শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ছাত্রী তৈরি করা না পাত্রী তৈরি করা!

Parlourউম্মে রায়হানা মুমু: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বেশ কিছুদিন শামসুন্নাহার হলে ছিলাম। হলে ওঠার পর পরই জ্বরে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি উঠেছিলাম দোতলার গণরুম ২৪১ এ। রুমমেটরা অনেক সেবা করেছিলো, মনে আছে। জ্বর সারলে পরে রুমমেটদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্যান্টিনে গেলাম। কোন খাবারই খেতে ইচ্ছে করছিলো না। দেখলাম টক দই পাওয়া যায়। দেখেই বাসার কথা মনে পড়ে গেলো।

কলেজে দুপুর পর্যন্ত ক্লাস হতো আর দুপুরের পর থেকে ল্যাব। আম্মা দই আর পুডিং বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিতেন। এক বাটি দই আর একটা ডিম পোচ খেয়ে টিফিন বক্সে পুডিং বা কেক জাতীয় কিছু নিয়ে সারাদিনের নামে বের হতাম। তখন থেকেই জানি, টক দইয়ে অনেক ক্যালোরি। শরীর ঠাণ্ডা রাখে। সকালে এক বাটি দই খেয়ে নিলে দুপুর পর্যন্ত খিদে পায় না।

একটা দই নিলাম। কোন খুরি বা বাটিতে না, দই পাওয়া যায় পলিথিনের ছোট ছোট পোটলায়। একটা চামচ চেয়ে নিয়ে খেয়ে দেখলাম যার পর নাই খারাপ খেতে। তখন আমার এক রুমমেট জানালো, এই দই খাওয়ার জন্য না। এটা আসলে বিক্রি হয় মেয়েদের চুলে মাখার জন্যে।

সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিউটি পার্লার থাকার ঘোষণা নিয়ে আলোচনা দেখতে পাচ্ছি। এই আলোচনা থেকেই গল্পটা মনে পড়লো।

অনেকেরই মনে প্রশ্ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিউটি পার্লার থাকলে সমস্যা কোথায়?

না, কোন সমস্যা নেই। সৌন্দর্য চর্চা মানুষের মজ্জাগত বিষয়। আদিম কাল থেকে নারী পুরুষ নির্বিশেষে নানা রকম গহনা ও সাজগোজের জিনিস ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।

বলা হচ্ছে, বিউটি পার্লার থাকলে মেয়েদের সৌন্দর্য চর্চার জন্যে বাইরে যেতে হবে না।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটা এক রকম সুবিধাই। কিন্তু সাবধানে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই যে বাইরে যাওয়া- এটা বন্ধ করার জন্য এত তৎপরতা কিসের জন্য? মেয়েরা শুধুমাত্র সৌন্দর্য চর্চার জন্যই বাইরে যায় বা বাইরে যাওয়ার একটা অন্যতম প্রধান কারণ সৌন্দর্য চর্চা- এমনটা ধরে নেওয়ারই বা কারণ কী?

অনেকের দাবি, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিউটি পার্লার আছে। ভাইরে, উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য সুইমিং পুলও আছে, জিমও আছে। আমাদের কি তেমনটা আছে?

কয়টা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত এবং পাবলিক পরিসরে নারীর ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার আছে?

সত্য বটে, এখনও এ দেশের প্রচুর মেয়েকে বাবা-মা পড়তে পাঠান যতটা শিক্ষিত হবার জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো পাত্র জোটার জন্য। বিয়ের বাজারে শিক্ষিত মেয়ের কদর আছে। শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করেও চাকরি করবে, তার রোজগারে সংসারের সুসার হবে। স্বামী ব্যক্তিটির ওপর চাপ কমবে।

তবে সে জন্য শুধু ছাত্রী হিসেবে ভালো হওয়াই যথেষ্ট নয়, দেখতে শুনতেও ভালো হতে হবে। তার জন্য বিউটি পার্লার অত্যন্ত দরকারি তো বটেই।

একইসঙ্গে মেয়েদের বাইরে বের হওয়া বন্ধ করা নানা কারণেই প্রয়োজন। মোবিলিটি নারীর সমতা অর্জনের জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত। চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত করতে পারলে তাকে পেছনে ফেলে রাখা সহজ। নিরাপত্তার নামে চলাফেরা বন্ধ করতে চাওয়া এই শিশ্নসর্বস্ব রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কুযুক্তি।

মেয়েরা সৌন্দর্য চর্চার জন্যই বাইরে যায়, সুন্দর করে সেজেগুজে পুরুষের মাথা ঘোরায় ও ধর্ষণের শিকার হয়- এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে ধর্ষণের সংস্কৃতিকে জিইয়ে রাখা যায়, বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে মদদ দেওয়া যায়।

নারীর রূপচর্চার ওপর দায় চাপিয়ে নিপীড়ক পুরুষকে অদৃশ্য করে দেওয়া যায়।

ভালো ছাত্রী ও ভালো পাত্রী তৈরি করার জন্য এর থেকে আদর্শ ব্যবস্থা আর কী হতে পারে?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.