বাসনার আঁচলে নীলস্বপ্ন

Laily
সালেহা ইয়াসমীন লাইলী

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: আমার মায়ের নীল শাড়িটা আমার খুব পছন্দের। মায়ের অনেকগুলো শাড়ি আমার পছন্দের। তবে নীলটা একটু বেশি টানে আমাকে। বাড়িতে গেলে মায়ের আলমারির পাশে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ কাঁচের ফাঁক দিয়ে থাক থাক করে সাজানো ও ঝুলিয়ে রাখা শাড়িগুলো দেখি। এতো সুন্দর শাড়ি খুব কম মানুষের থাকে। আমার মায়ের আছে। আমার আব্বা মায়ের কোন শখ কখনও অপূরণ রাখে না। যখন যা চায় পেয়ে যায়। নানা-নানীর একমাত্র মেয়ে হিসেবেও সবটুকু পেয়েছে আমার মা।

আর আমার মায়ের আটজন ছেলেমেয়ের মধ্যে আমি ছাড়া সবাই সুমানুষ, বিত্তবান। তারা সবাই মাকে সুন্দর সুন্দর শাড়ি কিনে দেয়। এই নীল শাড়িটি মা ঈদে পেয়েছে ছোট ছেলের কাছ থেকে। অবশ্য মা কোন শাড়িই তেমন পরে না। শুধু আলমারিতে সাজিয়ে রাখে। এখনও বিভিন্ন উৎসবে-অনুষ্ঠানে মা মার্কেটে গিয়ে শাড়ি কেনে। অযোগ্য এই আমি, তবুও আমার কাছ থেকে মা প্রতিবছর শাড়ি চেয়ে নেয় পরার জন্য। আমার কেনা সস্তা শাড়িটি নাকি তার পরতে আরাম লাগে।

মাযের আলমারিতে যত শাড়ি সাজানো আছে তার জীবদ্দশায় সেগুলো পরে শেষ করে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। তাছাড়া প্রতিবছর সেখানে অন্ততঃ আরো নতুন ১০টি শাড়ি যুক্ত হয়। এই শাড়িগুলো মা নিজেও তেমন পরে না। মাঝে মাঝে আলমারি খুলে তাকিয়ে থাকে গুছিয়ে রাখা শাড়ির দিকে। যত্নের হাতে ছুঁয়ে দেয় শাড়ির শরীর। আবার তালা লাগিয়ে রেখে দেয় আলমারিতে।

আমি সবগুলো শাড়ি দেখি না, শুধু নীল শাড়িটা দেখি। এই শাড়িটা অনেক বেশি পছন্দ যে আমার। কিন্তু কখনই চাইতে পারি না। তাছাড়া মা কখনও তার শাড়ি কাউকে পরতে দেয় না, জানি। প্রতি বছর ঈদে আমি দোকানে দোকানে গিয়ে খুঁজি যদি সেই শাড়িটা পাই, কিনে নেব। তেমন একটা নীল শাড়ি। গাঢ় নীল। পাড় ও জমিতে গোলাপী সুতায় ছোট ছোট কাজ। সেই শাড়ির মতো কাছাকাছি মিলে গেলে আবার আমার সামর্থ্য কুলায় না বাজেটে। আমার আর  নীল শাড়ি পরা হয় না।

আমার কখনই কারো কাছে কিছু চাওয়া হয়নি। কোন সম্পর্ককেও এতোটা দাবিতে কাছে পাইনি আমি কখনও। নিজের সংসারে ছেলে-মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে থাকলেও কাউকে বলতে পারিনি। ছেঁড়া কাপড়ে থাকলেও চাইতে পারিনি আপনজনদের(!) কাছে। ছেলেমেয়েদের যতটা সম্ভব মানানসই পরিচ্ছদ দেয়ার চেষ্টা করে গেছি, যাই আজো। তাতে নিজের স্যান্ডেল জোড়া, হাতের ব্যাগটা কয়েকবার মুচির বাড়ি থেকে ঘুরে আসে। ছেলেমেয়েরাও আজকাল আমাকে লুকিয়ে স্যান্ডেল সেলাই করিয়ে নেয়। যখন রাস্তার টুকরো ইট-পাথর স্যান্ডেলের তলা ক্ষয়ে পায়ের তলায় খোঁচাতে থাকে, তখন আর সম্ভব হয় না লুকানোর। তখন আমাকেই বলতে হয় তাদের, আন্দাজ করি।

নিজের ছোটবেলা নিয়ে ভাবলে বুঝতে পারি আমার সন্তানদের সংকট ও কষ্ট। স্কুল শিক্ষকের বড় পরিবারে, আট ছেলেমেয়ের সংসারে পোশাক-পরিচ্ছদের সব সময় টান থাকতো। এই টানের রশি পরিবারের সবাইকে পেঁচিয়ে আমার কাছে এসে পৌঁছাতেই পারে না। আমার মনে পড়ে না কখনও নতুন কাপড়ের জামা পরেছি কিনা।

সে সময় গ্রামের বাজারে পুরোন কাপড়ের দোকানে ‘ডাকের কাপড়, নামে ব্যবহৃত বিদেশি গাউন নিলামে বিক্রি হতো! মা সেখান থেকে শামছুল বড় আব্বাকে দিয়ে কয়েকটি আনিয়ে নিতেন। তারপর সেগুলো কেটে দর্জিকে দিয়ে বানিয়ে নেয়া হতো আমাদের পাঁচ বোনের জামা-সালোয়ার। সেখান থেকেও ইচ্ছেমতো কাপড় পছন্দ করার উপায় ছিল না। বোনদের মধ্যে যাদের গায়ের রঙ কিছুটা শ্যামলা তারা অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল রঙের কাপরের জামা পেত। গায়ের রঙ এর ভাগ্যে আমার জামা ভাগ্য বরাবরই পিছনের সারিতে থাকতো।

স্যান্ডেল বলতে ছিল একজোড়া স্পঞ্জ। স্পঞ্জের ফিতার তিনটি জোড়াতেই তালি পড়তো ব্যবহারে। সেগুলো পরে থাকতে হতো বাড়িতে, আবার স্কুলেও যেতে হতো। বাড়ি থেকে ২ কিলোমিটার দূরের স্কুল ছুটির পর হুড়াহুড়ি করে বের হতে গিয়ে প্রায়ই স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে যেত। পাশের মুচির বাড়িতে স্যান্ডেল রেখে খালি পায়ে বাড়ি চলে আসতাম। যতদিন সেলাইয়ের চাপ সইতে পারতো সোল, ততদিন ফিতা পাল্টিয়ে স্যান্ডেল পরা হতো।

ছোটবেলার ঈদের আনন্দ বলতে আমি বুঝতাম আমার বাড়ির উঠান ঘেঁষা ঈদমাঠের আয়োজন। টেপুমামু খোড়া পা দুটি নিয়ে বসে বসে দুহাতে ঝাড়ু নিয়ে কয়েকদিন ধরে কাঁচামাটির ঈদগা পরিস্কার করতেন। স্কুল ছুটি হওয়ায় আমি অনেক ছেলেমেয়ের সাথে মামুর পিছনে পিছনে ঘুরতাম আর কিচ্ছা শুনতাম। মামু সারাদিন এক নাগাড়ে কিচ্ছা বলে যেতে পারতেন। তার এক একটা গল্পে আয়তন থাকতো অন্ততঃ তিনদিন। ঈদ উৎসব যেন কিচ্ছা শোনার উৎসব হতো আমার।

ঈদের দিন সকালে কয়েক গ্রামের মানুষ নামাজ পড়তে আসতো। নামাজ শেষে অনেকেই আমাদের বাড়িতে ফিরনি খেয়ে বাড়ি ফিরতো। তাছাড়া প্রতিবছর রোজার ঈদে মাঠে মানত এর ফিরনি দেয়া হতো। এই মানত শুরু হয়েছে আমার চার বছরের ছোট ভাইয়ের জন্ম উপলক্ষে। পাঁচ মেয়ে হওয়ার পর যখন আমার মা আবারো সন্তান সম্ভবা তখন আমার আব্বা মানত করে, যদি এবার ছেলে সন্তান হয় তবে তিনি নবীর নামে নাম রাখবেন ও প্রতি ঈদে মাঠে ফিরনি দিবেন। আব্বা তার মানত চালিয়ে যাচ্ছে আজো।

ছোটবেলায় আমরা পাঁচ বোন কখনও ঈদে কোন নতুন কাপড় পাইনি। ঈদে আব্বা নিজের জন্য পাঞ্জাবী, পায়জামা, লুঙ্গী, গেঞ্জি কিনতেন। মায়ের জন্য শাড়ি-ব্লাউজ ও স্নো-ক্রিম, নানীর জন্য শাড়ি ও বাড়ির কাজের লোকদের জন্য নতুন কাপড় কিনে দিতেন। আমার ছোট ভাইটির জন্যও পাঞ্জাবী-পায়জামা, স্যান্ডেল কিনতেন। কিন্তু আমরা পাঁচ বোনের বরাদ্দে কিছু থাকতো না। বড়জোর কয়েকজোড়া নতুন স্যান্ডেলের ফিতা আমাদের জন্য আনতেন। আমরা তাতেই আহ্ণাদিত হয়ে লাগিয়ে নিতাম স্যান্ডেলে আর মনে মনে ভাবতাম অন্তত কিছুদিন আর মুচির বাড়িতে যেতে হবে না।

আমার বড় বেলায় নিজের সবটুকু চেষ্টায় ছেলে-মেয়েকে দিতে চাইতাম। তারা যেন আমার মতো কষ্ট না পায় তাই পুরোটুকুই দিয়ে দিতাম। এই দায় আজো আমার ঈদের সাথে ভারী হয়। এখনকার ঈদে আমার নিজেকেও কিছু কিনতে হয় সন্তানদের খুশি করার জন্য। কারণ ওরা চায় আমিও ঈদের খুশির মেজাজে থাকি।

জীবনে অনাকাঙ্খিতভাবে কোন অনাপনের আপনত্য আমাকে কয়েকবার চমকিত করেছে। তেমন কেউ যখন কিছু উপহার আমার হাতে ধরিয়ে দেয়, আমার চোখ জোড়ায় নীল আলো ঝলক দেয়। উচ্ছসিত খুশির বানে প্লাবিত হয় চোখ। না হোক সেটা নীল শাড়ি, নীল আলোয় আমি তো তা কম দেখি না! যে রঙেরই হোক, সে আঁচলে আমি বেঁধে রাখি আমার নীল স্বপ্ন।

আমার সামর্থ্য আমাকে নীল শাড়ি কেনার বাসনা মেটায় না। এই অসমর্থ বাসনাই হয়তো আমার বেঁচে থাকার এক এক ফোঁটা প্রাণ। চাই না নীল শাড়ি, তবু আমার সে বাসনা যেন বেঁচে থাকে।

লেখক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  • 55
  •  
  •  
  •  
  •  
    55
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.