নীরবতা ভাঙতেই হবে

Sulatana Rahman
লেখক ও সাংবাদিক: সুলতানা রহমান

সুলতানা রহমান (উইমেন চ্যাপ্টার):
এক.
‘ন’ এর বয়স যখন ১২ বছর, তার দুরন্তপনা একেবারেই উবে গেলো। সবার চোখ পড়লো তার পেটের দিকে। এইটুকু মেয়ের এতো বড় পেট! ঠিক মতো খাওয়া দাওয়াও করতে পারেনা বেশ কয়েক মাস ধরে। কয়েক দফা কৃমির ওষুধ খাওয়ানো হলো। কিন্তু পেট শুধু বড়ই হচ্ছে। সবাই পরামর্শ দিলো ডাক্তারের কাছে নেয়ার। নিশ্চয়ই মেয়ের সাংঘাতিক কোন অসুখ হয়েছে। না হলে পেট এতো বাড়ছে কেন! জেলা সদর হাপাতালে নেয়া হলো তাকে। ডাক্তার বললেন, ন ৬ মাসের অন্তসত্ত্বা! বাবা-মা’র মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। চিকিৎসকের সামনেই মেয়েকে বেদম প্রহার করে জানতে চাইলো, কে এই সর্বনাশ করেছে। বাবা মা চিকিৎসককে অনুরোধ করলো এবরশন করার। ডাক্তার বললেন-৬ মাসের গর্ভ অপসারণের নিয়ম নেই। তিনি অপারগ।এরপর ন বন্দী হলো নিজ ঘরে। অনেকদিন কেউ তাকে দেখেনি। কার লালসার শিকার হযে ওইটুকু মেয়ে অন্তসত্ত্বা হলো? তারপর কি হলো শিশুর গর্ভের শিশুর? কিছুই জানা গেলোনা। বছর কয়েক পর কিছুটা চুপিচুপি দূরের এক গ্রামে তার বিয়ে হয়ে গেলো।

দুই.
স রাগ করে বাসা থেকে চলে গেছে। মাকে বলেছে সিদ্ধান্ত নিতে, স্বামী চায় না মেয়ে চায়। তার স্পষ্ট কথা, ‘তোমার স্বামী বাসায় থাকলে আমি থাকবোনা।’ না, সৎ বাবা নয়। নিজের বাবার সঙ্গে এক বাসায় থাকতে চায়না স। রাজধানীর একটি নামী স্কুল থেকে এবারই এইচএসসিতে জিপিএ ফাইভ পেয়ে পাস করেছে স। রেজাল্ট বের হওয়ার পরপরই ব্যাগ গুছিয়ে সে রওয়ানা হয়েছে-এই বাড়িতে আর নয়। হাতে পায়ে ধরেও মা কিছুতেই তাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারেনি। স চিৎকার করে মাকে বলছে, ‘যে তার মেয়েকেও ছাড়েনা, সেই রকম পশুর সঙ্গে তুমি সংসার করতে পারো, কিন্তু আমি আর থাকবোনা। অনেক সহ্য করেছি। আর নয়।’
স বাসা থেকে চলে গিয়েছিলো। সপ্তাহ খানেক ছিলো বন্ধবীর বাড়িতে। কিন্তু আবার ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। বাবা বাসায় থাকবেনা, এই শর্তে সে বাসায় ফিরেছে।

তিন.
ক্লাস টেনে পড়তো ম। এক রাতে আপন ভাই তাকে ধর্ষন করে। মাকে জানিয়েছিলো ম। কিন্তু মা বললো-কাউকে কিছু না বলতে। কাকপক্ষীও যেনো টের না পায়। তিন মাস পর ম বুঝতে পারলো সে অন্তসত্ত্বা। বেড়াতে যাওয়ার নাম করে বাবা-মা মেয়ে ঢাকায় এলো। এবরশন হলো। আবার বাড়ি ফিরে গেলো তারা।

চার.
মেয়ে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। তাই প’এর মা কখনোই মেয়েকে কোথাও একা ছাড়তোনা। কিন্তু মায়ের জানা ছিলোনা, ম প্রতিদিন তার আপন চাচার কাছে ধর্ষিত হতো। শিশু বয়সের সেই নির্যাতনের কথা কাউকে সে বলতে পারেনি।

না, এগুলোর কোনটিই কাল্পনিক গল্প নয়। একেবারে সত্য, আমাদের সমাজের, আমাদের চারপাশের ঘটনা। এবং এগুলো খুব যে ব্যতিক্রম তা-ও কিন্তু নয়। কিন্তু লজ্জা অপমান অসম্মানের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়না। শিশু বয়সে কোনও না কোনও ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়নি-এমন নারী শিশু আমাদের সমাজে কমই আছে। বিভিন্ন গবেষনা বলছে, নারী শিশুরা তাদের আপনজনদের দিয়েই প্রথমে নিপীড়িত হয়। হোকনা বাবা, চাচা মামা খালু জ্যাঠা পিসা কিংবা সহোদর ভাই-নারী শিশুরা নিরাপদ নয় কারো কাছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, এমন আপনজনদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুরাই কাউকে তা বলতে পারেনা। আর এই বলতে না পারার পেছনে রয়েছে অজানা ভয়, আতঙ্ক এবং সংশয়। এই তিন মিলে নির্যাতনের শিকার শিশুর মনোজগতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে যা থেকে সৃষ্টি হয় অবিশ্বাস এবং সন্দেহপ্রবনতা।
ল এর বয়স এখন ৪০ বছর। পেশায় আইনজীবি। স্বামী সন্তান মিলে সুখী পরিবার তার। কিন্তু আজো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় শিশু বয়সের নির্যাতনের দৃশ্য। ‘মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠি। সেই চিৎকার শুনে স্বামী জেগে ওঠে, কিন্তু তাকে কিছুই বলতে পারিনা,’ বলছিলেন ল।

‘আমার বয়স তখন সাত কি আট। আমাদের পাড়ায় কেউ একজন মারা গেছে। মা-বাবা সবাই সেখানে সান্ত্বনা দিতে গেছে। আমিও ছিলাম মায়ের সঙ্গে।কিন্তু আমার অসুবিধার কথা ভেবে মা আমাকে বাসায় পাঠিয়ে দিলো আমার চেয়ে বয়সে প্রায় দশ বছরের বড় চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে। ভাইয়া আমাকে বাসায় এনে ফ্রক খুলতে বললো। না হলে পাশের ড্রেনে চুবিয়ে মেরে ফেলবে। আমি স্বপ্নে দেখি কেউ একজন আমাকে ড্রেনের নোংড়া পানিতে চুবিয়ে মারছে, আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এই একই দু:স্বপ্ন আমি ছোট বেলা থেকে কিছু দিন পরপর দেখি,” ল দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

শিশু বয়সের এই নির্যাতনের কথা তিনি ভয়ে কাউকে বলতে পারেননি। এমনকি মাকেও না। একদিকে ড্রেনে চুবিয়ে মারার ভয়, অন্যদিকে মা আবার না তাকেই দোষ দেয়, পিটুনি দেয়-সেই ভয়। ৭/৮ বছরের শিশুটি নিজের সঙ্গে নিজে লড়াই করতে যেয়ে ক্ষয়ে যায় ভেতরে ভেতরে। ল এর সেই চাচাতো ভাই এখন একজন উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। স্ত্রী সন্তান নিয়ে তারও সুখী পরিবার। পারিবারিক নানা উৎসব অনুষ্ঠানে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়, কিন্তু আজো ভয়-জড়তা কাটেনি ল’ র।
‘মাঝে মাঝেই মনে হতো তাকে আমি একদিন শাস্তি দেবো? কঠিন শাস্তি। সবার সামনে বলে দেবো সেই ঘটনা। জানতে চাইবো-ওইটুকু বয়সে আমার সঙ্গে এমন আচরন কি করে করেছিলো? একদিন সাহস করে তাকে রুমে ডাকলাম, একা। রুম বন্ধ করে কষে তার গালে চড় দিয়েছিলাম। সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। আমি তাকে স্মরন করিয়ে দিলাম সেই ঘটনা। প্রথমে অস্বীকার করে। কিন্তু পরে বলে আমিও ছোট ছিলাম বুঝতে পারিনি। তার এ কথায় আমি দ্বীতিয় চড় দিয়ে বলেছিলাম, এখন তো বড় হয়েছেন, বুঝতে শিখেছেন, আমার পা ধরে মাফ চান,’ বলতে বলতে ল’র চোখ যেনো বারবার জ্বলে উঠছিলো।

ল ব্যতিক্রম নারী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষকরা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়না জীবনে কোনওদিন। সমাজ তাদের সেই সুযোগটি করে দেয়। নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে সতীত্ত্বের সংস্কার আর সমাজ কাঠামোয় পুরুষের সুবিধাজনক অবস্থান নারীকে তার নিপীড়নের কথা বলতে দেয়না। অথচ উপমহাদেশের সমাজ কাঠামো নারীর যে সতীত্ত্বের মধ্যে মান-সম্মান ইজ্জত খোঁজে, তা আসলে নারীকে দমনে পুরুষের যুৎসই অস্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই সতীত্বের দোহাই দিয়ে পুরুষের নিরাপদ ধর্ষণ প্রতিরোধে নিরবতা ভাঙতেই হবে। ধর্ষকদের প্রশ্নের মুখোমুখি করতে তাদের মুখোশ খুলে দেয়া আজ সময়ের সাহসী দাবি।

শেয়ার করুন:
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.