মাক্সিম গোর্কির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

Mother 1ফারহানা রহমান: দুনিয়াতে প্রকৃত সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে যিনি রুশ সাহিত্য পড়েননি বা এ সম্পর্কে অবগত নন।

আর বাঙ্গালীরা তো নিজের ভাষার সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করার সাথে সাথেই রুশ সাহিত্যের সাথে পরিচিত হয়। রুশসাহিত্যের এমনই এক অবিস্মরণীয় নাম ম্যাক্সিম গোর্কি। যার সাহিত্যকর্ম আজও বিশ্বের সাহিত্যাকাশে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের মতোই দীপ্তিময়।

তাঁর কালজয়ী ‘মা’ উপন্যাসের কথা কার না জানা! এটি বিশ্বজুড়েই সমাদৃত।পেলাগিয়া নিলোভনা নামের একজন অতিসাধারণ ‘নারী’ কি করে সময়ের প্রয়োজনে আস্তে আস্তে রূপান্তরিত হন একজন রাজনীতি সচেতন‘ব্যক্তি’তে।বুঝতে শেখেন সারাজীবন কী করুণ জীবন কাটিয়েছেন এবংশ্রেণীগত নির্যাতন ও লিঙ্গগত অবস্থানের অসহায় শিকার হয়েছেন, তারইচমৎকার বর্ণনা করেছেন গোর্কি তার দুর্দান্ত ভাষারীতিতে লেখা এই“মা”উপন্যাসটিতে। ম্যাক্সিম গোর্কি তার সাহিত্যক ছদ্মনাম হেসেবে বেছেনেন ‘গোর্কি’ অর্থাৎ’তেতো’নামকে। তার আসল নাম অ্যালেক্সেই মাক্সিমোভিচ পেশকভ। ১৮৬৮ সালের ২৮মার্চ রাশিয়ার নিস্ঝনি নভগোরাদে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান, কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার বাবা। এসময় তাঁর মা আরেকটা বিয়ে করে তাঁকে নানার বাড়িতে রেখে চলে যান। আট বছর বয়সেই নানার রংয়ের কারখানায় তাঁকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।নানী ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, সেখান থেকেই তাঁর পড়ালেখায় হাতেখড়ি। তবে ১২বছর বয়স হতে না হতেই তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। নানীর মৃত্যুর পর গোর্কি অত্যন্ত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। ১৬ বছর বয়সে গোর্কি জীবনের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন এবং এরপর একনাগাড়ে পাঁচ বছর ধরে হেঁটে সমগ্র রাশিয়া সাম্রাজ্য চষে বেড়ান।

এ সময় বিভিন্ন চাকরির অভিজ্ঞতা ও নানা ঘটনার স্মৃতি তার পরবর্তী সময়ের লেখালেখিতে প্রভাব ফেলে। ভবঘুরে গোর্কিকে জোর করে পড়ায় আগ্রহী করে তোলেন সমুদ্র অভিযাত্রী ক্যাপ্টেন মাইকেল স্যামুইর। কিন্তু পড়ার জন্যও তো অর্থের প্রয়োজন হয় যা তার কখনও ছিল না। তাই হতাশ গোর্কি নানা কাজ করে একসময় সাংবাদিকতায় ঢুকলেন এবং একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন লেখক হবেন এবং সমাজে একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। তার এই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি “আমার ছেলেবেলা” ও “পৃথিবীর পাঠশালায়” বইগুলো লিখেছিলেন।

তাঁর প্রথম বই ‘অ্যাসেজ অ্যান্ড স্টোরিজ’ ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় উপন্যাস ‘ফোমা গর্দেয়েভ’, নাটক ‘চিলড্রেনঅব সান’, ‘দ্যলোয়ার ডেপথ’ ইত্যাদি গ্রন্থ। ১৯০২ সালে গোর্কি সম্মানসূচক  ‘একাডেমিশিয়ান অব লিটারেচার’ নির্বাচিত হলে দ্বিতীয় জার তা  বাতিল করেন। এর প্রতিবাদে আন্তন চেখফ ও ভ্লাদিমির করলেনকোর মতো বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক ও গল্পকার ওই একাডেমি ত্যাগ করেন। তিনি লিও তলস্তয় ও আন্তন চেখফের অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন ফলে পরবর্তীতে তার জীবনী লেখার সময় এই দুজন মহান সাহিত্যিককে তিনি আন্তরিকভাবে স্মরণ করেছিলেন।

Maxim Gorkyমাক্সিম গোর্কি ছিলেন একজন কট্টর মার্ক্সিস্ট। বলশেভিকদের সাথে মাক্সিম গোর্কির মিত্রতা বা বন্ধুত্ব থাকলেও,তাঁর লেখায় বলশেভিকদের কথার প্রতিফলন থাকলেও তিনি কখনই পার্টিতে যোগ দেননি। ১৯০৫ সালে রুশ বিপ্লবের সময় তাঁর ভূমিকার কারণে তাঁকে কারাবন্দী করা হয়। ১৯০৬ সালে তিনি রাশিয়া ত্যাগ করেন। ইতালির কাপ্রি দ্বীপে চলে যাওয়ার আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে আসেন। প্রায় সাত বছর তিনি ছিলেন ওই কাপ্রিতে। এরপর ১৯১৩ সালে তিনি রাশিয়ায় ফেরত আসেন।

১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন এবং বলশেভিকদের অধীনে তিনি রাশিয়াতেই ছিলেন। কিন্তু ক্রমেই গোর্কি পরিচিত হতে থাকেন তিক্ততার সাথে। তাকে অগণতান্ত্রিক বলে আখ্যা দেয়া হয়। নিউ লাইফ নামের একটি পত্রিকায় তিনি লেনিনের অধীনস্ত রাশিয়ায় যে সহিংসতা এবং নির্যাতন চলছিল, তা নিয়ে নিয়মিত লিখতেন। ১৯১৮ সালে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হলে আপনাআপনিই কণ্ঠরোধ হয়ে যায় গোর্কির। বলশেভিকদের সমালোচনা করায় তাঁকে ১৯২১ সালে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।

পরের কয়েক বছর তিনি ইউরোপের এখানে-সেখানে ঘুরে ইতালির সরেন্তোতে নির্বাসন জীবন শুরু করেন ১৯২৪ সাল থেকে। কিন্তু লেখা তাঁর অব্যাহত ছিল। নতুন গল্প-উপন্যাস প্রকাশিত হতে থাকে একের পর এক। ১৯২৮ সালে তাঁর ৬০তম জন্মবার্ষিকী পালন করা হয় বেশ ঘটা করে, ফিরে আসেন রাশিয়ায়।

লেনিনের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসীন জোসেফ স্তালিন গোর্কিকে স্থায়ীভাবে রাশিয়ায় ফেরত আনার সিদ্ধান্ত নেন। বিশেষ করে তাঁর তৎপরতাকেনিজের আয়ত্ত্বের ভেতরে আনাই ছিল স্তালিনের মূল উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে তিনি ক্যাম্পেইন চালুসহ বেশকিছু উদ্যোগ নিয়ে সফলকামও হন। ১৯৩৩ সালে গোর্কি ফেরত আসেন সোভিয়েত ইউনিয়নে। কিন্তু আসার পরই তার ফেরত যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়, বিদেশে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে স্তালিন সরকার। তিনি বাধ্য হন স্তালিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখালেখি করতে। তবে স্তালিনের সময়কার গণহত্যা তিনি লিখতে পারেননি, যা একেবারেই বিপরীত ছিল তাঁর চরিত্রের। ১৯১৭ সালের লেখক গোর্কি আর ১৯৩৩ সালের গোর্কির মধ্যে ফারাকটাও তাই চোখে পড়ে। তিনি কেবলই স্তালিনের কথার প্রতিধ্বনি করে গেছেন মাত্র।

তবে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে সোশ্যাল রিয়ালিজম নামে যে সাহিত্যধারার সূচনা হয়, গোর্কি ছিলেন তার কর্ণধার। রাশিয়ার সমাজের নিম্নতম স্তরের মানুষগুলোর জীবনের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন গোর্কি তাঁর সাহিত্যে। রাশিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বাঁকগুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন তিনি তার লেখনীতে। জারের শাসনামলে বেশ কয়েকবার কারান্তরীণ হয়েছিলেন তিনি। শ্রমিকদের সঙ্গে গোর্কির ছিল ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক।

১৯০২ সাল থেকে গোর্কি ছিলেন লেনিনের ঘনিষ্ঠতমদের একজন। ১৯০০ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত গোর্কির লেখায় আশাবাদের ব্যঞ্জনা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ১৯০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘মা”। মাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাস মূল ভাবনা ছিল একজন ক্ষুদ্র মানুষ যে তারকল্পনার চেয়েও ক্ষুদ্র, নিজেকে ভালবাসে এবং স্বপ্ন দেখি বড় হবার, প্রতিষ্ঠিত হবার, ভাল কিছু করার। এই উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই কিভাবে লেনিনের সেই বিখ্যাত লাল মলাটের বই পড়ে সবার মাঝে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। লেনিনের চেতনা নিয়েই চা বাগানের শ্রমিকেরা রাশিয়াতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন এটি মূলত সেই সময়কার বাস্তবতায় একটি সম্পূর্ণ বাস্তব কাহিনী।

উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখতে পাই গল্পের প্রধান চরিত্র কিশোর পাভেলের মা পেলেগিয়া সারাদিন কারখানায় অমানষিক পরিশ্রম করে বাসায় ফেরেন এবং প্রতি রাতে তার স্বামীর হাতে মার খান। এভাবেই কুড়ি বছর ধরে চলে আসছিলো যতদিন না পাভেলের বাবা মিখাইল ভ্লাসভের মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর কিশোর পাভেল কারখানায় যোগ দেয়। সেখানে সে শেখে কি করে সর্বহারা জনগণ সমষ্টিগতভাবে শক্তিধর হতে পারে। এখানে সে বুঝতে পারে যে শ্রমিকগণ সমাজ পরিবর্তনের মুখ্য উপাদান। ফলে সে তার বাড়িতে কমরেডদের নিয়ে নানা গবেষণার কাজ ও বই-পড়ার সেশন চালিয়ে যায়।

এ সকল কাজে সবসময় তার মা তাঁকে নানাভেবে সাহায্য করতে থাকে। এখানে মূলত আমরা শ্রমিক শ্রেণীতে নারীর ক্ষমতায়ন দেখতে পাই। ‘মা’ উপন্যাস ছাড়াও গোর্কি তার নাতাশা, সাশা, লুডমিলা এবং সোফিয়ার মতো অন্যান্য উপন্যাসেও অনেক সাহসী নারী চরিত্রের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন ।

জীবনের শেষের দিকে বহুবছর তিনি যক্ষ্মারোগে ভুগেছিলেন। ১৯৩৪ সালের মে মাসে ছেলে পেশকভের আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি অত্যন্ত আঘাত পান ফলে ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্তালিন এবং মলতোভ তার শেষকৃত্যের সময় গোর্কির শবাধার বহন করেছিলেন। তবে কেউ কেউ মনে করেন এন কে ভি ডির এজেন্ট তাঁকে হত্যা করেছিল।

১৮ জুন এই মহান শিল্পীর ৭৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। এইদিনে সমস্ত সাহিত্য অনুরাগীদের পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.