‘অবশেষে’ সাংবাদিক রকিবুল গ্রেপ্তার

Naznin Mukul
চন্দ্রমুখীর সাথে নাজনীন ও রকিবুল

উইমেন চ্যাপ্টার: আবারও সংবাদ হলেন সাংবাদিক দম্পতি। একবার হয়েছিলেন সন্তান চন্দ্রমুখীর মৃত্যু ও পরবর্তীতে শোকাতুর মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টার পর, আর এবার হলেন সেই ‘শোকাতুর মা’ এবং বৈধ স্ত্রীকে নির্যাতনের দায়ে স্বামী, গাজী টিভির সাংবাদিক রকিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নাজনীন আখতার তন্বীর দায়ের করা মামলায় গতরাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন উইমেন চ্যাপ্টারকে এ খবর নিশ্চিত করেছেন। আজ শনিবার তাকে একদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

আশ্চর্য হলেও সত্য যে, যে শোকগ্রস্ত পিতা তার সন্তানের মৃত্যুর পর লিখে গেছেন দিনের পর দিন, বই বের করেছেন, সেই পিতাই তাদের দ্বিতীয় সন্তানকে অস্বীকার করে পরনারীতে আসক্ত হয়েছেন, জড়িয়েছেন অনৈতিক সম্পর্কে। শুধু তাই নয়, দিনের পর দিন নির্যাতন করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক স্ত্রীকেও। 

এ ব্যাপারে নাজনীন আখতার বলেন, ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর একমাত্র মেয়ে চন্দ্রমুখী মারা যাওয়ার পর শোকে তিনি পাঁচতলা থেকে লাফ দিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হন। এরপর দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলেন। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে আবার তাঁরা দুজন সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পরবর্তীতে রকিবুল এ সন্তান তার কাঙ্খিত সন্তান নয় এবং তিনি নতুন সুখের সন্ধান পেয়েছেন উল্লেখ করে একটি স্ট্যাটাসও দেন ফেসবুকে। এমনকি সেখানে নাজনীনকে শুধুমাত্র কাগজের বউ বলেও উল্লেখ করেন।

এর মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায় যে রকিবুল ছায়ানটের শিল্পী এবং ঢাকা ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার রাজিউল আমিনের স্ত্রী মেহেরুন বিনতে ফেরদৌসের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে কথা বললে স্বামী রকিবুল বিভিন্ন সময়ে নাজনীনকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। একবার রক্তাক্ত অবস্থায় সহকর্মীরা বাসা থেকে নাজনীনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এর কিছুদিন পর তাঁর দ্বিতীয় কন্যার জন্ম হয়। কিন্তু সন্তানের জন্মের পর থেকে কখনোই খোঁজ নিতেন না মুকুল।

নাজনীন অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে রকিবুল তাঁর কাছ থেকে টাকাও নিয়েছেন। সর্বশেষ রাজউকে পূর্বাচলে বরাদ্দ পাওয়া একটি প্লটের কিস্তির জন্য তিনি বোন এবং দুলাভাইয়ের কাছ থেকে এনে ১৪ লাখ টাকা দেন রকিবুলকে। কিন্তু রকিবুল ওই প্লটটি নিজের নামে লিখে নেন এবং সম্প্রতি সেটা বিক্রিও করে দেন। কথা ছিল, কিস্তির টাকা পরিশোধের পরিপ্রেক্ষিতে ওই জমির তিন কাঠা দুলাভাইকে দেয়া হবে। এ ব্যাপারে রকিবুলকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি পুরোপুরিই অস্বীকার করেন, উপরন্তু শক্তি এবং সাহস থাকলে মামলা করতে বলেন। এটাও বলেন যে, মামলা করেও কোনো লাভ হবে না।

এত দিন মামলা না করার বিষয়ে নাজনীন আখতার বলেন, সবার পরামর্শে ও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি এত দিন মামলা করেননি। কিন্তু এখন বাধ্য হয়েই মামলা করলেন। তিনি তাঁর সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে, এর ন্যায়বিচার দাবি করেন।

একটু পেছন ফেরা যাক।

পাঁচ বছরের মেয়ে চন্দ্রমুখীর মৃত্যুর ঘটনা এবং পরবর্তী কন্যাশোক সইতে না পেরে মা নাজনীনের পাঁচ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টার কারণে এই সাংবাদিক দম্পতি সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। ভাগ্যক্রমে সেবার বেঁচে যান নাজনীন, কিন্তু তার হাত ভেঙে যায়, মেরুদণ্ডও ব্যাপক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। সাংবাদিক মহল ছাড়াও এই ঘটনাটি তখন ব্যাপক নাড়া দেয় সাধারণের মনেও। দীর্ঘদিন নাজনীন চিকিৎসা নেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিআরপিসহ নানা জায়গায়। এরই মাঝে সে আবার অন্ত:সত্ত্বা হয়।  কিন্তু নাজনীনের স্বামী মুকুল সেই সন্তানকে অস্বীকার করে। সে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়, এটা তার অনিচ্ছার সন্তান। শুধুমাত্র তন্বীর চাওয়ার কারণেই নাকি বাচ্চা পেটে এসেছে। সে এখন অন্য নারীতে সুখ খুঁজে পেয়েছে (একথা জানাতেও দ্বিধা করে না মুকুল)। এরপর থেকে নাজনীনের ওপর নির্যাতন নেমে আসে। চার মাসের অন্ত:সত্ত্বা অবস্থায় একরাতে পেটে লাথি মারে কথা কাটাকাটির জের ধরে। নাজনীন তারপরও চেষ্টা করেছিল সংসার টিকিয়ে রাখতে, সে ওই অবস্থাতেও মামলা করেনি মুকুলের বিরুদ্ধে। কিন্তু মুকুলকে আর ফেরানো যায়নি।

এরই মাঝে মুকুল আর তার নতুন বান্ধবীর (মামলার দ্বিতীয় আসামী) নানারকম অশ্লীল ছবিও আসতে থাকে ফেসবুকের কল্যাণে।

ডিসেম্বরে জন্ম নেয় নাজনীনের দ্বিতীয় মেয়ে আয়রা। যখন সবাই চিন্তিত বাচ্চার সুস্থতা নিয়ে, তখন সে সবাইকে চমকে দিয়ে বেশ সুস্থভাবেই জন্ম নেয়। কিন্তু রকিবুল ইসলাম মুকুল একবারের জন্যও ফিরে তাকায় না বাচ্চার দিকে। এরই মাঝে খবর আসে, মুকুল এবং তার বান্ধবী রামপুরা বনশ্রীতে বাসাভাড়া নিয়ে একসাথে বসবাস করছে।

সবশেষ আঘাতটা আসে পূর্বাচলের জমি বিক্রি করে দেয়ায়। নাজনীন নিজের ও মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই খেই হারিয়ে ফেলেন এ সংবাদে। এরপরের ঘটনা তো সবার জানা।

নাজনীন বলেন, এরকম ঘটনা অনেক মেয়ের সাথেই হয়তো ঘটে। কিন্তু মুখ খুলতে চায় না অনেকে শুধুমাত্র সামাজিকতার কথা ভেবে। তার সাথে যা হয়েছে, এটা সহ্য করে নেয়া মানে এ ধরনের অন্যায়গুলোকেই প্রশ্রয় দেয়া। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে যা মোটেও কাম্য নয়। তিনি চান, এর দৃষ্টান্তমূলক একটা শাস্তি হোক।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.