চোখ যার চোরাবালি

Laily
সালেহা ইয়াসমীন লাইলী

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: কোন কুক্ষণেই না জন্ম হয়েছিল আমার! তখন হয়তো পাতালের কোথাও একখণ্ড মাটি ছিল না। নইলে কোনো মা তার সন্তানকে জন্ম দিয়েই সাগরে ভাসিয়ে দেয়! একবারও পিছনে না তাকিয়ে হন হন করে চলে যায় কোনো বাবা! নিশ্চয়, বড় দুর্দিন ছিল সেদিন।

নিশ্চয়, বাবা-মায়েরও পায়ের নীচের মাটি সেদিন খিচে টেনে নিয়েছিল কোনো মহাপ্রলয়।

সেই আমি জন্ম থেকে ভাসছি সাগরে। ভাসতে ভাসতে যখন যে কুলকে পাশে দেখেছি খুশিতে সে কুলে ভিড়েছি এক টুকরো শক্ত মাটির আশায়। আমার কুল সরে গেছে অকুলে। কোন শক্ত মাটির স্পর্শ পায়ে পড়েনি কোনদিন। হয়নি নিজের পায়ে নিজের মতো করে দাঁড়ানো।

এই অকুলে ভাসা আমাকে ভাসতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে ভেসে ভেসে বাঁচতে। কখনও স্রোতের ‍সাথে মিত্রতা করেছি, কখনও স্রোতের হুঙ্কারকে তুড়ি মেরে উল্টো পথে ভেসেছি।

কিন্তু সময়তো দাঁড়িয়ে থাকেনি আমার মাটির দেখা পাওয়ার অপেক্ষায়। সময় চলে গেছে আপন নিয়মে। এখন আমার শরীর ক্রমে একটু একটু করে নিস্তেজ হয়ে আসছে। দুর্বল হয়ে পড়ছে মনের শক্তি। গতি হয়ে পড়ছে শ্লথ-ম্রিয়মান। মাটিতে চলার চেয়ে সাগরে ভাসতে যে বড্ড বেশী শক্তি দরকার পড়ে, সখি।

আমার নিজকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন স্বর্গ-নরকের টিকেট না পাওয়া কোন অভিশপ্ত আত্মা মনে হয় আজকাল। যেন জন্মান্তরের অভিশাপ নিয়ে আমার ঠাঁই হয়নি কোন শক্ত জগতে, হয়নি পরলোকেও। নিজের অপয়া, অশুভ নিরাকারের আকার নিয়ে ঝুলে আছি কোথাও অনধিকারে।

তুমি আমার চোখের কাজলের মানে খোঁজ, সখি? এ শুধু কাজল নয়, বলতে পারো সাগর পাড়ের কোন শক্ত বাঁধ। যা আমার সাগর চোখে প্লাবণ এলে ঠেকিয়ে দেয়! বলতে পারো কোন নিকাবও! যা আমার রক্তঅশ্রুর রঙ সবার চোখকে আড়াল করে। কেউ আমার অশ্রু দেখে করুণা করুক, আমি তা চাই না। কেউ আমার রক্তঝরা রাঙা চোখ দেখে রুমাল এগিয়ে দেয়ার সুযোগ নিক, তাও আমি চাই না।

প্রথম যেদিন তুমি আমার চোখে কাজল পরিয়ে দিয়েছিলে সেই নাচের অনুষ্ঠানে, আমি খুব অস্বস্তি বোধ করছিলাম। আমাদের ইংরেজী পড়ানো কৃষ্ণ রায় স্যার আমাকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তোমার চোখের গভীরতা এভাবে কাজলে ঢেকে দিলে তুমি আর তুমি থাকো না যে। কাজল তোমার জন্য না।’

স্যারের কথায় আমি লজ্জা পেলেও খুশি হয়েছিলাম এইভেবে যে, যাক, আমাকে অন্তত কাজল পরতে হবে না। তখন কি জানতাম, এই কাজল আমার এতোটা আপন হবে! খুব বেশিদিন লাগেনি কাজলকে কাছে টানার, যখন আমি জানলাম নিজেকে, নিজের অস্তিত্বকে।

কাজলের বিড়ম্বনায় পড়েছিলাম আরো কতবার! তারা তোমার মতো জানে না আমি কখনই কাজল পরতাম না। আমার এলোমেলো, খোলাখোলা কাজল পরা দেখে দেশখ্যাত এক ফটোগ্রাফার বলেছিলেন, কাজল যদি পরি, যেন ঠিকঠাক পরি। তিনি যখনই ছবি তুলছিলেন কাজলের অন্ধকারে ঝাপসা হচ্ছিল আমার চোখ। আর তিনি খুব স্বচ্ছ কিছু ছবি তুলতে চাচ্ছিলেন। আমার এক বান্ধবী তো বিদেশ থেকে অনেক দামী একটা কাজল এনে দিয়েছিল আমাকে। তারা তো জানে না আমার অশ্রু ঠেকাতে গিয়ে কাজলের বাঁধ খসে ছিঁড়ে যায়। আমি এখন প্রতিদিন কাঁদি, আর প্রতিদিন কাজল পরি।

তোমার মতো এতটা কেউ মনে রাখেনি হয়তো আমাকে। তাই তুমি এতো বছর পর আমার চোখ দেখেই রহস্যের ছায়া খুঁজতে এলে। কোন রহস্য তুমি ভেদ করবে? আমার জীবনের প্রতিটি পাতায় ভিন্ন ভিন্ন শিরা-উপশিরা পাবে। তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে কতশত চোরাবালি!

কোন পথে যাবে তুমি? জীবনে একবারই তো এক চোরাবালিতে পা দিয়েছিলাম। অসর্তকতায় নয়, বরং বিশ্বাসে। ভেবেছিলাম, আমি ডুবে যাব না কোনদিন। জীবনে যার এতোটা ভেসে থাকার দক্ষতা, তাকে এই চোরাবালি কিভাবে ডুবাবে। আর বাসনা তো ছিলই একখণ্ড শক্ত মাটির। ভাসতে ভাসতে এতোটা অধীর ছিলাম যে মাটির লোভ সামলাতে পারিনি সেদিন। আমি বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলাম। হয়ে ‌উঠেছিলাম আত্মবিনাশী।  

কিন্তু আমি শক্ত মাটি পাইনি। রোজ একটু একটু করে আমি তলিয়ে যাচ্ছি চোরাবালিতে আর আমার বিশ্বাসের বিশ্বাসঘাতকায় আমি ক্রমশঃ লীন। তুমি এসো না সখি আমার রহস্য খুঁজতে। এসো না কোন চোখের চোরাবালিতে!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.