চাকরিজীবী স্ত্রীর অধিকার কারো দান নয়

Genderতামান্না ইসলাম: চাকরিজীবী স্ত্রী বা মায়ের জীবন কেমন? আসুন দেখি আপনারা কেউ মিল খুঁজে পান কিনা এই ঘটনাগুলোর সাথে:

১। বাচ্চা যখন ছোট ছিল তখন প্রায়ই শুনতাম, বাচ্চারা ডে কেয়ারে গেলে দুনিয়ার অসুখ-বিসুখ নিয়ে আসে, চাকরি করে কী লাভ, যদি বাচ্চা সুস্থই না থাকে? ১২ মাসে ১৩ বার অসুখ হয়। অসুস্থ বাচ্চাটাকে রেখে যাবো কোথায়, সেই চিন্তায় মাথা খারাপ, রোজ রোজ কাজে ফাঁকি দিয়ে বেতন গুনতেও নিজের কাছে ছোট লাগে, বছর শেষে খারাপ রিভিউ পেতেও মন খারাপ। যত শিক্ষিত, উদারপন্থী, বন্ধু কাম স্বামীই হোক না কেন, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই বাচ্চা হলো মায়ের রেসপনসিবিলিটি।

বাচ্চা কোথায় কিভাবে থাকবে তার বন্দোবস্ত করে চাকরি করতে পারলে করো, না পারলে স্যরি। খুব বেশী পরিমাণ আশা করা গেলে যেটুকু করা যাবে সেটা হলো, বাচ্চা যদি ১৩ দিন অসুস্থ থাকে তাহলে মায়ের অত্যন্ত জরুরি কোন কাজ থাকলে, বাবা দুইদিন দায়িত্ব নিবেন মায়ের অনেক অনুরোধের পরে।

অনুরোধের সুরটা এরকম “আমাকে একটু সাহায্য করো প্লিজ আমার চাকরিটা টিকিয়ে  রাখতে।”  

খাতা কলমে সে তো রুটি-রুজি করে, এমনকি  স্ত্রীর বেতন তার চেয়ে বেশী হলেও। কখনো শুনেছেন বাচ্চা পালার জন্য কোন বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে? কিন্তু প্রতিদিন অসংখ্য মা-ই তাই করছেন।  

২। বাচ্চা একটু বড় হলো, পড়ালেখার ফলাফল আশানুরূপ নয়, খেলাধুলা, নাচ, গান ঠিকমতো হচ্ছে না। বাচ্চার ভবিষ্যৎ ঝরঝরা। হবে না? সব মায়ের দোষ। চাকরি করে নিজের ক্যারিয়ার গড়ছে, বাচ্চার যত্ন নেওয়ার সময় কই?

এখনো সময় আছে, বাচ্চার ভবিষ্যৎ যদি ঝরঝরে হয় তাহলে আর নিজের ভালো ক্যারিয়ার দিয়ে কী হবে? ছাড়ো চাকরি। এই কথাটা আজ পর্যন্ত শুনতে হয়েছে কোনো বাবাকে? বাবার চেয়ে বেশী কষ্ট করে কিন্তু মা-টা পড়াশুনা করেছে, শ্বশুর বাড়ি মানিয়ে গভীর রাতে সবাই ঘুমালে দরজা বন্ধ করে পড়ালেখা করেছে, সেই কথাটা কি মনে পড়ে কারো?

৩। বাচ্চা আরও বড় হলো, আদব কায়দা মেনে চলে না, ধর্ম কর্ম করে না, পোশাক আশাক ঠিক না, এই সব দোষও মায়ের। চাকরি করতে গিয়ে খেয়ালই  করেনি, ছেলেমেয়ে বখে গেছে কখন। পড়ালেখায় ভালো, তা  ধুয়ে কি পানি খাবে? মানুষ তো হয়নি ঠিকমতো। এখন তো আর বুক চাপড়েও লাভ হবে না, করো আরও চাকরি! ছেলেমেয়ের সাথে কী বিরাট দূরত্ব হয়ে গেছে, মেয়ে মানুষ চাকরি করলে এমনই হয়। সংসারের সব রকম দূরত্ব পূরণের দায়িত্ব তো মায়েরই।

৪। স্বামী স্ত্রীর দুইজনেরই কাজের স্ট্রেস অনেক বেশি, সেই সাথে সংসারের চাপ। দিন রাত ঝগড়া, একে অপরকে সহ্য হচ্ছে না। দোষ কার? স্ত্রী’র। রহিম, করিম এর বৌরা বাসায় থাকে, কোন স্ট্রেস নাই। দিনের শেষে বিউটি ন্যাপ নিয়ে স্বামী বাড়িতে আসার আগেই তিন রকম মজাদার স্ন্যাকস বানিয়ে, পরিপাটি হয়ে অপেক্ষায় থাকে, সঙ্গে বোনাস মিষ্টি হাসি। আর তুমি? এগুলো না হয় নাই পারলে, সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরি, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় অর্ডার। সারাক্ষণ বৌ এর অর্ডার শুনতে ভাল লাগে? ওহ, আমার তো মনেই নাই যে তোমাকেও অফিসে কাজ করতে হয়। কী দরকার তোমার কাজ করার? আমি তো তোমাকে বলি নাই কাজ করতে, আমার বেতনে তো দিব্যি চলে।

৫। বাচ্চার হোম ওয়ার্ক, কোন  টিচারের কাছে পড়বে, স্কুলে সমস্যা হচ্ছে, তুমিই  তো দেখবে, আমি কী আর এমনি এমনি শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করেছি? মনে রেখ সংসার তোমার ফার্স্ট প্রাইওরিটি।

৬। ভ্যাকেশন প্ল্যান, এই পেপার ওয়ার্ক, সেই পেপার ওয়ার্ক, অমুক অফিসিয়াল কাজ, তমুক অফিসিয়াল কাজ তুমিই তো করতে পার, অশিক্ষিত মেয়ে তো আর না। সময়ের অজুহাত শুনতে চাই না, আমর দিন ২৪ ঘণ্টা, তোমারটা তো ৪৮ ঘণ্টা।  

…………………………………………………………………………………………………..

উপরের ঘটনাগুলো আমার বা নির্দিষ্ট  কোন চাকরিজীবী স্ত্রীর বা মায়ের গল্প না, এটা একটা সামগ্রিক চিত্র, অনেক গুলো খণ্ড খণ্ড ঘটনাকে একত্র করে সাজানো। এর ব্যতিক্রমও অবশ্যই আছে। আজকাল অনেক ছেলেই বউদেরকে বিভিন্ন কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়,  এটাকে নিজের দায়িত্ব মনে করে।

আমার স্বামীর ভাল স্বামী এবং বাবা হিসাবে বিশেষ সুনাম আছে, এতোই বেশী সুনাম যে মাঝে মাঝে আমারই লজ্জা লাগে। তারপরেও আমার মনে হয়, প্রোগ্রাম করে দিলে ঠিকঠাক মতো আউটপুট  আসে, কিন্তু প্রোগ্রামটা আমাকেই করতে হয়।

কিন্তু এই যে সে প্রোগ্রামটা চালাতে পারে তাতেই আমি ধন্য। প্ল্যান করে বলে দিলে বাচ্চা উঠানো- নামানোতে অনেক হেল্প করে, বেশ কিছু আইটেম ভাল রান্না করতে পারে, ইচ্ছা হলে করেও, থালা- বাসন ধোয়া, কাটাকুটি শেয়ার করে, ও লন্ড্রি লোড করলে, আমি কাপড় ভাঁজ করি, দরকার হলে বাড়িঘর পরিষ্কারেও তো সাহায্য করে, এতো কিছুই বা কম কি?

এই দেখেই আমার বন্ধুদের প্রশংসার শেষ নেই। আমার যে বাকি অবদান সেটা তো গণনার মধ্যে নেই, তুমি চাকরি করো বা না করো, তুমি স্ত্রী, তুমি মা, তুমি মেয়ে, এটা তোমার প্রথম পরিচয়।

কিছুদিন আগে আমরা আরেক বন্ধু পরিবারের সাথে ঘুরতে গেছি। সে শখ করে দুইটা ডিম ভাজি আর কয়েক কাপ কফি বানিয়েছে (সে রান্না করে শখে, পছন্দ করে)।

কয়েকদিন পরে সেই বন্ধুপত্নী ভরা মজলিসে গল্প করছে “তামান্নার আর কি? ওর বাসায় সব কাজ তো ওর বরই করে।” এই হলো আমাদের অবস্থা। পেশাগত জীবনে আমরা যতোই সফল হই না কেন, সংসারে প্রাপ্য দাবীটুকু বুঝে পেলে ভাবি জীবন সার্থক।  

এ যেন আমার অধিকার নয়, অন্যের দান।  

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.