বেড়ে ওঠার সময় যা জানা জরুরি

girls safetyতানিয়া মোর্শেদ: মাছরাঙা চ্যানেলে মেয়েদের মেনস্ট্রুয়াল পিরিয়ড নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান শুনলাম কিছুটা। চ্যানেল-আইতে একটি অনুষ্ঠান হয়, দেখা হয়নি। কাজগুলো প্রশংসাজনক। জীবনের প্রায় অর্ধেক প্রবাস জীবন। বাংলাদেশের প্রায় সব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখি। তবে কিছু বিষয় হয়ত পুরো জানা নেই।

মেয়েদের পিরিয়ড নিয়ে কতটা ট্যাবু সমাজে তা জানি না। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম ক্লাস এইটে গার্হস্থ্য বিজ্ঞান নামে একটি বিষয় ছিল। ছেলেদের ছিল কৃষি বিজ্ঞান। খুব অপছন্দের বিষয় ছিল মেয়েদের জন্য আলাদা ঐ বিষয়। সেই বই-এ একটি অধ্যায় ছিল পিরিয়ড নিয়ে। যা ক্লাসে পড়ানো হতো না।

মনে আছে ক্লাসে বন্ধুদের মধ্যে পিরিয়ড নিয়ে আমিই প্রথম খোলাখুলি কথা বলি। সম্ভবত কেউ ঐ অধ্যায় নিয়ে নীচু স্বরে আলাপ, হাসাহাসি করছিল। আমি সহজভাবেই বলে বসলাম যে, হ্যাঁ এটা তো হয় ইত্যাদি। যদিও আমাকে আমার মা কিছুই বলেননি এবিষয়ে। হাজারো মেয়ের মতই আমার অভিজ্ঞতা!

একদিন ভয়ে অস্থির! ভাবলাম, এমন কোনো অসুখ হয়েছে যে আমি নিশ্চয় মারা যাবো! অনেক পরে মাকে বলেছি, কতটা ভুল ছিল তাঁর! বাবা-মা যদি নিজের সন্তানকে বিভিন্ন বয়সের বিষয়গুলোর জন্য প্রস্তুত না করেন, তবে কে করবে?

দীপ্ত যখন ফিফথ গ্রেইডে তখন একদিন স্কুল থেকে জানালো যে ওদের ক্লাসে ছেলে-মেয়েদের পিউবারটি বিষয়ে কিছু জানানো হবে। চাইলে আমি আগে দেখতে পারি কি কি বলা হবে। আমি স্কুল থেকে কিছু কাগজ নিয়ে আসলাম। ওর ক্লাসের আগেই আমি সেসব নিয়ে কথা বললাম। এটাও বললাম যে, তোমার যদি কোনো প্রশ্ন থাকে আমাকে সবচেয়ে আগে করবে। শিক্ষককেও করতে পারো। তবে কোনো বন্ধুকে নয়। এবিষয়ে বাবা-মা আর শিক্ষক হচ্ছেন প্রশ্ন করবার মানুষ।

যেদিন মেয়েদের পিরিয়ড নিয়ে কথা হয়েছিল ক্লাসে সেদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, সত্যি ব্লিডিং হয়? ব্যথা করে না? আমি বললাম, অনেকের ব্যথা হয়। অনেকের অনেক ব্যথা হয়। যেমন আমি। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, “তোমার এখনো হয়?” আমি হেসে বললাম, “তোমার মার বয়স হয়েছে তবে এখনো অতটা নয়।” তারপর বললাম, “তুমি যে মাঝে মাঝেই দেখো মা’র অনেক পেইন, শুয়ে আছে সেটা এই কারণে।” (ফাইব্রয়েড টিউমার আমার জীবন তীব্র ব্যথাময় করে রেখেছে)।

তারপরই বললাম, “তোমাকে বলেছি মেয়েদের জীবন অনেক কঠিন। কেন তা যত বড় হবে, বুঝবে। তবে এই পিরিয়ড হচ্ছে একটি কারণ। আর সেজন্যই মেয়েদের সব সময় রেসপেক্ট করবে।” আমার কথা শেষ হওয়া মাত্র সে বললো, “আমি জানতাম তুমি এখন এই কথাটি (শেষ বাক্য) বলবে!”

দোকান থেকে কেনা জিনিসের মধ্যে মায়ের প্যাডের প্যাকেট থাকা খুব স্বাভাবিক। কোনো লুকোছাপা নেই। অনেক সময়ই অসুস্থ মা যায় না। বাবার সাথে ছেলে দোকানে যায়, কিনে আনে। মা সকালে একবার একতলায় নামে, রাতে দোতলায় উঠে। দরকারে ছেলে দোতলা থেকে প্যাডের প্যাকেট এনে দেয়। ব্যথার সময় হিটিং প্যাড এনে দেয়। কিছু করতে হবে কি না জিজ্ঞাসা করে। খুব স্বাভাবিক বিষয় নারীর পিরিয়ড।

নাইন্থ গ্রেইডে হেলথ ক্লাসে শরীর বিষয়ে সব জানানো হয়েছে। আমাকে একদিন বললো, “মা ক্লাসে এইডস নিয়ে বলেছে।” ওর অন্যমনস্ক বাবার প্রশ্ন, “এইড নিয়ে কি বলেছ?” দীপ্ত বলেছে, “বাবা এটা হেলথ ক্লাস! এইড না এইডস।” একদিন বললো, স্কুলে প্রেগন্যান্ট মেয়ে দেখেছে! এরপরেও বলেছে! ভাবলাম, এত নামকরা স্কুলেও ……। অনেক আগেই, শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু না বলেও আমি রেইপ, প্রেগন্যান্সি, এর পরিণতি ইত্যাদি বিষয়ে কিভাবে যেন আসল কথাটি বলেছি! পরে নিজেই আশ্চর্য্য হই! জীবনে একটা কথা আমাকে কেউ বলেনি। সেই আমি কি পারি এদেশের বাবা-মায়েদের মত করে বলতে! পারি না। কিন্তু আমার কর্তব্য তো করতে হবে। তাই পুরো না বলেও সব বলি! আসল মেসেজটা জরুরি।

ক’দিন আগে এক বন্ধুর জন্মদিনে বেশ কিছু ক্লাসমেটের বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা থেকে ফিরে বললো, বেশ কয়েকজন স্মোক করছে। শুধু সিগারেট নয়! না তারা সেখানে ছিল না। যারা করছে তাদের নিয়ে কথা হয়েছে সেখানে। কারা কারা ভার্জিনিটি লুজ করেছে সেটাও বলেছে কেউ কেউ! না তারাও সেখানে ছিল না। আমি শুধু ওর দিকে তাকাতেই সে বললো, “আই নো হোয়াট দ্যাট মিন ফ্রম হেলথ ক্লাস।”

আমি শুধু বলেছি, “ইউ গাইজ আর অনলি ফিফটিন!” সে বললো, “মা! আই অ্যাম টেলিং ইউ হোয়াট আই হার্ড। ইটস গুড টু বিলং টু আ কনজারভেটিভ কমিউনিটি।” ভাবলাম, একদিন আলোচনা করতে হবে আবারো, কতটুকু কনজারভেটিভনেস সত্যিই ভালো!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.