নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে গণমাধ্যমকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে

Media Editorsউইমেন চ্যাপ্টার: জেন্ডার ইস্যু শুধুই নারীর ইস্যু নয়। এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এমনকি রাষ্ট্রীয় ইস্যু। আর নারী নির্যাতন ও জেন্ডার বৈষম্য বন্ধ করতে হলে নারীদের এখনই আওয়াজ তুলতে হবে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মিলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে হবে। গণমাধ্যম এখন জেন্ডার ইস্যুতে অনেক সচেতন। তা সত্ত্বেও যৌন হয়রানিসহ নারীর প্রতি সব ধরণের সহিংসতা প্রতিরোধে আরো দায়িত্বশীল ও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর ডেইলি স্টার মিলনায়তনে ‘যৌন হয়রানি, জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

         ইউএসএআইডি’র সহায়তায় প্রটেক্টিং হিউম্যান রাইটস্ (পিএইচআর) প্রোগ্রাম, প্লান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, জাতীয় মহিলা আইনজীবি সমিতি (বিএনডব্লিউএলএ) এবং উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশের (ডব্লিউজেএনবি) যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত সময়োপযোগী এই গোলটেবিল বৈঠকে  নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানির মতো জটিল ইস্যু নিয়ে কথা বলেন গণমাধ্যম সম্পাদক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ।

         সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি আইলিন ও’কনোর বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা কমিয়ে ‍আনতে হলে পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। তিনি পুরুষদের প্রতি ইস্যুটি অনুধাবনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মনে রাখতে হবে, নারীর প্রতি সহিংসতা সমাজ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অগ্রগতি পিছিয়ে দেয়। গণমাধ্যমের ভূমিকার কারণেই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নিজের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাইরের পুরুষ দ্বারাই নয়, নারীরা সহকর্মী পুরুষ দ্বারাও নিপীড়নের শিকার হন।

         বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাট বলেন, যৌন হয়রানি ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা পৃথিবীর সব দেশেরই সমস্যা।  এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এর ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষাঙ্গন, কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাট এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সব ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা।  নারীর প্রতি সব ধরণের সহিংসতা থেকে মুক্তি পেতে হলে নারীদেরকেই কথা বলতে হবে, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে হবে।

         রাস্তায় হয়রানি খোদ যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বার্নিকাট বলেন, বার্নিকাট বলেন, ২০১৫ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ৯৬ শতাংশ নারী রাস্তায় যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অপর একটি জরিপে দেখা গেছে, যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পর ১০ বছর বয়সের ৮৬ শতাংশ কন্যাশিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয় ।

         মূল প্রবন্ধে ডেইলী স্টার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন আমাদের অর্জনকে ম্লান করে দেয়। আমাদের সভ্যতাকে আঘাত করে। নারীকে আর্থ-সামাজিকভাবে দমিয়ে রাখার একটি কৌশল। নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও নারীর সত্যিকারের উন্নয়ন হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

         দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত ও বৈষম্যের মধ্যে রেখে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয় এমন মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, নারীর ইস্যু শুধু নারী সমাজের ইস্যু নয়। এটি সবার ইস্যু। বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি, নারীর প্রতি সহিংসতা ও জেন্ডারবৈষম্যের সমাধান করে নারীসমাজকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় না, বরং গোটা দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। তাই জেন্ডার ইস্যুকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে হবে। সরকারের কর্ম-পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে।  তাহলেই দেশ দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।

         অপর মূলপ্রবন্ধে বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক জনাব মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জেন্ডার নীতি থাকার উপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, নারী এক্টিভিস্টদের ভূমিকার কারণেই জেন্ডার ইস্যুতে গণমাধ্যমের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। নারী সমাজের আন্দোলনের ফসল হিসেবে আজ গণমাধ্যমে ভিকটিমের নাম ও ছবি প্রকাশ করার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।  শুধু নারী-পুরুষকে সচেতন করাই নয়, যৌন নিপীড়কদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এই ভয়ংকর সমস্যা রুখতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

         জেন্ডার ইস্যু সমাধানে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি কম একটি বড় বাধাঁ হিসেবে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতিআরা নাসরীন বলেন, জেন্ডার ইস্যুকে সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এখনও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। সহিংসতা ঘটেছে এই তথ্য মানুষকে জানানোই যথেষ্ট না। কেন ঘটেছে, প্রতিরোধের উপায় ও শাস্তি নিশ্চিতসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও ফলো আপ হয় না। গণমাধ্যমকে এ ব্যাপারেও দায়িত্বশীল হতে হবে।  

         বেসরকারি সংস্থা নিজেরা করি’র সমন্বয়কারি খুশী কবির জেন্ডার ইস্যুতে মানসিকতা পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, প্রতিটি মানুষকেই জীবনের শুরু থেকে নারী-পুরুষ হিসেবে নয়, সকলকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা শেখাতে হবে।

         এছাড়া বৈঠকে আরো বক্তব্য রাখেন প্লান ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর সিনাইট গেব্রেগজিয়াভের, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে মাল্টিসেক্টর প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন, মানবাধিকারকর্মী ড. হামিদা হোসন, নয়াদিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক সাংবাদিক মহিউদ্দিন আলমগীর, দেশ টিভির সিইও সুকান্ত গুপ্ত অলক, এনএইচএসডিপি’র চীফ অফ পার্টি  ডা. হালিদা এইচ আক্তার, দৈনিক ইত্তেফাকের শিফট-ইন-চার্জ ফরিদা ইয়াসমিন, ভোরের কাগজের কূটনৈতিক প্রতিবেদক ও ডব্লিউজেএনবি’র সমন্বয়ক আঙ্গুর নাহার মন্টি, পিএইচআর প্রোগ্রামে কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট শেহজীন চৌধুরী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব মীর, একাত্তর টিভি ক্রাইম রিপোর্টার নাদিয়া শারমীন, ইউএন উইমেনের মাহতাবুল হাকিম, বিএনডব্লিউএলএ’র মিতালি জাহান প্রমুখ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আমেরিকান সেন্টারের পরিচালক অ্যান ব্যারোস ম্যাককনেল, প্রেস উইংয়ের প্রধান মেরিনা ইয়াসমিন, প্রেস ও তথ্য কর্মকর্তা মনিকা সাই প্রমুখ।  

যৌন হয়রানি ও জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার বিষয়ে গণমাধ্যমের সমালোচনা করে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা বলেন, প্রতিবেদন তৈরির সময় আমরা জিডিপি, অর্থনীতি বা যেকোনো ক্ষেত্রেই নারীকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করি না। একইভাবে নারী নির্যাতনের সব চিত্রও গণমাধ্যমে উঠে আসে না। নারীদের বঞ্চিত করা বা হয়রানি করা কোনো বৈষম্য নয়, এটা এক ধরনের বর্বরতা।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.