আসুন, প্রতিপক্ষের হাতে অস্ত্রটা তুলে না দেই

Draupodi 1ইশরাত জাহান ঊর্মি: বিভেদটা কেন আসে, কিভাবে আসে, কারা আমাদের চোখ সুচতুরভাবে সরিয়ে দেয় অন্যদিকে (অবশ্যই নারীর দিকে), আমরা তা এখনও বুঝতে পারি না। এতো কিছুর পরও। এতো নারীবাদী বুলি কপচানোর পরও। আমার সত্যিই মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, আমরা কি সত্যিই মুক্তি চাই? নাকি এসব আমাদের ভাতঘুম সেরে একটু প্রতিবাদী হওয়ার ফ্যাশন?

সকাল থেকে গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক রকিবুল ইসলাম মুকুলের ঘটনা পড়ছি আর এসব কথা মাথার মধ্যে ঘুরছে। জানি না কে, কি বলবেন, আমি স্পষ্টই বলছি মুকুলের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠা মেয়েটার হাফপ্যান্ট পড়া ছবি ফেসবুকে পোস্ট করাটা আমি পছন্দ করছি না। এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি আমি।

এই ছবিটা যতদূর মনে পড়ে যিনি পোস্ট করেছেন অবশ্যই তন্বীর ভালো চান, তন্বীর সাথে যে অপরাধ হয়েছে সেই অপরাধের বিচার চান এমন একজনই।

আমি জানতে চাই, আপনার আপত্তিটা কোথায়, মেয়েটার অপরাধ, না কি মেয়েটার হাফপ্যান্ট পরা? হাফপ্যান্ট পরে খারাপ মেয়েরা…এই যে চিরবিতর্কের এবং আদি পুরুষ টাইপের ধারণা, আমি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

তার মানে কি এই, মেহেরুন বিনতে ফেরদৌস সিঁথি নামের মেয়েটা অপরাধী নন? অবশ্যই তা নয়। সিঁথি অনৈতিক আচরণ করেছে, সবকিছু জেনে এবং বুঝে নিশ্চয় সে এই কাজ করেছে, যা অবশ্যই অন্যায়। অতএব তাকে নারী হিসেবে নয়, একজন অপরাধী মানুষ হিসেবেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত।

তার সেক্সি অ্যাপিলের ছবি যদি আপনি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চান, তাহলে জানবেন আপনিও কোনো একদিন এই অস্ত্রের কোপে কোন না কোনভাবে পড়তে পারেন।
আমরা নারীর প্রতি অবমাননার প্রতিবাদ করি সবসময়। চলায়, বলায়, লেখায়, সাংবাদিকতায়। কিন্তু হয়তো সাংবাদিক ও সহকর্মী নাজনীন আখতার তন্বী আপার ঘটনাটি আমরা খুব কাছে থেকে দেখেছি এবং জেনেছি বলেই এক্ষেত্রে আমাদের পেশাদারিত্ব এবং ফেসবুকে কমেন্টও কোন নীতিমালা মানছে না।

দেখলাম একজন লিখেছেন, ঐ ডাইনীকেও শাস্তি দিতে হবে। উইমেন চ্যাপ্টারের নিউজ এ লেখা হয়েছে, মুকুল ‘পরনারী’তে আসক্ত হয়ে পড়ে। এই শব্দগুলোর বিরুদ্ধেই কিন্তু আমরা এতোদিন লড়াই করেছি।

সিঁথিকে আপনি ডাইনী বললে মুকুলকে কী বলবেন? ডাইনীর বিপরীত পুরষ শব্দ কী? পরনারীতে আসক্ত মানে কী? নারী কী মদ না গাঁজা যে, তাতে আসক্ত হওয়া যায়? এইসব শব্দ দিয়ে কি হচ্ছে জানেন, আমরা সিঁথির দিকে নজর দিচ্ছি, সিঁথির চরিত্র কত খারাপ তাই নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করছি, আর ভুলে যাচ্ছি তন্বীর শেষপর্যন্ত লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া শক্তিমতী দিকটিকে।

আর একটা বিষয়ে খুব মজা পাচ্ছি। সকল সমব্যাথী, সকল প্রতিবাদকারী, সকল অন্যায়ের বিচারপ্রার্থীদের এখন ফেসবুক এ পাওয়া যাচ্ছে। সাংবাদিক আঙ্গুর নাহার মন্টি বা সুপ্রীতি ধর এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন আমার চেয়ে। তারা যখন দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, তন্বীর বিষয়টির একটা সুরাহার জন্য, তখন তেমন কাউকে পাওয়া যায়নি। তখন এই ফেসবুক এর বিবেকরা মুখ চোখা করে শুনেছেন, বড়জোর ঠোঁটে চুকচুক শব্দ করে আহা-উহু করেছেন, কেউ আবার “ভাইরে এটা তো একান্তই ওদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার” বলে এড়িয়ে গেছেন, আর এখন যখন তন্বী সব আগল খুলে মামলা করেছে আর তারই জের ধরে মুকুলকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তখন সেই তাদের প্রায় সবারই তন্বী বোন হয়ে গেছেন। আমি এটাকে মন্দ বলি না। দেরী হোক যায়নি সময়। তবুও বিবেকের দরজা খুলুক।

আর যারা সব জেনেও মুকুলকে দিনের পর দিন পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে গেছেন, যাদের আশ্রয়ে থেকে মুকুল এতোদিন ধরে অভিযোগে উল্লিখিত নির্যাতনগুলো করে গেছে তন্বীর সাথে, তাদের সম্পর্কে বোনেরা, ভাইয়েরা, নিদান কি? জানার অপেক্ষায় রইলাম।

সাংবাদিক ও লেখক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.