির্যাতিত স্ত্রীর চিৎকার শুনিয়েছে, সেও তো একজন নারীই। তবে তন্বীর পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আমরা যেভাবে মুকুলের সেই প্রেমিকার ব্যক্তিগত বিষয়-আষয় প্রকাশ্যে নিয়ে আসছি, তাকে যেভাবে গালিগালাজ করছি, সেটাও কিন্তু ঠিক নয়। একজন নারী হিসেবে তারও তো কিছু প্রটেকশন প্রাপ্য। তার যতটুকু অপরাধ, ততটুকুর সাজা তাকে দেয়া হোক।

নারী-পুরুষ এভাবে আলাদা করে না ভেবে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করলেই ঝামেলা মিটে যাবে। ভালো নারী যেমন আছে, খারাপ নারীও আছে। খারাপ পুরুষ যেমন আছে, ভালো পুরুষও আছে। সবাইকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে ভালোমন্দটা, ন্যায়-অন্যায়টা বিবেচনা করলে ভালো হয়। নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে বরং ইস্যুটিকে কোনঠাসা করা হয়।

আশা করি আমার প্রিয় বোনেরা বিষয়টি মাথায় রাখবেন। বোনদের বিপদে ভাইয়েরা পাশেই আছে। ভাই-বোন পাশাপাশি থাকলে শক্তি অনেক বেশি। ভাই-বোন আলাদা হলে, প্রতিপক্ষ হলে দুই পক্ষের শক্তিই কমে যায়। বোনেরা আস্থা রাখুন, বিপদে আপদে ভাইয়েরা আপনাদের পাশেই আছে।

[email protected]

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.