এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে

10348787_873336302681969_6912763683049726839_o
লীনা হাসিনা হক

লীনা হাসিনা হক: গত বেশ কিছুদিন ধরে তেমন কিছু লিখতে পারিনি। সময় হচ্ছে না, কত কিছু জমে আছে মনের মধ্যে, মনের কথা মনেই থেকে যাচ্ছে, কারো সাথে শেয়ার করা হচ্ছে না। অফিসে কাজের চাপ, ব্যক্তিজীবনে নানা কিছুর টানাপোড়েন সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা অস্থির সময়। সব অস্থিরতা কি আর কথায় প্রকাশ পায়, না বলা যায় মানুষকে!

বন্ধু-বান্ধবরা রাগ করে, অভিমান করে, অনেকদিন কথা না বলে শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে আবার কথা বলছে। মা, বোন সবাই তিক্ত-বিরক্ত আমার এই হুরুম দুড়ুম ব্যস্ততার জন্য যা তাদের বুঝার বাইরে। নিজেও বুঝি না আসলে কি করতে সময় যায় আমার! কোন বই পড়ছি না অনেকদিন, লিখছি না, এক ফাঁকে একটু ঘুরে এসেছি কালেঙ্গার বাদল বন থেকে- সেটুকুই এখনো মনে অক্সিজেনের প্রবাহ বইয়ে রেখেছে। এর মাঝে শুধু ফেসবুকে উঁকি ঝুঁকি। মাঝখানে ফেসবুক হ্যাকড হওয়াতে বেশ কিছুদিন হাইবারনেশনে গিয়েছিলাম। আবার ফিরেছি।

ইদানিং আবার উইমেন চ্যাপ্টারে লেখালেখি করার কল্যাণে ইনবক্স আর ফোনে বার কয়েক হুমকি-ধামকি আসাতে পরিবার বন্ধুরা সবাই বললো, ফেসবুক ডিয়ক্টিভেট করে দিতে। এই দেই-দিচ্ছি করেও আর হচ্ছে না। আসলে ফেসবুকটা আমার একটু নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা। আমি কখনো কোনও সিরিয়াস বিষয়, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি এসব নিয়ে ফেসবুকে কপচাই না। ফেসবুক আমার ফান প্লেস। জীবনের হাসি আনন্দ শেয়ার করার জায়গা। আমি এই বিষয়ে অত্যন্ত নাদান এবং অবুদ্ধিজীবীমূলক আচরণ করি। এটাই আমার আনন্দ।

ফেসবুক শুরুর দিকে আমার তরফে থাম রুল ছিল, ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করার আগে দেখে নেবো- মানুষটিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি কিনা। ক্রমে সেটা থেকে সরে এসে দাঁড়ালো যদি ব্যক্তি পরিচয় নাও থাকে, কমের পক্ষে সাত থেকে দশ জন কমন ফ্রেন্ড থাকতে হবে। লেখালেখির সূত্র ধরে সেই নিয়মটিতেও সবসময় স্টিক করা যায় না। প্রফেশনাল কারণ, লেখালেখির সূত্র ধরে অনেকজন আমার লিস্টে চলে এসেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে সমৃদ্ধ করেছেন জানায়, জ্ঞানে, জীবনবোধের ব্যাপ্তি বিস্তারে, লেখার অনুপ্রেরণা হিসাবে, সুলিখিত লেখা পড়তে পারার সুযোগ দিয়ে। আবার কাউকে কাউকে কিছু সময় পরে আলগোছে ঝেড়ে ফেলতে হয়েছে।

এইসব বন্ধুর মধ্যে নারী-পুরুষ তরুণ-তরুণী, পরিণতজন সবাই আছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কবি, কেউ গল্প লেখেন, শৌখিন ফটোগ্রাফার কিন্তু পারদর্শিতায় প্রফেশনাল, ভ্রমণপিয়াসী পর্যটক, রাজনীতি, সমাজনীতি নিয়ে কথা বলার মানুষ আছেন, জীবনদর্শী শিক্ষক, দেশ প্রেমিক আমলা আছেন, আছেন তরুণ কবি, ফিল্ম মেকার, গৃহবধূ, কণ্ঠশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, দেশী-বিদেশী। আর নিজের সেক্টরের সহকর্মীরা তো আছেনই। আর আমার পরিবার!

কবিতার প্রতি আমার আগ্রহ বা বলা চলে ভালোবাসা সারাজীবন। নিজে এক চরণও লিখতে পারি নাই। যারা কবিতা লিখেন তাঁদের প্রতি কেমন এক ধরনের টান অনুভব করি। ফ্রেন্ডলিস্টে কবি আছেন বেশ কজন। সম্প্রতি একজন ফেসবুকীয় বন্ধুর একটি কবিতা পড়ে এতো চমৎকৃত হয়ে গিয়েছি যে ফেসবুকে মন্তব্য করেও যথেষ্ট মনে হলো না। তৎক্ষণাৎ যোগাযোগের ইচ্ছে হলো আমার অনুভূতি ব্যক্ত করার জন্য। সেই ইচ্ছেই কাল হলো!

অতি সাধারণ ভালো লাগার একটি মেসেজ উনার স্ত্রী পড়লেন (এটাও বোধগম্য হয় না কিভাবে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের মেসেজ পড়তে পারে- আমার কাছে তা অন্যের কাপড় খুলে উঁকি দেয়ার মতন অভব্যতা- যে কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য)! এবং ভদ্রলোকের হেনস্থা এবং সেই সাথে আমার ফেসবুকের ইনবক্সে সভ্যতা-ভব্যতার সকল সীমা লংঘন করে স্ত্রীটির মেসেজ আক্রমণ! হতবাক আমি!

মনে পড়লো, আমাদের একজন সহকর্মী ছিলেন, নাদেরা আপা, উনি ঠাট্টা করে বলতেন, পৃথিবীর তাবৎ পুরুষ মানুষরা দুই ভাগে বিভক্ত- জীবিত এবং বিবাহিত। নারী পুরুষের সম্পর্কের মূল ভিত্তি – আস্থা আর ব্যক্তি মানুষ হিসেবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা বোধ। স্বামী-স্ত্রী দুজনের প্রতি দুজনেরই যদি এই দুটো অনুভব না থাকে সেই সম্পর্কের পরিণতি হয় বিচ্ছিন্নতা – পুরোপুরি অথবা একসাথে একাকী।

ইংরেজীতে একটা কথা আছে ‘ own individual space’ – আমার কাছে মনে হয় জাতি হিসেবে আমরা ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য’ কথাটিতেই বিশ্বাসী নই, আর সেই কারণেই এই হারাই হারাই মনোভাব এবং একজন নারী এবং পুরুষের সাথে স্বাভাবিক সুন্দর বন্ধুত্ব হতে পারে সেটা কোনভাবেই বিশ্বাস করতে না পারার কারণেই এই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব। আর একলা থাকা কোন নারী বা পুরুষের সাথে বন্ধুত্ব, সেখানে নোংরামো ছাড়া আর কীইবা থাকতে পারে!!!

অবশ্য আরও একটা কথা আমার এক বন্ধু বলে, মানুষ নিজের মনের আয়নায় অন্যকে দেখে !!!! কবে যে আমরা ভাবতে পারবো স্ত্রীটি বা স্বামীটি আমার স্থাবর সম্পত্তি নয়। বরং ভালোবাসা, বিশ্বাস আর আস্থার মিলনে এই সম্পর্কটি হয়ে উঠতে পারে পরস্পরের জীবনের সম্পদ!হায়, এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে…

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.