যাদের জন্য প্রযোজ্য-৬: পুরুষের শালীনতা ও নৈতিকতা

Sina
ড. সীনা আক্তার

ড. সীনা আক্তার: তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। সপ্তাহান্তে সময় কাটাতে এক আত্মীয়ার বাসায় গেছি এবং আত্মীয়ার দুই কিশোরী কন্যা বায়না ধরলো তাদের সংসদ ভবনে বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। ঠিক হলো পরের দিন মানে শুক্রবার সকালে নিয়ে যাবো, তাতে সকালের হাঁটাও হবে এবং সংসদ চত্বরটাও দেখা হবে।

যথাসময়ে সংসদ ভবনে হাঁটতে এবং দেখতে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমরা ভবনের পশ্চিমে আসাদ গেটের দিকে গেছি। হঠাৎ আমার সাথের দুই কিশোরীর একজন আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। স্পষ্টতই দেখলাম তার মুখমণ্ডলে ভয়ের চিহ্ন। আমি উৎসুক হয়ে তার দিকে তাকালাম।

আমি: কি হয়েছে?

কিশোরী: আন্টি, ঐ দেখেন একটা লোক কি করে …

আমি সেদিকে দৃষ্টি দিলাম। কি সাংঘাতিক বিশ্রী দৃশ্য! আমি রীতিমত হতচকিত, উদ্বিগ্ন এবং ভীত, কারণ এ ধরনের অভিজ্ঞতা সেটাই প্রথম। আসলে সেটা ছিল জীবনে প্রথম স্বচক্ষে দেখা কোন প্রাপ্তবয়ষ্ক পুরুষের লিঙ্গ। একজন লিকলিকা যুবক তার প্যান্টের জিপার খুলে উত্থিত লিঙ্গ নাড়াচাড়া করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। আমরা দ্রুত উল্টাদিকে হাঁটা শুরু করলাম।
পুরুষ কর্তৃক এমন জঘণ্যতম ঘটনা হয়তো সচরাচর ঘটে না, কিন্তু দৃষ্টি দিয়ে, উক্তি দিয়ে, স্পর্শ করে নারীকে যৌন হয়রানি বা নিপীড়নের ঘটনা প্রতিদিন অহরহই ঘটছে। ঘরে, কর্মস্থলে, জনসমক্ষে সবখানে।

নববর্ষে নারীর উপর যৌন নিপীড়ন তেমনই একটি সাম্প্রতিক ঘটনা। বলাই বাহুল্য, শালীনতা এবং নৈতিক মূল্যবোধহীন পুরুষরাই এই ধরনের নোংরামি ও অপরাধে লিপ্ত থাকে। অন্যদিকে কিছু মতলববাজ পুরুষ জনসমক্ষে, সভা-সমাবেশে শত শত নারী-পুরুষের সামনে নারীর শালীনতা বিষয়ে সবক দেয়। সেই সবকে ইনিয়ে-বিনিয়ে নারী শরীরের এমনভাবে বর্ণনা দিতে থাকে যেন বক্তা মানসচক্ষে সে শরীর দেখছে, স্পর্শ করছে এবং যৌনতা উপভোগ করছে! এছাড়া কিছু ইতর পুরুষ নারীর শরীরের কোনায় কোনায় দৃষ্টি দেয়, কুৎসিত মন্তব্য করে এবং সুযোগ পেলে স্পর্শ করে। প্রায় সব নারীরই কম বেশী এই কুৎসিত অভিজ্ঞতা আছে।   
অথচ এ ব্যাপারে পবিত্র কোরানে পুরুষের দায়িত্বশীলতার কথা বলা হয়েছে যেমন: ”হে নবী! বিশ্বাসী পুরুষদের বলুন তাদের দৃষ্টি সংযত এবং একান্ত বিশেষ অঙ্গসমূহ সামলাইয়া রাখতে।…”

[সূরা আন নূর ২৪:৩০] (Tell the believing men to reduce [some] of their vision and guard their private parts… [Surat An-Nūr 24:30])।
এখানে যা বলা হয়েছে তা খুবই সহজবোধ্য। আমি নিশ্চিত আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলিম পুরুষ কোরানের এই বাণীর বিষয়ে অবগত নয়। কারণ তাদের জানানো হয়নি- পরিবার, স্কুল বা সভা-সমাবেশ কোথাও ছেলে শিশুকে, পুরুষকে কোরানের উদ্ধৃতি দিয়ে নৈতিকতা ও শালীনতা রক্ষার বিষয়ে তেমন বলা হয় না। এর প্রমাণ প্রায় প্রতিদিন সংগঠিত নারী ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনাগুলো। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ জোরালোভাবে পুরুষকে ধর্মের এই বাণী মেনে চলতে বলে না, কিন্তু যুগ যুগ ধরে শুধু নারী এটা করতে পারবে না, ওটা করতে পারবে না, নারীর আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ নিয়ে বলেই চলছে।

নারীর উপর কর্তৃত্ব করার সকল বাহানা এবং কূটকৌশলই প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে ইতোমধ্যে অধিকাংশ পুরুষ-নারীর মগজ যথেষ্ট ধোলাই হয়েছে। এর পরিণতিতে যৌন নিপীড়নে ভূক্তভোগী নারীর পোষাক-পরিচ্ছদকে দোষারোপ করে তাকে দ্বিতীয়বার নির্যাতন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মুসলিম দেশ যেমন তুরস্ক, অমুসলিম অনেক দেশে গ্রীষ্মে ট্রেন-বাস-পার্ক-সমুদ্র সৈকতে স্থানীয় প্রায় সকল নারী পুরুষ সংক্ষিপ্ত পোষাকে ঘুরে বেড়ায়, সাঁতার কাটে, গোসল করে। কিন্তু সেদিকে আশে পাশের মানুষ অসংযত দৃষ্টি, উচ্য-বাচ্য-আগ্রহ কোনটাই দেখায় না। এ অবস্থায় একজনের সাথে আরেকজনের দৃষ্টি বিনিময় হয়, আলাপচারিতাও হয়, কিন্তু কেউ কারো শরীরের দিকে দৃষ্টি দেয় না। কথা বলে একজন আরেক জনের চোখের দিয়ে তাকিয়ে।

সভ্য সমাজে নারী-পুরুষ যেই হোক, কারো শরীরের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া অশালীন, কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে আগ্রহ দেখানো অশোভন। মোটকথা, পুরো বিষয়টি হচ্ছে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের দেশে ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষায় মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়েছে। লজ্জাজনক যে নারীর প্রতি অসম্মান, অবমাননা এবং নিপীড়নে কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে লাগছে না। উল্টা নারীর পোষাক-পরিচ্ছদ কে নিপীড়নের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করার একটা কু-সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, নারীর পোষাক-পরিচ্ছদের কথা বলা হয়েছে কোরানের একই সূরার ৩১ নং আয়াতে এবং পুরুষের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে ৩০ নং আয়াতে। এর মানে পুরুষকে আগে সংযত এবং নৈতিক আচরণে অভ্যস্ত হবার কথা বলা হয়েছে বা হওয়া উচিৎ।  
আমি বিশ্বাস করি অধিকাংশ পুরুষ নারীর প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল। কতগুলো নোংরা পুরুষ নারীর জীবনকে অতীষ্ঠ করে তুলছে এবং সমাজকে কলুষিত করছে।  ধর্ষণ-যৌন নিপীড়নকারী পুরুষ শুধু নির্দিষ্ট নারীকেই ধর্ষণ/নিপীড়ন করে না,বরং সে গোটা সমাজকেই ধর্ষণ করে।

যৌন নিপীড়নের মত অন্যায় যেহেতু পুরুষ দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে তাই দেশের পুরুষদের এই কুৎসিত, অসভ্য এবং দণ্ডনীয় অপরাধ বন্ধে বিশেষ দায়িত্ব নেয়া উচিৎ মনে করি। নারীর শালীনতা নিয়ে যথেষ্ট বলা হয়েছে, এখন নোংরা পুরুষকে নৈতিকতা এবং শালীনতা শিক্ষা প্রদানে সোচ্চার হওয়ার সময়।

পোষাক পরিচ্ছদে নারী কিভাবে চলবে সেটা পুরুষের দেখার বিষয় না, সেটা একান্তই নারীর বিষয়। প্রকৃতপক্ষে, নারীর পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি বিষয়ে ধান্ধাবাজ পুরুষের কথা বলা আইন করে বন্ধ করা জরুরি। নারীকে জ্ঞান বিতরণের পরিবর্তে এসব পুরুষের এখন ”নিজের চরকায় তেল দেয়া উচিৎ”, মানে কোরানের ২৪:৩০ নং আয়াতের অনুশাসন মেনে চলা উচিৎ।
লেখক: সমাজবিদ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.