সে আমার বড় বোন

Crocodile tearsরওশন আরা বেগম: আফ্রিকার নাইজেরিয়ার এক হাসপাতালে ৪৬ বছরের এক বড় বোন মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনছে। বাবা-মা-ভাই-বোন কেউ তার এই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছে না। এই মৃত্যুকে সহ্য করা অনেক কঠিন, কারণ এই মৃত্যু এসেছে অনেকগুলো জীবনকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে। বাবা-মা-ভাইবোন সবাই নিজেদের এই মৃত্যুর পিছনে দায়ী মনে করছে।

কেনই বা করবে না। তাদের জন্যই তো বোনের এই করুণ মৃত্যু এসেছে। তার ছোট বোন কেচি এই কানাডায় আছে ৭-৮ বছর হলো। এই দূরে থেকেও কিছু সময়ের জন্য জীবিত রাখতে চায়। কেন তারা সবাই এই বড় বোনকে এতো ভালবাসে? এর পিছনে এক করুণ ইতিহাস রয়েছে যা সবাইকে কাঁদাচ্ছে।

কোন কোন মানুষের জীবন এত কষ্টকর তাদের জন্মটাই যেন এক পাপ। কেচি সে রকম এক পরিবার থেকে উঠে আসা এক মেয়ে। সে তার জীবনের গল্প আমাকে শুনালো।

এটি কোন গল্প না দরিদ্র জীবনের এক কঠোর বাস্তবতা। তার বাবা নাইজেরিয়ার এক ব্যাংকে চাকরি করতেন। হঠাৎ তার চাকরি চলে যায়। নয় ভাইবোনের বড় সংসারে দুর্যোগ নেমে আসে। এতোগুলো মানুষের মুখে অন্ন জোগাড়ের কোন ব্যবস্থা নেই।

এই দুঃশ্চিন্তায় তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে। বড় বোনটি নেমে পড়ে কাজে। কষ্ট করে সে একটা চাকরি গোছায়। সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যায় বেশ কয়েক বছর। কাজ শেষে ছোট ছোট ভাইবোনের খাবার নিয়ে ঘরে ফিরতো। এইভাবেই চলছিল কোন রকমে। কেচি কোন রকমে হাইস্কুল পর্যন্ত পড়াশোনা করেই বোনের পাশাপাশি কাজে নেমে পড়ে।

মাথায় করে রুটি বিক্রি করে যা লাভ হতো তা সংসারের হাতে তুলে দিতো। ভাইবোনদের লেখাপড়ার খরচ আর বেঁচে থাকার কসরত করতে করতেই দুই বোন ক্লান্ত হয়ে যায়। বড় বোন সিদ্ধান্ত নেয় সে বিয়ে করবে। এদিকে তার বয়সও অনেক হয়েছে। স্বচ্ছল এক পরিবারের ছেলেকে বিয়ে করে দুজনে মিলেই বাবার সংসারের দায়িত্ব পালন করে যায়। এইভাবে ভালই চলছিল জীবন।

হঠাত একদিন তার বোন কেচিকে ডেকে বলে, ‘তোকে পালাতে হবে। এইভাবে তোর জীবন নষ্ট হতে পারে না’। বোন ও তার স্বামী মিলে একটা পরিকল্পনা করে কেচিকে বাসায় ডেকে এনে। নিজের বোন তাকে কাজিন পরিচয় দিয়ে তাদের বন্ধুর পরিচিত এক লোকের সাথে বিয়ে দেয়। লোকটি কানাডার সিটিজেন। কেচি তার বোনের কোন কৌশলই বুঝতে পারেনি। বিয়ের পরে কেচির পরিচয়টি খোলা হয়। আগে পরিচয় জানলে হয়তো এত অভাবী সংসারের মেয়ের বিয়ে  নাও হতে পারে এই ভয় ছিল। বড় বোন কেচিকে বলে, ‘তুই কানাডায় চলে যা। দূর থেকে যা পারিস তাই করিস, নিজের ভাইবোনের কথা মনে রাখিস’। এইভাবেই কেচি আজ কানাডায় এসেছে ৬-৭ বছর হলো।

এদিকে বড় বোনের সংসারে এক দুর্যোগ নেমে আসে। স্বামী তাকে তালাক দিয়ে আবারও বিয়ে করে। তার বোন অসহায় হয়ে পড়ে। বাবার সংসারে না এসে অনেক দূরে বাসা নেয়। দূরে থেকেই ভাইবোনের খরচ চালিয়ে যায়। কেচিও মাঝে মাঝে টাকা পাঠায়। তিন বোনের লেখাপড়া শেষ করায়। কেচি ও তার পরিবার কেউ কোন দিনও জানতে পারেনি তার বোনটি কী করে, কীভাবে বাবার সংসারে টাকা পাঠায়!

সেই রহস্য একদিন উন্মোচিত হয়ে পড়ে। অভাবী বাবার সংসারে টাকার যোগান দিয়ে চলেছে নিজের শরীর বেচে। দূরে থেকে পতিতাবৃত্তি করেই ভাইবোনদের টেনে তুলেছে। তাদেরকে লেখাপড়ার খরচ দিয়েছে। সবই তার এই বড় বোনের কৃতিত্ব।

গত সপ্তাহে কেচি জানতে পারে তার বড় বোনটি খুব অসুস্থ। তার এক বাচ্চাও হয়েছে। সে তার ভাইকে পাঠায় বড় বোনের খবর নেবার জন্য। গিয়ে বোনটিকে মূমূর্ষ দেখতে পায় ভাইটি। যে খরব কোনদিন তার পরিবার জানতে পারেনি, সেই খবর কেচি পেয়ে যায় এই কানাডায় থেকে। আজ সে বাচ্চাসহ ভয়াবহ এইডস রোগে আক্রান্ত। রোগের শেষ পর্যায়ে চলে গেছে সে।

ভাইবোন মিলে তাকে শহরের বড় কোন হাসপাতালে ভর্তি করে। উঠে বসার শক্তিও আজ তার নেই, কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। কোনরকম তার অসাড় দেহটি পড়ে আছে বিছানায়। নিজের জীবন দিয়ে সে বাবার সংসার ধরে রেখেছিল। এর জন্য তাকে পতিতাবৃত্তির মতো পেশাও মেনে নিতে হয়েছিল। কেচির বোনটি নিজের জীবনের বিনিময়ে চেয়েছিল, ভাইবোনের জীবন সুন্দর হোক।

সে এই সমাজকে একটা বড় শিক্ষা দিয়ে গেল। জীবনের সকল পথ যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন এই পথটি ছাড়া আর কোন পথ তো খোলা থাকে না। সে তো এইভাবে মরতে চায়নি। আমরা কি কেউ তাকে অতিক্রম করতে পারবো? সম্ভব নয়। কেচি চিৎকার করে বলছে, আমার বোনটি মারা যাচ্ছে, সে আমাদের বড় আপনজন। যতোদিন তারা জীবিত থাকবে ততোদিনই তাদের চিৎকার করেই বলতে হবে, সমাজের চোখে যে  পতিতা, সেই আমাদের বড় বোন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.