মেয়েটির কাছে আমাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত

Kalo haatসুমন্দভাষিণী: রাজধানীতে একজন কর্মজীবী মেয়েকে গণধর্ষণের ঘটনায় এখন তোলপাড় চলছে। প্রতিদিনই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হচ্ছে এই ঘটনার।

মেয়েটি যে সম্প্রদায়ের তারাও নেমে এসেছে রাস্তায়। গতকালই দেখলাম ওই সম্প্রদায়ের তরুণরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, তাদের কমিউনিটিতে ‘ধর্ষণ’ বলে কোনো শব্দ কোনকালে ছিল না। তাদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের তারা ততটাই সম্মানের চোখে দেখে। কিন্তু আমরা বাঙালীরা তাদের সেই বিশ্বাসেই কেবল আঘাত করিনি, তাদের ‘মা’কেও অসম্মানিত করেছি।

অনেক ভেবেছি ওই তরুণের এই কথাগুলো নিয়ে। কতটা গভীর দু:খবোধ থেকে কথাগুলো বেরুতে পারে ওদের মুখ থেকে। এমন নিরপরাধ, সহজ-সরল মানুষগুলো আজ ভীষণভাবে ধাক্কা খেয়েছে।

ওরা বিশ্বাসী বলেই কিন্তু আমরা গৃহকর্মী হিসেবে সবসময় ওদের ওই অঞ্চলের লোক খুঁজি। পার্লারগুলোতে ওরা দাপটের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। ওদের চোখেমুখে কখনও অপরাধবোধ দেখিনা কখনও।

আমাদের একজন সিনিয়র সাংবাদিক ভাইয়ের বাসায় একবার একটি মেয়ে সহায়কের কাজ করতে এসেছিল, যে কিনা এসএসসি দিয়েছে সেবার। তিন মাস বেকার বসে থাকবে, তার চেয়ে এই তিনমাস কাজ করলে তার কিছুটা উপকার হবে ভেবে সে এই গৃহকর্মটাকে চাকরি হিসেবে নিয়েছিল। এবং সেভাবেই সে কাজ করে চলে গেছে। টপস পরতো, স্কার্ট পরতো, প্যান্টও পরতো। স্মার্ট মেয়ে, অন্যের বাসায় যে কাজকে আমরা অবহেলার চোখে দেখি, সেই কাজকেই ভালবেসে করতে এসেছে।

আমি শুনেছি, এতো নিষ্ঠার সাথে সে তার দায়িত্ব পালন করতো যে, দুটি ছোট বাচ্চা নিয়ে চাকরিজীবী ভাই-ভাবীকে কোনো চিন্তাও করতে হয়নি ওই কয়দিন।

এই ভরসাটাই কিন্তু আমরা পাই না আমাদের অন্য গৃহকর্মীদের কাছ থেকে। সবসময় অভাব-অভিযোগ লেগেই থাকে এসব গৃহকর্মী নিয়ে। অথচ একই দেশে, একই অঞ্চলে থেকেও শুধুমাত্র জীবনযাপনের পদ্ধতি, সামাজিক ব্যবস্থা, পারিবারিক শিক্ষা সবমিলিয়েই এই সম্প্রদায়টাকে অন্য একটি পর্যায়ে উন্নীত করে। তাই যে ঘটনাটা ঘটলো, এটা শুধু যে শারীরিক ধর্ষণ হলো, তাই নয়, এটা ওদের সামাজিক কাঠামোর ওপরও এক বিশাল আঘাত, যার ক্ষতি আরও সুদূরপ্রসারী।

আরও চিন্তা করছি, কতটা মানসিক জোর থাকলেই কেবল একটি মেয়ে এমন একটি অপরাধের শিকার হওয়ার পরও, থানার হয়রানি মাথায় নিয়েও হাল ছাড়েনি। কতটা মনের জোর, এবং তার বিশ্বাস আছে এই দেশের আইন ব্যবস্থার ওপর। যা আমাদের নেই। মেয়েটি বিশ্বাস করে, তার সাথে যা হয়েছে, সেটা জঘণ্য অপরাধ এবং এই অপরাধের শাস্তি পেতে হবে অপরাধীদের।

আমরা অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন কিন্তু এতো মানসিক শক্তিসম্পন্ন নই। আমাদের মনোবল আগেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আমাদের লোকলজ্জার ভয়, যা আমাদের গেলানো হয়েছে শিক্ষার নামে, তার রাহু থেকে মুক্তি পেতেই আমাদের লেগে যায় অনেক সময়। কিন্তু এই মেয়েটি জানে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত, এবং সে সেটাই করেছে। যদিও তাকে এজন্য কম হেনস্তার শিকার হতে হয়নি, তারপরও বলবো, সে শেষপর্যন্ত তার বুদ্ধি এবং শক্তি দুটোরই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে সফলভাবে। সে প্রমাণ করেছে, ধর্ষণের শিকার হলে মেয়েটির লজ্জার বা সম্ভ্রমহানি হয় না, হওয়া উচিতও না। সম্ভ্রম বা লজ্জা যদি থেকে থাকে, তাহলে তা হবে অপরাধীর।

এখন উচিত যে দুজনকে ধরে আনা হয়েছে ‘ধর্ষক’ বলে, তাদের সামনে মেয়েটিকে হাজির করা। মেয়েটির সাথে যেহেতু একজন কথাও হয়েছিল এর আগে, মেয়েটিই সনাক্ত করতে পারবে। সেই ব্যবস্থা করা হোক।

আর শেষপর্যন্ত সনাক্ত হলে আমরা এই ঘটনার কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যেন আরেকটি ঘটনাও না ঘটে এমন, যেন এই শাস্তির মধ্য দিয়েই এই সম্প্রদায়ের হারানোর বিশ্বাসটুকু সামান্য হলেও আমরা ফিরিয়ে দিতে পারি। আর সেইসাথে প্রয়োজন মেয়েটিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া। সেটা দেবে রাষ্ট্র। একটা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব নিরাপত্তা দেয়ার, একটা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিক সমান, এর যথার্থতা প্রমাণ করা।

এই ঘটনায় যে মানসিক ক্ষতি হয়েছে মেয়েটির, তা হয়তো আমরা কখনই, কোনকিছু দিয়েও পূরণ করতে পারবো না, কিন্তু ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে খানিকটা পাপ লাঘব তো করতে পারবো। আর ওকে দেখে অন্য মেয়েরাও সাহসী হবে পদক্ষেপ নিতে, সেটাই বা কম কীসে!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.