আমাদের ওড়না-জীবন

Prova
মারজিয়া প্রভা

মারজিয়া প্রভা: সেদিন রাস্তায় যাচ্ছিলাম, রিকশায় বসে এক মা মেয়ের ওড়নাকে টেনে টেনে লম্বা করছে, মেয়ে সেটাকে মোটামুটি উপরে তুলে নিচ্ছে। মায়ের সাথে মেয়ের বাকবিতণ্ডা হচ্ছে, ক্যান মেয়ে এতো চিকন করে ওড়না পরবে? ওড়না তো ছড়িয়ে পরার জিনিষ!

আমি চলে গেলাম ক্লাস ফাইভের দিনগুলোতে। আমাদের স্কুলে সিক্সে বাধ্যবাধকতা ছিল সালোয়ার-কামিজ পরার। ফাইভ পর্যন্ত স্কার্ট-শার্ট। তো ফাইভে থাকলে যেসব মেয়ে সাবালিকা হয়, কিংবা স্তনযুগল পুষ্ট হয়, তারা সালোয়ার-কামিজ ধরতো।

আমার তখন গ্রোথ হচ্ছে মাত্র। মা ভেবেছিল, কয়েক মাস পরেই সিক্সে উঠছে, একবারে সালোয়ার কামিজ দিবে। বাঁধ সাধল, আমার ক্লাসটিচার। মাকে ডেকে বুঝালো আমি কত্ত বড় হয়ে গিয়েছি! মা কি সেটা দেখে না! সেই প্রথম, মা বুঝলো, সত্যিই মায়ের ছোট্ট মেয়ে আমি আর নাই, চোখে পড়ার বয়স হয়ে গিয়েছে!

এরপর থেকে আমার জীবনে নেমে এলো ওড়না সিনড্রোম। আমি ঘরে ফ্রক, হাফ প্যান্ট পড়ে থাকতাম। বাইরেও তাই পড়তাম।  জাস্ট বাইরে গেলে একটা জিন্সের কটি গায়ে চড়াতাম। বাইরে আন্টিরা মাকে রীতিমত ধসিয়ে দিয়েছিল। সেই ছোট্ট অমল মেয়ের গায়ে ঝুললো প্রথম লাল রংয়ের ওড়না।

একদম পছন্দ করতাম না এই পোশাকটা। খুব কষ্ট হতো, এক হাতে ব্যাগ সামলানো, অন্যদিকে ওড়না। প্রায়শ ওড়নাটা গলার উপরে উঠিয়ে দিয়ে ফেলতাম ভুলবশত। আর তখনই কোথা থেকে মা উদয় হতো, “তোর জন্য কি আমার মান সম্মান থাকবে না! মেয়ে হয়েছিস, ওড়না পরতে পারিস না”! মায়ের দোষই বা দিব কীভাবে, এই এক টুকরো বস্ত্রের জন্য তো মাকেও কম কথা শুনতে হয়নি!

স্কুলে গেলেও, ওড়না একপাশে এলে যেত। আমি এরকম একদিন আইসক্রিম খাচ্ছিলাম। বাম সাইডের ওড়না এলে গিয়েছিল, এক আন্টি এসে ঠিক করে দিয়ে বলল “ বড় হও”।

কত রং এর ওড়নায় ভর্তি আমার বাসা। আমি এখন বিশেষ স্টাইলে ওড়না পরি, দুইদিক থেকে সামনে নিয়ে। এখনও জোরে দমকা বাতাস এলে যখন ওড়না উড়ে যায়, আমাকে শুনতে হয় “ওড়না ঠিক জায়গায়, ঠিকভাবে পরতে হয়”।

একটা মেয়ে ফেবুতে, গলায় ওড়না দিয়ে ছবি দিয়েছিল। ছেলেদের কমেন্ট ছিল “ ওড়নার প্রয়োজন কি”?

আমরা হয়ত ভুলে যাই, ওড়না খুব সিম্পল একটা বস্ত্রবিশেষ। বিভিন্ন স্টাইল বা ফ্যাশনে এটা পরা যায়। পশ্চিমা বিশ্বেও ওড়নার চল আছে, আমাদের দেশে কিছুদিন থেকে শুরু হয়েছে স্কার্ফের চল। স্তনযুগল ঢাকার প্রয়াসে ওড়নার সৃষ্টি ছিল না। ছিল পোশাকের নান্দনিকতা বর্ধিত করতে। তাই ওড়নার মত করে, ছেলেরাও পাঞ্জাবির সাথে পরিধান করে। ছেলেদের ওড়না একটা ফ্যাশন হলেও, মেয়েদের জন্য অপরিহার্য একটা পোশাক। ওড়না ছাড়া রাস্তায় মেয়ে বেরোলে, যতই তার কম গ্রোথ থাকুক, আমরা তাকাবোই “মেয়ে ওড়না ছাড়া!”।

এই এক টুকরো পোশাক কত ভয়াবহ!  রিক্সায় উঠলে ভয়ে থাকি চাকায় লেগে গেল কিনা, বাস থেকে নামতে যদি কিছুর সাথে লেগে যায় ওড়না, তো সরাসরি ভূপতিত! ওড়নার জন্য কত বড় বড় দুর্ঘটনাও ঘটে-ঘটছে। তবুও স্টাইলের জন্য না, আজকের মেয়েরা ওড়না পড়ে আবশ্যকীয়ভাবে।

যেসব মেয়ে নিজস্ব স্টাইলে ওড়না পরা চল করে, তাদের রীতিমত ট্যাগ দেওয়া হয় “ বাজে মেয়ে”। একটা পোশাক, একটা ফ্যাশন, একটা স্টাইল নিয়ন্ত্রণ করে মেয়েদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

তাই রাস্তায় মা-মেয়ের ঝগড়া আমাকে আর ভাবায় না। আমি শুধু ভাবি, এই দেশের মেয়েরা ওড়না সামলাতে জীবনে যত সময় ব্যয় করে, সেই সময়টা যদি কোন প্রডাকটিভ কাজে ব্যয় হতো!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.