বিছুটির দহন আর কদর্য পুরুষের ‘হারাই হারাই’ ভয়

Byke 1শারমিন শামস্: ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যেসব পুরুষ জিন্স, টি শার্ট পরে, ফেইসবুকে প্রোফাইল পিকচার দিয়ে, রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আপডেট করে, গান গেয়ে, পয়লা বৈশাখ করে কিংবা না করে, রাজনীতি বা সমাজ উদ্ধার করে, হেসে খেলে, নেচে-কুঁদে আধুনিকতার মোড়কে নিজেকে দশ প্যাঁচ দিয়ে বারবার সকলকে ঘোল খাওয়াচ্ছিলেন, আজ তারা নিজের ভেতরের হতকুচ্ছিত রূপটাকে কোনভাবেই আর ঢেকে রাখতে না পেরে বারবার সামনে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।

চারিদিকে ধর্ষণ আর যৌন হয়রানির প্রতাপে অসংখ্য মেয়ে যখন নিজেদের কণ্ঠ সোচ্চার করে বারবার প্রতিবাদী হয়ে উঠছে, প্রতিরোধের ঘোষণা দিচ্ছে, তখন আর চুপ করে থাকা সম্ভব হচ্ছেনা এদের পক্ষে। যারা প্রতিবাদী লেখা লিখছেন তাদের গাল পেরে, নোংরা-অশ্লীল মন্তব্য করেও তাদের গায়ের জ্বালা মিটছে না। প্রকাশ্যে ধর্ষণের হুমকিও দেয়া যায় এই দেশে। তারাও তাই দিচ্ছেন। অফিসে আদালতে বাসায় দোকানে পথে ঘাটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেয়েরা আজ সোচ্চার হয়ে উঠছে, এই বিষয়টি আতংক সৃষ্টি করেছে কিছু পুরুষের মনে।

আর করেছে বলেই, সেইসব মুখোশধারী পুরুষ নারীর পোশাক, চলাফেরা আর তার স্বাধীনতাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করার যে অপপ্রয়াসটি চালাচ্ছে, একটু লক্ষ্য করে দেখলেই দেখা যাবে, তাদের বক্তব্যগুলো কতটা অন্তঃসারশূণ্য আর অর্থহীন। ধর্মকে ব্যবহার করে, অজস্র মিথ্যে কথা আর যুক্তিহীন বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করে তারা একটা বস্তুই হাসিল করতে চায়। তারা চায় নারী থাকুক অবনত মাথায়, তাদের চেয়ে নিচু অবস্থানে। নারী থাকুক ঘরে বন্দি, থাকুক পুরুষের ইচ্ছের অধীন।

চারিদিকে নারীর প্রতিভা মেধা আর সৃজনশীলতা বহুদিন ধরেই তো তাদের ভিতরে যন্ত্রণা সৃষ্টি করেছে। আজ পোশাক, চলাফেরা আর ধর্মের দোহাই দিয়ে কোনমতে যদি সেই এগিয়ে যাওয়া নারীর পথ তারা রুদ্ধ করতে পারে, তবে এই প্রতিযোগিতার বাজারে পুরুষের একচেটিয়া অবস্থানের হারানো দিন আবারো হয়তো ফিরিয়ে আনা সম্ভব, এই আশাতেই হয়তো এইসব করে যাচ্ছে তারা।

এই জাতীয় পুরুষ সব দলেই আছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, বাম, ডান, সংস্কৃতমনা, অসংস্কৃতমনা, শিক্ষিত অশিক্ষিত, ছাত্র শিক্ষক সরকারি চাকুরে, ব্যবসায়ী, কর্পোরেট কর্মী কী এনজিও চাকুরে- কোন কিছু দিয়েই এদেরকে আলাদা করা যাবে না। এরা যেকোন কিছুই হতে পারে। কিন্তু ভেতরের গলিত নোংরাটুকু এক। এই পচাগলা নোংরা মনটাই তাদের এক সূত্রে গেঁথে রেখেছে। এখানে তারা সবাই এক। যখনই এরা কোন মেয়েকে চোখ তুলে মাথা উঁচু করে কথা বলতে দেখে, একসঙ্গে দলবেঁধে এরা ছুঁটে আসে আক্রমণ করবে বলে। সুযোগ পেলে তারা মেয়েটিকে ধর্ষণই করতো। সুযোগ না পেয়ে অনলাইনে, টেলিফোনে কিংবা সামনাসামনি অশ্লীল অযৌক্তিক কথা দিয়ে উপুর্যপরি আঘাত করে মেয়েটিকে দুর্বল করে ফেলাই তাদের লক্ষ্য। এইসব আঘাত এখন পর্যন্ত মানসিক আঘাতেই সীমাবদ্ধ। তবে সুযোগ পেলে তারা এইসব বিতর্কের সময় শারীরিক আক্রমণেও যাবে, আমি ধারণা করি।

Moonmoon
শারমিন শামস্

আমি একটা লেখা লিখেছিলাম। ধর্ষণের প্রতিবাদে। অসংখ্য পুরুষ পাঠককে পেয়েছি, যারা এই লেখার মর্মার্থ্ অনুধাবন করতে পেরেছেন। নারীর ক্রমাগত নিগৃহীত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত হওয়ার বেদনা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করেছেন। কোন বেদনা আর যন্ত্রণা বুকে বয়ে বেড়ালে মেয়েরা এতটা মারমুখী হয়ে ওঠে, তা হয়তো বোঝার চেষ্টা করেছেন অনেকেই। কিন্তু একটা বৃহৎ অংশ বলতে চেয়েছে, ধর্ষণ হবেই। এর প্রতিবাদ জানানো যাবে না। তারা বলতে চায়, ধর্ষণ পুরুষ করবেই। নারীর কাজ ধর্ষণকে আটকে রাখা।

তারা বলে, ধর্ষণ নারীর পাপের ফল। আর ধর্ষণের প্রতিবাদের শাস্তিও ধর্ষণ। যেহেতু আমি লিখছি, যেহেতু আমি কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করেছি, প্রতিকার চেয়েছি, সেহেতু তারা আমার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন, আমার ‘চরিত্র’ বিশ্লেষণ করতেও ছাড়েনি।

আবার এরকম কিছু আবাল পুরুষেরও দেখা পেয়েছি, যারা ধরেই নিয়েছেন আমি সব ধর্ষকের শাস্তি তাদের ওপরও চাপিয়ে দিচ্ছি। তবে কি মনে মনে তারাও ধর্ষক? তাদের মনের ভিতরেও কি ধর্ষণের সুপ্ত ইচ্ছে ধামাচাপা পড়ে আছে সুযোগের অভাবে? তা নাহলে তারা এত আতংকিত কেন শাস্তির ভয়ে?

ধর্ষণের মত একটা জঘণ্য অপরাধ করে গোটা পুরুষ জাতিকে যারা কলঙ্কিত করছে, বরং তাদের বিচার চাওয়াটাই তো সুস্থ সুন্দর মনের পুরুষের জন্য স্বাভাবিক। তবে? বারবার লেখাটা পড়ি। স্পষ্ট লেখা আছে, যারা ধর্ষণ করতে উদ্যত হবে, যৌন নিপীড়ন করবে, তাদের রুখে দেয়াই আমাদের লক্ষ্য। তাহলে? সমস্যা কোথায়?

অসংখ্য মেয়ে আজ প্রতিবাদী ফণা তুলছে। অসংখ্য মেয়ে সেইসব প্রতিবাদী মেয়ের পাশে দাঁড়াচ্ছে। পাশে দাঁড়াচ্ছে পুরুষ শুভার্থীরাও। তাই কি ভীত ওইসব পুরুষের দল? মেয়েরা মার্শাল আর্ট শিখছে। মেয়েরা সাবলীল পোশাক পড়ছে। মেয়েরা মাথা তুলে হাঁটছে। মেয়েরা জোর গলায় প্রতিবাদ করছে। আইনের আশ্রয় নিচ্ছে। এ সবই তো অশনি সংকেত তাদের জন্য।

Attackপাশ দিটে হেঁটে যাবার সময় কনুই দিয়ে যে মেয়েটার বুকে সহজেই স্পর্শ করে মাথা উঁচু করে চলে যাওয়া যেত, কে জানে, হয়তো এরপর সেই মেয়ের কাছ থেকে লাথি আর জুতোর বাড়ি খেতে হবে পরের বার!

ধর্ষণ করে ফেলে রেখে গেলে লজ্জায় মেয়েটা চুপ করে থাকতো, এখন তো সেই মেয়ে একটার পর একটা প্রতিকূলতা পার করেও মামলা করে ছাড়ছে, বিচার চাইছে, চারিদিকে শোরগোল ফেলে দিচ্ছে। ধর্ষিতার লজ্জায় চুপ করে থাকার দিন শেষ হলে ক্ষতিটা কার? ফলে লজ্জা নারীর ভূষণ, মেয়েদের দোষেই ধর্ষণ হয়- এসব থিওরি প্রচার করলেই কেবল সম্ভব মেয়েদের আবারো ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করে দেয়া। ফলাফল, আবার সুলভ হবে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, ইভটিজিং, নারী নির্যাতন।

আমাদের প্রতিবাদ, আমার লেখনী, আমাদের মন্তব্য, আমাদের কথা, আমাদের চলা, আমাদের সাহসী হয়ে ওঠাকে ভয় পেয়েছে তারা। যুগের পর যুগ, শতকের পর শতক ধরে যে নারীকে অপমান আর অসম্মানিত করে নিজেদের নোংরামীর পথ সহজ করে রেখেছিল যেসব পুরুষ, আজ তারা ভয় পেয়েছে। তাই ওরা বন্ধ করতে চাইবে আমাদের লেখা। আমাদের কথা। আমাদের জেগে ওঠা। উইমেন চ্যাপ্টারের সম্পাদক সুপ্রীতি ধরকে ক্রমাগত সাইবার আক্রমণ চালিয়ে ওরা বন্ধ করতে চায় শত শত মেয়ের প্রতিবাদের ভাষা।

আর হায়! জন্মেছি এমন দেশে, যেখান বিচারের বাণী কাঁদে নিভৃতে। যেখানে প্রমাণসহ হাজিল হলেও অপরাধী পার পেয়ে যায়, পাশে বসে ক্রুঢ় হাসি হাসে। তাই আজ বড় একা আমরা। আমাদের পাশে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। এই লড়াই আমাদের একার।

তবে সুখের কথা হলো, বহু বহু শতাব্দী ধরে ছাইচাপা আগুনে আজ বাতাস লেগেছে। লড়াই শুরু হয়ে গেছে। এ থেকে পিছু ফেরার আর পথ নেই। এ যুদ্ধে পরাজয়ের কোন সুযোগ নেই। এই লড়াই যেভাবেই হোক জিতে ফিরতে হবে আমাদের। আর তা নাহলে কোন একদিন প্রকাশ্য ধর্ষণের মহোৎসবের টিকেট বিক্রি হবে রাজধানী ঢাকার পথে ঘাটে!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.