শব্দ, বাক্যে ও যাপিত জীবনে নারীর অমর্যাদা

Draupodi 1তামান্না কদর: অনেকে বলে থাকেন নারীবাদ বা নারীর সমস্যা ছাড়া আরো তো অনেক বিষয় আছে লিখার। অবশ্যই আছে। কিন্তু যে মানুষ এখনো মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত সেতো তার একান্ত কথা ছাড়া অন্য কথা সহজে বলবে কেন!

কিছু মানুষ যারা নারী লিঙ্গ নিয়ে জন্মে কখনো প্রাপ্ত লিঙ্গ চিহ্নটির জন্যে বৈষম্যের শিকার হতে হয়নি তার নিজ পরিবারে, তার পক্ষে নারীবাদী হওয়া কঠিন বিষয়, তবে হতে পারেন, তাদের অনেকে অনেক সময় প্রতিবাদ করেন বিভিন্ন বিষয়ে, সংরক্ষিত নারী কোটা নিয়ে, তারা নারীবাদকে একটি প্রকৃষ্ট বিষয় হিসেবে ভাবতে ইতস্তত বোধ করেন, তারা মনে করেন যে নারীবাদের জন্যে একটি দিবস পালনের প্রয়োজন হাস্যকর। সবদিন নারীর দিন।

হ্যাঁ, আমরাও তাই-ই চাই। তবে এখনো এটি রূঢ় সত্য যে, সবদিন নারীর হয়ে ওঠেনি। যে নারী সন্তান, সংসার, সন্তানধারণ থেকে সন্তান লালন-পালন পর্যন্ত পরিবার এবং সমাজের সহায়তা পেয়ে ক্যারিয়ার গঠন করেছেন তার পক্ষে অনুধাবন করা কষ্টকর সেই নারীর অসহায়ত্ব আর যন্ত্রণা, যে নারী সংসার, সন্তান আর তার কাজের ক্ষেত্রকে সমান গুরুত্ব এককভাবে দিতে গিয়ে নিজের অজান্তেই নিজের প্রতি অযত্নশীল হয়ে ওঠেন।

আর আমরা যারা নারীবাদী বলে দাবি করি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, নারীর অধিকার রক্ষার জন্যে আন্দোলন করি, লিঙ্গবৈষম্য দূর করার কাজে মঞ্চ কাঁপিয়ে বেড়াই তারা কি করি! প্রগতিশীল মিডিয়া কি করে!

এখনো মিডিয়ার বাক্য ‘প্রায় চার হাজার পিঠা তৈরিতে আটজন নারীসহ অন্তত ২০ জন মানুষ সার্বক্ষণিক কাজ করেন’( প্রথম আলো- ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, পৃঃ ৩, শিরোনাম- শাহবাগের জন্যে রসের পিঠা)। বোঝাই যাচ্ছে আটজন ছাড়া বাকিরা পুরুষ বা পুরুষ শিশু আর আটজন এক অদ্ভুত জীব।

মজার বিষয় হলো, এই অদ্ভুত জীবদের পেটেই পুরুষেরা জন্মায়। কিছু নারীবাদী লেখক যাদের লিঙ্গচিহ্ন নারী, তারা লিখেন এমন সব শব্দ, যথাক্রমে- নারী কেলেঙ্কারি, মেয়েঘটিত বিষয়, নারী ঘটিত বিষয়, নারীর শ্লীলতাহানি, নারীর ইজ্জত লুট। তাদের এমন সব শব্দচয়নে আমি বিস্মিত হই, সাথে সাথে ক্রুদ্ধ।

এটা কী তাদের চেতন মনের বহি:প্রকাশ? নাকি অবচেতনেই, বহু সময় ধরে চালু, নারীকে উপুর্যুপরি নির্যাতক শব্দগুলি ব্যবহার করেন? পরিবর্তনের কথা আমরা যারা বলি, প্রতি পদে আমরা নিজেরাও পরিবর্তিত হবো ইতিবাচক।

শব্দচয়ন ও বাক্যবিন্যাসে মানবিক না হলে, নারীর মর্যাদা দিতে না পারলে লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যাপক সময়ের প্রয়োজন হবে। কেননা ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা দেখতে পাই নারীকে যত না নানারকম হাতিয়ার দিয়ে নির্যাতন করা হয় তার চেয়ে বেশী করা হয় ভাষা দিয়ে।

এখনও অনেকে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের সম্মান দিতে গিয়ে মূলত আরেকদফা তাদের নির্যাতন করেন। তারা বলেন, দু লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত লুট করেছে হানাদার বাহিনী, রাজাকার ও তাদের দোসররা। কী নির্মম শব্দচয়ন! তার মানে এই-ই দাঁড়ালো- নারীর সতীত্ব খুব মূল্যবান সম্পদ, যা লুট হতে পারে আর লুট করে নিলে পরে নারীর আর অবশিষ্ট কিছু থাকে না।

বিষয়টি এমন কিছু নয়। মুক্তিযুদ্ধে এইসব নারীরা নির্যাতিত হয়েছিলেন শারীরিক এবং মানসিকভাবে। আর রাজনৈতিকভাবে আমরা এখনও এই নির্যাতিত নারীদের আবারও নির্যাতন করে যাচ্ছি নানারকম অবজ্ঞাসূচক শব্দ ও বাক্যচয়নে। আমাদের বোধোদয় কবে হবে!

এখনো কেন নারীর যোনী মাটির পাত্র বলে বিবেচিত হবে আর পুরূষের শিশ্ন অবিনশ্বর? এই ঈশ্বরত্ব দাবি করার কোন যৌক্তিকতা নেই। নারীকে এগিয়ে যেতে দেখলে পুরুষ প্রেমিক, পুরুষ বন্ধু, বর(স্বামী), পরিবার, আত্মীয় সবাই যে বাক্যটি প্রথম বলে, সেটি হলো ‘সতর্ক থেকো’। এই বাক্যটি নারীকে নিরুৎসাহিত করতে পারে, ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলতে পারে। অথচ পুরুষের বেলায় ব্যবহৃত হয় ‘এগিয়ে যাও’ বাক্যটি।

‘সতর্ক থেকো’ বাক্যটি নারীর বেলায় ব্যবহৃত হয় ছিনতাই বা সড়ক দুর্ঘটনা থেকে নয়, ব্যবহৃত হয় এসিড নিক্ষেপ বা যৌন নির্যাতন(ধর্ষণ) ভয় থেকে। ‘সর্তক থেকো’ বাক্যটি বলার বদলে আমরা বরং নারীর চলার পথকে সুগম করে তোলার প্রয়াস করি।

মানুষ মাত্রেই সতর্ক থাকবে। কিন্তু উভয়ে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও দু লিঙ্গের প্রতি দুরকম বাক্য প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে কেন? তাহলে নিজেদের সভ্য বলে দাবি করি কোন মুখে? এ কেমন সমাজ তৈরি করেছে পুরুষ! এ সমাজ আমরা চাইবো কেন? চাই না, চাই না।

এ সমাজ নারীর জন্যে মোটেও ইতিবাচক নয়। এ সমাজ কামুক পুরুষদের জন্যে সুখকর। ইদানিং অনেক প্রগতিশীল(!) পুরুষ প্রায়ই বলে থাকেন, মাকে সম্মান করতে হবে, মায়ের সম্ভ্রম রক্ষা করতে হবে। এইসব অর্বাচীন বালকদের জন্যে করুণা হয়। আমি বলি, নারীকে সম্মান করুন।

নারীর প্রথম পরিচয় সে একজন মানুষ, ব্যক্তি মানুষ, পুরুষ মানুষ যদি নিজেকে মানুষ বলে দাবি করে তবে তার উচিত হবে নারীকে মানুষ হিসেবেই সম্মান করা, মা হিসেবে নয়।

মাতৃপরিচয় গৌণ। কন্যা, জায়া, জননী অত রূপ দেখতে যাবেন না, শুধু মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করুন। নিজেদের কুৎসিত মানসিকতা ত্যাগ করুন। মিডিয়ার নানা বিজ্ঞাপনে নারীকে পুরুষের তুলনায় নিম্নমানের লিঙ্গচিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচে অবাক করা বিষয় হয় তখনই যখন দেখি কেবল টাকা আর সস্তা খ্যাতির জন্যে এইসব বিজ্ঞাপনে নারীরা হেসে হেসে উপস্থিত হচ্ছেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.