‘নারী হওয়া সত্ত্বেও’ জুতা মেরে গরু দানে মোদী কি একা?

MOdi Hasinaশারমিন শামস্: টুইটারে পোস্ট দিয়ে বিপদে পড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে যা লিখেছেন, আশা ছিল এতে সবাইকে খুশী করতে পারবেন। তো কিছু মানুষের কানে লেগেছে তার ভাষাটা। তারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার অনমনীয় আচরণের প্রশংসা করতে গিয়ে ‘ডেসপাইট বিয়িং এ ওম্যান’ অর্থাৎ ‘নারী হওয়া সত্ত্বেও’ শব্দগুলো আগে জুড়ে দিয়েছেন তিনি। এটা তিনি করেছেন মূলত অভ্যাসের বশেই। যুগ যুগ ধরে পুরুষ নারী নির্বিশেষে এভাবেই কথা বলেছেন নারীর ব্যাপারে। এবং এখনও বলছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর যোগ্যতা, মেধা, সাহসিকতা বারবার প্রমাণ হওয়ার পরও, নারীর প্রশংসা্ আসে ঐ  ক’টি শব্দবন্ধ সাথে করে নিয়েই। সে প্রশংসা যেই করুক না কেন।

ঐ কয়েকটি শব্দবন্ধ শুরুতেই সবাইকে মনে করিয়ে দেবে যে, নারী দুর্বল, নারী অপারগ, নারী কম যোগ্য, নারী কম মেধাসম্পন্ন। এবং এতো এতো কম থাকার পরও কোন এক নির্দিষ্ট নারী কাজটি পারছে, এ এক বিশাল ব্যাপার।
তো নারীর প্রতি এই রকম ধারণা শুধু পুরুষেরই, তা নয়। নারীরও। তারাও নিজেদের দুর্বল, পুরুষের থেকে কম যোগ্যতাসম্পন্ন ও কম মেধাবী, কম সাহসী ভাবতেই অভ্যস্ত।

এদেশের, এই উপমহাদেশের নারী পুরুষ এখনও কোনটি নারীর কাজ, কোনটি পুরুষের কাজ, তা মনের মধ্যে সাইবোর্ডে লিখে লোহার পেরেক দিয়ে টাইট করে আটকে দিয়েছেন।

Moonmoon
শারমিন শামস্

‘মেয়েটা মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও গাড়ী চালায় ভালো, মেয়েটা মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও অনেক সাহসী, চোর ধরেছে, মেয়েটা মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও পুলিশে গিয়েছে এবং ভালো করছে, মেয়েটা মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও অনেক ভালো ডাক্তার, অপারেশনের হাত খুব ভালো, মেয়েটা মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও রাতের বেলা একাই বের হয়ে দরকারি ওষুধ কিনে এনেছে, মেয়েটা মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, মেয়েটা মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও সবগুলো লোকের সাথে তর্ক করেছে, মেয়েটা মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও কঠিন কঠিন অ্যাসাইনমেন্ট করেছে, মেয়েটা মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও একাই বিদেশ ভ্রমণ করেছে…’ আর কত বলবো।  

মেয়ে যা কিছু করেছে, তা বলার আগে শুরুতেই বলে নেয়া যে, সে মেয়ে, তার যোগ্যতা কম, তার এটি পারার কথা নয়, তবু সে পেরেছে। এ হচ্ছে ‘জুতা মেরে গরু দান’।
তো ভারতের প্রধানমন্ত্রীও নিশ্চয়ই ছোটকাল থেকে, তরুণকাল থেকে এই প্রবীণকাল পর্যন্ত এ যাবৎ এভাবেই নারীদের প্রশংসা করেছেন।

তাই মাননীয় শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও তার প্রশংসার ধরণ পাল্টে যায়নি। এর আগেও লিখেছিলাম। পুরুষ নারীদের পাশে বসে কাজ করে, আড্ডা দেয়, চলে ফেরে। কিন্তু মনের ভিতরে, সে যে পুরুষ এই অহংকার তার  ঘোচে না। সে শ্রেষ্ঠ, কারণ সে পুরুষ, এই বোধটি থেকেই এখন পর্যন্ত এ উপমহাদেশের পুরুষরা বের হয়ে আসতে পারেনি।  

সাংবাদিক ফারজানা রূপার রিপোর্ট দেখে একদিন আমাকে একজন বললেন, ‘মেয়ে হয়েও রূপা কত সাহসী’। মুন্নী সাহাকে নিয়ে কথা প্রসঙ্গে একজন বললেন, ’ওর মধ্যে মেয়েসুলভ কিছু নাই।’ আমি বললাম, তিনি সাংবাদিক। সাংবাদিকসুলভ বিষয়টা আছে তো?

‘হ্যাঁ তা আছে। কিন্তু মেয়েসুলভ না।

অর্থাৎ সাংবাদিক তিনি কতটা হতে পারলেন, কতটা সাহসী হলেন, তার চেয়ে বড় কথা, তিনি মেয়ে হতে পারলেন কিনা। তো এইসব আলোচনা-সমালোচনায় এদেশের নারীরাও পিছিয়ে নেই।  তারাও অহরহ অন্য মেয়েকে দেখিয়ে বলছে, মেয়ে হলেও মেয়েটা মেধাবী। মেয়েটা অমুক, মেয়েটা তমুক। তো পুরুষের ক্ষেত্রেও ‘পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও’ – এ শব্দগুলো কখনও কখনও ব্যবহৃত হয়। যেমন ‘ছেলে হলেও ও বাসার কাজ করে, ছেলে হলেও রান্না করে, ছেলে হলেও চরিত্রবান।’

তো আসি মোদী প্রসঙ্গে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এদেশে সফরে এসেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, অনেক জটিল, কঠিন গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আলোচনা হয়েছে তাদের মধ্যে। কীরকম বজ্র কঠিন হাতে শেখ হাসিনা দেশ চালাচ্ছেন তা নিজ চোখে দেখে গেছেন। তারপর গিয়ে ঐ টুইট করেছেন। এখন মোদী যদি জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের সাথেও বৈঠক করতেন, সেক্ষেত্রে, টুইটারে লিখুন বা না লিখুন, মনের টুইটারে ঐ একই কথা ভাবতেন মেরকেল সম্পর্কে- ‘ডেসপাইট বিয়িং এ ওম্যান’।

এই উপমহাদেশের পুরুষরা এখনও নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবতে প্রস্তত নয়। নারীকে এখনও তারা কাদার মত তুলতুলে, গদগদে বস্তপিণ্ডই মনে করে। যে কাদামাটি তারা নিজেদের ইচ্ছেমত আকৃতিতে গড়ে নেবেন। এর বাইরে নারী যদি নিজস্ব আকার ধারণ করেন, তাহলে বড় বেকায়দায় পড়ে যান মোদী ভাইয়ারা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.