‘গার্লস গ্যাং’ লিডার টুপসির মুখোমুখি

Fightingউইমেন চ্যাপ্টার: এসবি টুপসি, যার ফেসবুক নাম স্বাপ্নিক টুপসি, ছোটখাটো গড়নের একটি মেয়ে বিশাল এক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন।  Girls’ Gang নামে একটি ছোট্ট সংগঠন দাঁড় করিয়েছেন তিনি তার কিছু কাছের বন্ধুদের নিয়ে। ঘরে-বাইরে নারীরা আক্রমণের শিকার হলে প্রাথমিক আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর জন্যে তারা সম্প্রতি তিনদিনের একটি কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে। ১৩জন কিশোরী-তরুণীকে এই কৌশল শিখিয়েছেন কয়েকজন ক্যারাটে শিক্ষক এবং টুপসি নিজেও।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে উইমেন চ্যাপ্টার মুখোমুখি হয়েছিল স্বয়ং টুপসির।

গার্লস গ্যাং কেন? মানে এটা করার পেছনে কোনও স্বপ্ন বা উদ্দেশ্য কাজ করেছে?

টুপসি: সত্যি বলতে কি, এরকম কোনও স্বপ্ন আমার আগে থেকে ছিল না। ছোটবেলা থেকে তথাকথিত সুশীল ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হয়েছি। মেকআপ করে কালার টেলিভিশন সেজে বান্ধবীদের নিয়ে রেস্টুরেন্টে রেস্টুরেন্টে হইচই করা কিংবা মা-বাবার লুতুপুতু টাইপের মেয়ে হয়ে খাওয়া-ঘুমানো কিংবা কারো পুশিক্যাট প্রেমিকা হওয়ার কথা ছিল। সমাজে যেটা বেশ অ্যাকসেপ্টেড। কিন্তু হয়ে গেলাম ‘গার্লস গ্যাং’ সংগঠক। উদ্দেশ্যের কথা যদি বলেন, সেটা হচ্ছে মুক্তি। আমি আমার দিদিকে দেখেছি বখাটের উৎপাতে বাসায় ফিরে কাঁদতে। একসময় আমাকেও বিকেলের মধ্যেই বাসায় ফিরতে কড়া নির্দেশ জারি ছিল মা-বাবার।

কাছের বান্ধবী তার শ্লীলতাহানীর ঘটনা বলেছে, তার দীর্ঘশ্বাসে কষ্ট অনুভব করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে শাটল ট্রেনে ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছি। আপনজনকে দেখেছি বখাটেদের হাত থেকে একটি মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার শিকার হতে, সেই মেয়েকেও দেখেছি সামাজিক সম্মানের কথা বলে এড়িয়ে যেতে।

সাংবাদিকতায় পড়ার সুবাদে সমাজ সচেতন হয়েছি, প্রতিদিন পত্রিকায় ধর্ষণের খবর আমাকে ভাবিয়েছে। ২০১২ সালে বান্ধবীদের আর বড় বোনদের ডেকে ‘প্রতিবাদী নারী ঐক্য’ নামে একটা পাঠচক্র করার চেষ্টা করলাম। একসময় দেখি তারাও সেই লুতুপুতু। কেউ কেউ আমাকে বাম দলের এজেন্ট ভেবে বসলো। কেউ কেউ নৈরাশ্যবাদী উপদেশ দিয়ে আমাকে ‘গুড বাই’ জানালো।

আমি হার মানতে চাইনি। অনেকের অনেক মন্তব্য নিয়ে শুরু হলো আমার থিসিস বনাম অ্যান্টি থিসিস। শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে এলাম যে, যতদিন আত্মবিশ্বাসী আর লড়াকু মেয়েদের গ্যাং না হচ্ছে, ততদিন মুক্তি নেই। এভাবেই শুরু গার্লস গ্যাং সংগঠিত করার কাজ।

আমাদের দেশে এরকম একটি গ্যাং করার প্রয়োজন কেন দেখা দিল?

টুপসি: আমাদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি জানি না। ‘গ্যাং’ শব্দটা দেখে অনেকেই আগে যে চিন্তাটি করেন, সেটা হল গুন্ডাদের দল। মেয়েদের ক্ষেত্রে নামটা শুনে অনেকের চোখ কপালে উঠে যায়। গ্যাং শব্দটা দিয়ে প্রথমত আমরা একটা দর্শনকে মেয়েদের সামনে হাজির করতে চাই। সেটা হলো, রাফ অ্যান্ড টাফ দলবদ্ধতার চর্চা করা। যেটা ছেলেরা করে। একসাথে আড্ডা দেয়, একসাথে থাকে, একসাথে মারামারি করে। বন্ধুর জন্য বন্ধু মারামারি করতে রাত-বিরাতেও বেরিয়ে যায়।

কিন্তু মেয়েদের দেখেন। বাসে একটা মেয়েকে কয়েকজন লোক কমেন্ট করলে অন্য মেয়েরা তাকিয়ে দেখে। একযোগে উঠে মারতে যায় না। দ্বিতীয়ত, গার্লস গ্যাং একটা প্রতিরোধ বাহিনী। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ পুরুষের হাতে গেছে যখন পুরুষ নারীকে ভয়ের অদৃশ্য শেকলে বেঁধে ফেলতে পেরেছে। সম্মানের ভয়, মৃত্যুর ভয়, পরকালের ভয়… শুধুই ভয়ের সংস্কৃতি।

খবরের কাগজ খুললেই ধর্ষণের খবর। তাও কারা কতো লোমহর্ষক করে লিখতে পারে সেই প্রতিযোগিতা। কোথাও মেয়েদের প্রতিরোধের খবর আসে না। পুলিশের হেফাজতে ইয়াসমিনের ধর্ষণের খবর, ছাত্রনেতার ধর্ষণে সেঞ্চুরির খবর, বাঁধনের বস্ত্রহরণ থেকে শুরু করে পহেলা বৈশাখ কিংবা গারো মেয়েটির ধর্ষণের খবর। আগে অনেক দিন পরপর, এরপর কিছুদিন পরপর, এখন প্রতিদিন পাই নির্যাতন-নিপীড়নের খবর।

এসব খবর ভিতু মেয়েদের আর তাদের বাবা-মায়েদের আরও ভিতু করছে। এই ভয়ের সংস্কৃতিটা ভাঙার জন্যে মেয়েদের একটা প্রতিরোধ বাহিনী দরকার। প্রতিরোধের খবর যত প্রচার হবে অপরাধীদের মনে ভয় আসা শুরু করবে। একটা মেয়েকে টিজ করার আগে একশবার ভাববে। তৃতীয়ত, গার্লস গ্যাং একটা আন্দোলন। আমরা বাংলাদেশের সব মেয়েকে গড়তে চাই তারা যেন নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই নিতে শেখে।

কিছুদিন আগে দেখলাম, চাচার হাতে একটি মেয়ে ধর্ষিত, দুদিন আগে দেখলাম মসজিদে হুজুরের কাছে সিপারা পড়তে গিয়ে একটি মেয়ে ধর্ষিত। এই যখন অবস্থা, পুলিশ বা সরকার কি করে ঘরে ঘরে গিয়ে মেয়েদের নিরাপত্তা দেবে? মিছিলে নেমে ‘সরকার জবাব চাই’ বলে স্লোগান তুলে কি জবাব বেরিয়ে আসবে?

পুলিশের কাছে ধর্ষণের শিকার মেয়েরা বিচার পায় না, তদন্তের নামে ফাইলচাপা থাকে অপরাধ, অথবা ঘুষ খেয়ে চার্জশিটে আসামির অব্যাহতি। এরা নিজের শৌর্যের প্রমাণ দেয় কেবল দুর্বলের ওপর হামলা করে। তাই তো টিএসসি’র ঘটনার বিচার চাইতে গিয়ে ছাত্রীরাও হলো পুলিশের লাঞ্ছনার শিকার। গতকাল খবরে দেখলাম কারাগারে বন্দী মেয়েদের যৌনকর্মে ব্যবহার করা হয়। আসলে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাওয়াটাই অরণ্যে রোদন।

তাই আমরা বলি, আগে আত্মরক্ষা ও নিজস্ব প্রতিরোধ, তারপর বিচার দাবি। আন্দোলন আপনাকে বিচার দেবে, বিচার আপনার সম্ভ্রম ফিরিয়ে দেবে না। আর নিজেরা আগে প্রতিরোধে না নেমে সামাজিক প্রতিরোধ আশা করা যায় না। কারণ, ধর্র্ষক বা নিপীড়নকারীও কারো না কারো ভাই বা ছেলে।

Swapnik 2
এসবি টুপসি

এই গ্যাং কতটুকু সহায়ক হবে বলে মনে হয় আপনার?

টুপসি: আজকের এই অবস্থার জন্য নিঃসন্দেহে সমাজ ও রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না। নারীনির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনাগুলো এতদিন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। নারীনির্যাতন ও নিপীড়নের ইস্যু এতদিন কিছু নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের নিছক মানববন্ধন ও সেমিনারের কর্মসূচি হয়েই ছিল। জাস্টিস ডিলেইড মিনস জাস্টিস ডিনাইড। তাই অপরাধীরা আস্কারা পেয়ে আরও অপরাধ সংগঠিত করার সাহস পেয়েছে। অন্যায় সহ্য করা আরেক অন্যায়। আগের অপরাধগুলোর বিচার প্রশ্নে জাতি চুপ থেকেছে, প্রকৃতির নিয়মে এখন তার মাশুল গুনতে হচ্ছে। এখন মেয়ে সামান্য দেরি করলেই মায়েরা আতঙ্কে থাকে সর্বনাশ হলো কিনা।

সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলতে গেলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এখন কতটুকু সহায়ক হবে ভাবারই অবকাশ নেই। লড়াইটাই মুখ্য। সহায়ক হবার মতো যতখানি কাজ দরকার, তা তো এতোদিনে হয়নি। কাজ যত বেশি বেশি করা যায়, তত তাড়াতাড়ি সহায়ক হবে। তবে আমরা কিছু পয়েন্ট চিহ্নিত করেছি। নারী ইস্যুতে আন্দোলন প্রশ্নে আমাদের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আছে। নারী প্রশ্নে আমাদের দেশের অনেক আইনের সংশোধন দরকার, অনেক আইনের বাস্তবায়ন নেই। তাই আমরা দল-মত-সম্প্রদায়ের উর্ধ্বে উঠে দেশের সব নারী সংগঠনকে একটি জাতীয় পর্যায়ের ঐক্যজোট গড়ার আহবান জানাই এবং সুনির্দিষ্ট দাবিমালার ভিত্তিতে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ার আহবান জানাই।

 তিনদিনের কর্মশালায় কতটা সাড়া পেলেন? মেয়েদের স্বত:স্ফূর্ততা কেমন ছিল? অভিভাবকরাই বা কিভাবে নিচ্ছেন বিষয়টাকে?

টুপসি: মেয়েদের আত্মরক্ষা বিষয়ক কর্মশালাটা এই প্রথম। আশা ছিল অনেক মেয়েকে আত্মরক্ষার কলা-কৌশল শেখাতে পারব। যেহেতু আমরা কোনও রকম ফি নিইনি। এই প্রোগ্রামটা করার জন্য গার্লস গ্যাং কারো কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতাও নেয়নি। তার ওপর দু মাস ধরে দৌড়াদৌড়ি করেছি স্কুলে স্কুলে, মাঠের জন্য। ব্যর্থ হয়েছি। কর্মব্যস্ত প্রশিক্ষকদের কাছে গেছি সময় চাইতে, তারা আবার সকাল ছাড়া সময় দিতে পারেন না। এরপর গেছি হল ভাড়া করতে। সকালে আবার তিনদিন একসাথে হল পাই না। অতিথিদের সঙ্গে যোগাযোগেরও বিষয় ছিল। ব্যানার, সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট, সাউন্ড সিস্টেম সবকিছুতে খরচ আর পরিশ্রম দুটোই অনেক হয়েছে। কিন্তু এসেছে মাত্র চার ভাগের এক ভাগ। যারা রেজিস্ট্রেশন করেছে তারা অনেকেই আসেনি। কর্মশালার আগের দিন ফোন করেছি। কেউ বলেছে ক্লাস, কেউ বলেছে, কাজ আছে। আমরা এমনও বলেছি, ‘আপু আমরা এরপর এত খরচ যুগিয়ে এরকম একটা কর্মশালা আর কবে করতে পারবো ঠিক নেই, তিনদিন না হয় আমাদের দিকে চেয়েই একটু কষ্ট করেন’। তারপরেও আসেনি।

অথচ এরাই ফেসবুকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলে। তবে আমার যেহেতু আগেও এই অভিজ্ঞতা আছে, তাই হতাশ হইনি। সংগঠন করা তো এত সোজা না। তাই কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটিকে গুরুত্ব দিয়েছি। বরং আরও যত্ন সহকারে মেয়েদের আত্মরক্ষার কলা শেখাতে পেরেছি, এটাই বড় কথা। প্রোগ্রামের খবর মিডিয়ায় আসার সঙ্গে সঙ্গে এখন অনেক সাড়া পাচ্ছি। অনেক মেয়ে যারা আসেনি, পরে কখন করবো জানতে চাইছে। ঢাকা থেকেও কেউ কেউ আমাদের পেজে মেসেজ পাঠাচ্ছেন সারা বাংলাদেশে যাতে এটা ছড়িয়ে দিই। কেউ কেউ আমাদের দ্বারা ইন্সপায়ার্ড হয়ে নিজের এলাকার মেয়েদের কারাতে ট্রেইনআপ করার পরিকল্পনা শেয়ার করছে। মিডিয়ায় আমাদের বক্তব্য শুনে অভিভাবকরাও আমাদের সমর্থন জানাচ্ছেন।

Counter Hit 2এক প্রশিক্ষণার্থীর বাবা বলেছেন, ‘আমার মেয়েকে তোমাদের সদস্য করে নাও। আমরা বলেছি, তাহলে মেয়েকে নিয়মিত কারাতে শিখে বেল্ট অর্জন করতে বলেন।’ আমাদের বক্তব্য তো খুব ক্লিয়ার। সবার আগে আত্মরক্ষা ও নিজস্ব প্রতিরোধ। একজন নারীকবি লিখেছেন, ‘টুপসি, আগামীবার আমি ও আমার মেয়ে কর্মশালায় আগে নাম দেব’। কেউ কেউ আমাদের স্পন্সর করার আগ্রহও প্রকাশ করছে।

তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে পুরুষতন্ত্র আমাদের শক্তি হিসেবে কাউন্ট করতে শুরু করেছে। আগে শুধু চট্টগ্রাম থেকে গালাগালির মেসেজ আসত, হুমকি আসত। এখন আখেরাতের নসিহত টাইপ মেসেজ। তাও আবার শুধু চট্টগ্রাম নয়, সিলেট রাজশাহী, নোয়াখালীর ফেইক আইডি থেকেও আসছে। এরা আসলে ভয় পেতে শুরু করেছে। কুকুর ভয় পেয়ে গেলে বেশি ঘেউঘেউ করে।

ভবিষ্যতে আরও কী কী করার ইচ্ছে আছে আপনার?  আপনার কী মনে হয় যে, এই গার্লস গ্যাং এর টিমওয়ার্ক শুধুমাত্র আত্মরক্ষার কৌশল শিক্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি একে আরও বিস্তৃত করার ইচ্ছে আছে?

টুপসি: আমাদের অন্যতম প্রধান প্রজেক্ট হচ্ছে সাহস যুগিয়ে কলাকৌশল শিখিয়ে মেয়েদেরকে আত্মরক্ষায় সক্ষম করা। এই প্রজেক্ট আমরা স্কুল পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। তবে আমাদের টিমওয়ার্ক অ্যাকশনধর্মী হবে। আমরা কর্মশালা আয়োজনের আগেই অলরেডি দুয়েকটি জায়গায় ইভটিজার শায়েস্তা করেছি। এবারের কর্মশালার সমাপনী দিনে আমরা দুজন সফল নারী ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা জানিয়েছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য মেয়েদের সামনে তাদের হাজির করে আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়া। আগামীতে আরও অনেক কৃতি নারীকে সম্মাননা জানাবো। আমাদের আরও কিছু প্রজেক্ট থাকবে মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য এবং নিজেদের ভেতরকার ঐক্য মজবুত করার জন্য। যেমন, নারী বিষয়ক ডকুমেন্টারি ও ফিল্ম শো, স্ট্রিট মিউজিক শো, কবিতা-কার্টুন ও নাটকের অনুষ্ঠান ইত্যাদি। আমি নিজেও যেহেতু নাচ করি এবং বেহালা বাজাই, আমাকেও পারফর্ম করতে দেখবেন। একটা সুখবর দিয়ে রাখি, খুব শিগগিরই আমরা মেয়েদের একটা ব্যান্ড গড়তে যাচ্ছি। সদস্য খুঁজছি।

মেয়েরা শারীরিকভাবে দুর্বল, এটা আপনি মানেন?

টুপসি: মেয়েরা শারীরিকভাবে দুর্বল, কথাটির তিনটি অংশ। ‘মেয়েরা’, ‘শারীরিকভাবে’ ও ‘দুর্বল’। ১) পৃথিবীর অনেক দেশে মেয়েদের হাতে ছেলেরা, এমনকি আমাদের কারাতে জানা মেয়েদের হাতেও ছেলেরা পড়ে পড়ে মার খায়। ২)মানসিকভাবে শক্তিশালী হওয়াটা আগে জরুরি। ৩)বিশেষত্ব মানে দুর্বলতা নয়।

পাল্টা আঘাতই কী নারী নির্যাতন কমানোর অন্যতম উপায় হতে পারে? নাকি আমাদের সামাজিক এবং পারিবারিক শিক্ষায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন? নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না এলে নির্যাতন কমবে বলে আপনি মনে করেন?

টুপসি: পালটা আঘাত মানে তো আঘাতের জবাবে আঘাত। আমরা কোনও আঘাতের শিকার হবার পক্ষেই না। আমরা বারবার বলছি আত্মরক্ষার কলা শেখো। আগে আত্মরক্ষা ও নিজস্ব প্রতিরোধ। তারপর বিচার। বিচার সম্ভ্রম ফিরিয়ে দিতে পারে না। নারীনির্যাতন কত প্রকার ও কি কি, সেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তথাকথিত শিক্ষিতরাও করে। অনেক পুরুষ যেমন পুরুষতান্ত্রিক নন, তেমনি অনেক মা-মাসী, খালারা নারী হয়েও পুরুষতন্ত্রকে বহন করেন। তাই শাশুড়ির হাতে পুত্রবধু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। সুতরাং পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষায় অবশ্যই পরিবর্তন দরকার। এই বিষয়ে আমাদের দ্বিমত নেই। আমি ছোটবেলায় ফুলকি স্কুলে পড়েছি, সেখানকার উদাহরণ দিতে পারি। ওখানে প্রথম শ্রেণি থেকেই মানবিকতা পড়ানো হতো। ছেলে মেয়েদের একসাথে বসানো হতো, যাতে একটা ছেলে একটা মেয়েকে বা একটা মেয়ে একটা ছেলেকে আলাদা ভাবতে না শেখে। দেশের স্কুলগুলোতে রাতারাতি আপনি পরিবর্তন আনতে পারবেন না। টিচারদের মানসিকতা আগে উন্নত করতে হবে।

পরিমল জয়ধর আছে সেখানেও। কয়দিন আগে ঢাকার এক স্কুলের পিওন ঐ স্কুলের এক বাচ্চাকে ধর্ষণ করল, প্রিন্সিপ্যাল বলল মেয়েটার পোশাকের সমস্যা ছিল। একদিন আগেও ঢাকায় ইসলাম শিক্ষার প্রশ্নে মেয়েদের পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে বলে খবর দেখলাম। দেশে আলেম সমাজ ধর্মের ব্যাপারে এত সচেতন, কাউকে বলতে শুনলাম না, পবিত্র কোরানের সুরা নূরে পুরুষদেরকেও দৃষ্টি ও যৌনতার ব্যাপারে সাবধান করা হয়েছে। উল্টা দেখা গেল, তারা ধর্ষণের শাস্তি নিয়ে ওয়াজ না করে উল্টা মেয়েদেরকেই দায়ী করেন। সুতরাং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তো অবশ্যই দরকার। কিন্তু এটার জন্য চাই সামাজিক বিপ্লব। যা না হলে নারীবান্ধব শিল্প-সংস্কৃতিও তৈরি হবে না, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন হবে না।

গার্লস গ্যাং নানা ব্যানারে থেকে রাজপথে সেই আওয়াজটা তোলার চেষ্টা করছে। আমাদের আন্দোলনগুলো শুধু বিচার পাওয়ার লক্ষ্যে হলে হবে না, সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে হবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যতক্ষণ সেটা না হচ্ছে ততক্ষণ কি তাহলে ইভটিজিং, শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণ চলবে? তাহলে আত্মরক্ষা ও নিজস্ব প্রতিরোধ কি জরুরি নয়? আর বর্তমান শিক্ষাব্যাবস্থায় স্কুলে শারীরিক শিক্ষা বলতে একটা সাবজেক্ট আছে, সেখানে কারাতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

আপনি একজন নারী। এ নিয়ে আপনি কী কখনও অনুশোচনা, অসহায় বোধ করেন? নাকি গর্ববোধ করেন?

টুপসি: হাহাহা… আমি স্রষ্টাকে দুবার করে ধন্যবাদ জানাই। প্রথমবার এজন্য যে, তিনি আমাকে নারী করে সৃষ্টি করেছেন। আমি কখনও ধর্ষণের পাপে লিপ্ত হব না। আর দ্বিতীয়বার এজন্য যে, নারীদের নেতৃত্ব দেয়ার এবং শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই করার সুযোগ দিয়েছেন বলে।

ধন্যবাদ আপনাকে

টুপসি: উইমেন চ্যাপ্টারকেও ধন্যবাদ গার্লস গ্যাং ও আমাকে কিছু বলতে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

শেয়ার করুন:
  • 37
  •  
  •  
  •  
  •  
    37
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.