নারীর ঠিকানা বদল

girls 2ফেরদৌসি রিতা: ঠিকানা বদল খুববেশি পীড়া দিচ্ছে ইদানিং। মনে পড়ছে জীবনের প্রথম ঠিকানা আমার ছোটবেলার বেড়ে ওঠার বাড়িটির কথা, যার ঠিকানা এ-১২৮, নতুন উপশহর যশোর। ছোট্ট একটি ছিমছাম বাড়ি। কোলাহল আর হই-হুল্লোড়ে ভরা ঘরগুলো। তারই মাঝে আমার বসবাস।

মনে পড়ছে জানালার সেই শিকগুলোর কথা যার প্রত্যকটি শিকে আমার হাত পড়েছে। কখনও শিক মুছতে গিয়ে, আবার কখনও দুটো বেণী ঝুলিয়ে ছোট্ট ছোট্ট চিরকুট পাওয়া ভালোবাসার মানুষের অপেক্ষায় শিক ধরে দাঁড়িয়ে থেকে।

বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট বারান্দা আর পেছন দিকে খোলা পাকা উঠোন। ওটাই ছিলো আমার সবচেয়ে পছন্দের একটি ঠিকানা। ঠিক ঈদের আগের দিন আমার ঠিকানা জুড়ে কি আনন্দটাই না হতো।

আমার বাবার বাজার করে আনা, ঘরের প্রত্যেকটি খাটে নতুন সাদা ধবধবে চাদর বিছানো। একই রঙ্গের পর্দা ঝোলানো জানালাগুলোতেও। সাদা ধবধবে জানালার পর্দা আর চাদরের আবরণে যেমন করে বাড়িটি ঢাকা পড়তো, ঠিক তেমন করে আমার বাবাও একদিন ঠিকানা বদল করে চলে গেলো আরেক ঠিকানায়।

আমার স্কুল জীবন কেটেছে প্রায় এক রকম মাস্তানী করেই। পাড়ায় সকলের নেতার মতোন ছিলাম আমি। নিরাপত্তার খাতিরে মায়েরা মেয়েদের স্কুলে আমার সাথেই পাঠাতো। পাড়ার আশেপাশের মাস্তানেরা আমার উপস্থিতিতে কাউকে ইভটিজিং করতে সাহস পেতো না। তখন অবশ্য এ শব্দটা আমরা জানতামই না। কিন্তু বখাটেরা সবসময়ই ছিল। কলার জাপটে ধরে মেরেছি অনেককে। তার পেছনের সাহস ছিলো ঐ ১২৮ নম্বর বাড়িটার ঠিকানা। বাবাকে সম্মান করার কারণেই হয়তো কখনো কোন বিপদ হয়নি আমার। জানতো সবাই আমি ঐ নম্বরের বাড়ির মেয়ে।

এই দস্যিপনা ঘুচে গেলো আমার স্কুল শেষ করার পরপরই………………..

প্রথম ঠিকানা বদল হলো আমার। বদল হলো আমার সামগ্রিক জীবন প্রক্রিয়া। আমি হয়ে উঠলাম বালিকা থেকে কিশোরী । আমি তখন কলেজ পড়ুয়া । যশোরের পাট চুকিয়ে আমি চলে এলাম ঢাকায়। আমার নতুন ঠিকানা হলো ১/ডি, ৮-২৭ মিরপুর। ঠিকানা বদলের যন্ত্রণা আমাকে পীড়া দিতে শুরু করলো। প্রায় বছর খানেক আমার প্রিয় ঠিকানায় হলুদ খামে চিঠি লিখতাম- কখনও মায়ের কাছে, কখনও বোনের আবার কখনও প্রিয় ভাইগুলোর কাছে । হলুদ খামে ঠিকানা লেখার আনন্দ’র কারণ আমি আজ ব্যাখা করতে পারি। মিরপুর এর ঠিকানা আমার জীবনে টিকে থাকার সংগ্রামকে আরো বেশি সহায়তা করলো। কিভাবে ঘর থেকে বের হয়ে অন্যের সাথে একাত্ব হয়ে বসবাস করতে হয় তার প্রাথমিক মহড়া আমি পেলাম ওখান থেকেই।

১২৮ নম্বরের ঠিকানার পছন্দগুলো একে একে সব মুছে যেতে লাগলো। আমার পছন্দের জানালার শিক, আমার পছন্দের সাদা ধবধবে চাদর, আমার পছন্দের ছোট্ট উঠোনে বিছিয়ে রাখা পাটি। সব, সব কিছু। এই স….ও….ব এর মধ্যে আমার প্রিয় খাবারগুলোও। মেয়েদের বড় অদ্ভুত জীবন ঠিকানা বদলের সাথে সাথে তার প্রিয় ইচ্ছেগুলো বদল হতে থাকে। তার খাদ্য তালিকা থেকে অনেক প্রিয় খাবার বাদ পড়তে থাকে, যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন খাবার যা সে কখনও তার মুখে তুলে খায়নি ।

ফের হলো ঠিকানা বদল। ঠিক বছর খানেক এর মাথায় । এবারে আমার ঠিকানা হলো আমার বোনের বাসা। সেখানে থেকে শিখলাম অনেক না জানা কথা। মেয়ে-ছেলের পার্থক্য। আত্বীয়তা মজবুত করার কৌশল। ঠিকানা বদলের এ পর্যায়ে আমি বেশ কটি বছর কাটালাম  ইডেল কলেজ হোষ্টেলে। কিন্তু তখন পর্যন্ত আমার স্থায়ী ঠিকানা ছিলো আমার বাবার বাড়ি। আর অস্থায়ী ঠিকানা আমার বোনের বাড়ি। কিন্তু ইডেল কলেজের ঐ রুমটাকে আমার বড় আপন লাগতো। মনে হতো এটা আমার নামে পাওয়া একমাত্র ঠিকানা। একান্তই আমার, নিজের। খুব কাছের।

আমার বর্তমান ঠিকানা বকশিবাজার। এটাই নাকি আমার স্থায়ী ঠিকানা। কারন আমার সমস্ত কাগজ-পত্রে স্থায়ী ঠিকানায় পরিবর্তন  আনা হয়েছে। এটা আমার স্বামীর ঠিকানা। মেয়েরা এটা ভাবতে ভালোবাসে। স্বামীর ঠিকানায় বসবাস। এই বাড়িটিতে আমি থাকি। আমার কিছু নতুন ভালোলাগা তৈরী হয়েছে, পুরাতন মন্দলাগাগুলো ভালোলাগায় রুপান্তরিত হয়েছে। পুরাতন ভালোলাগাগুলো মন্দ লাগতে শুরু করেছে। আমি এখন শান্তশিষ্ট। আমি এখন বুঝে-শুনে কথা বলি। আমি এখন আমার প্রথম ঠিকানার মানুষগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছি। আমি এখন স….ও….ব খাই। আমার জিভে এখন অনেক স্বাদ। আমার কোন ভালো লাগা মন্দ লাগা নেই। আমার কোন ইচ্ছে-অনিচ্ছে নেই। আমার কেবল আছে অন্যের ভালো লাগাকে গুরুত্ব দেয়া। কারণ আমি এখন আপাদ-মস্তক তথাকথিত একজন নারী হয়ে উঠেছি।

এ ব্লক-১২৮ নম্বর বাড়িটিতে আজ আর আমার কোন হই-হুল্লোড় নেই। কোলাহল নেই। যন্ত্রণা নেই। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে নতুন কিছু মুখ। আমার ঠিকানা বদল হয়েছে। এদেশের সকল নারীরই ঠিকানা বদল হয়। তাতে কারো কিছু যায় আসে না। আমার আসে। আমি আমার ঠিকানা আশা করতেই পারি।

আমাদের ঠিকানা এভাবেই বদল হয়। প্রথমে বাবার ঠিকানাকে আগলে ধরে থাকি বহুবছর, তারপর স্বামীর ঠিকানাকে সুখি সুখি মনে ধারণ করি আরো কিছু বছর, তারপর অপেক্ষা করি ছেলে সন্তানের দিকে সেকি বরণ করে নিবে আমায় তার নতুন ঠিকানাটিতে???

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.