নারীতে-পুরুষে রুচির ব্যবধান কি এতোটাই?

Laily
সালেহা ইয়াসমীন লাইলী, সাংবাদিক

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: মিটিংয়ে থাকতে হবে বলে তাড়াহুড়া করে কোনরকমে গুছিয়ে নিয়ে লম্বা পায়ে হাঁটা দিয়েছি। শুধু খেয়াল করছি কোন খালি রিক্সা পাই কিনা। কিছুদূর যাওয়ার পর খামার বাড়ির সামনে কলেজ পড়ুয়া চারটি মেয়ে আমার পথের প্রায় পুরোটা দখল করে এমন ধীরে ধীরে হাঁটছিল যে, আমার গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে যাচ্ছিল। আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম সময়ের কথা চিন্তা করে।

সরে যেতে বলব ভাবছি হঠাৎ মেয়েরা চিৎকার করে দৌড়ে আমার পিছনে লুকালো। আমি কিছুটা হতবাক ও কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে সামনের দিকে তাকালাম। দেখলাম, একটা দিগম্বর পাগল রাস্তার উল্টো দিক থেকে আনমনে এগিয়ে আসছে। আমি চোখ ফিরিয়ে মেয়েদের দিকে তাকালাম। সবগুলো মেয়ে চোখ বন্ধ করে শুধু চিৎকার করছে তো করছে। কেউ কেউ আবার আমাকে পিছন থেকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। পথচারিরা চিৎকার শুনে জড়ো হয়ে হাসাহাসি করছে। আমার চেনা-জানাদের কেউ কেউ একটু মুচকি হেসে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল।

আমি মেয়েদের স্বাভাবিক হয়ে পথ চলতে বললাম। তাদের আশ্বস্তও করলাম। এর মধ্যে খানিকটা দেরী হয়ে গেছে। তবুও মেয়েদের সাথে সাথেই হাঁটতে থাকলাম। তারপর মিটিং শেষ করে ফিরতি পথে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম।

হঠাৎ দোকানের বেঞ্চে  বসা এক লোক বলে ফেলল, ম্যাডাম, সকালে আপনার সামনে নাকি দিগম্বর পাগলটা কলেজের মেয়েদের জড়িয়ে ধরেছিল?

চা বিক্রেতা ছেলেটি চা বানাতে বানাতে মাথা নিচু করেই বলছিল, শুধু জড়িয়ে ধরা নয়, একটা মেয়েকে নাকি কিসও করেছে!

এবার আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না।

ধমক দিয়ে বললাম, আপনারা কি বলছেন এসব? যত্তসব!

কেউ কি দেখেছেন?

ধমক খেয়ে চায়ের দুইটা কাপ পড়ে ভেঙ্গে গেল।

কিন্তু বেঞ্চে বসা লোকটি দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে বলল, আমরা দেখি নাই, তবে শুনেছি। আপনার সামনেই নাকি জড়িয়ে ধরেছিল। আপনি নিজেই নাকি তাদের ছাড়িয়ে নিয়েছেন?

খুব ইচ্ছে করছিল দাঁত কেলানো লোকটার দাঁতগুলো চড় মেরে ফেলে দিতে। হাতও নিশপিশ করছিল। তবুও গুটিয়ে নিয়ে চলে এলাম।

পৌরবাজার এলাকায় আসতে আর একটা দৃশ্য চোখে পড়ল।

মৌসুমী হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রৌঢ়া এক পাগলী। দীর্ঘ বছর ধরে পাগলী এই এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। খিদা লাগলে হোটেলের সামনে দাঁড়ায়। কেউ কিছু খেতে দিলে খেয়ে নিয়ে আবার ঘুরতে থাকে। ছেঁড়া শাড়ির ফাঁক গলিয়ে তার শরীর হয়তো দেখা গেছে। সেদিকে কার্তিকের যৌনাতুর কুকুড়ের মতো চকচকে চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে পাগলীর পুত্র বয়সী কয়েকজন পুরুষ। তারা হায়েনার মতো হিংস্রতা নিয়ে হাসছে। খ্যা খ্যা গ্যা গ্যা করছে।

আমার হাত আবার নিশপিশ করতে শুরু করেছে। ইচ্ছে করেছে খুবলে যদি এই পিশাচদের চোখগুলো তুলে নিতে পারতাম! ঘেন্নায় গা ঘিন ঘিন করছিল। কি বিচিত্র রুচিবোধ!

প্রেসক্লাবে গিয়ে বসলাম। এক সিনিয়র সাংবাদিক পাশে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, একটা গ্যাং রেপের ঘটনা ঘটেছে। আমি যেন তার সাথে সেখানে যাই। আমি বললাম, কোথায় ঘটেছে?

তিনি বললেন, একটা মেয়ে ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছে।  মেয়েটি মেসে থাকতো। গতকালও সে স্বাভাবিক চলাচল করেছে। আজ সে হাঁটতে পারছে না। খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। তাকে নাকি ৪/৫টা স্টিচও দিতে হয়েছে।

কিন্তু রেপ হয়েছে বললেন, সেটা কি কোন ডাক্তার, মেয়েটি বা তার অভিভাবক বা কোন অভিযোগ থেকে বলছেন?

না না। তেমন কেউ বলেনি। কেউ বলবে না। সবাই গোপন করতে  চাচ্ছে। তাই চলুন। আমরা গিয়ে খুঁজে বের করি কিভাবে ও কারা মেয়েটিকে রেপ করেছে।

এবার আমি বললাম, আপনি কার কাছে শুনেছেন? এমনও তো হতে পারে আপনার ধারণা ঠিক না। তিনি এবার আমার সাথেই বিরক্ত হয়ে বললেন, মেসের মেয়ে হঠাৎ কি এমন অসুস্থ হয়ে পড়লো যে তাকে সেলাই দিতে হলো। আর সে হাঁটতে পারছে না কেন?

আমি নিজের কপাল চাপড়ালাম। কিন্তু চুপ থাকলাম না। খুব গোপনে সেই সাংবাদিককে না জানিয়ে ক্লিনিকে গেলাম। খোঁজও নিলাম। মেয়েটির শরীরের কয়েকটি জায়গায় জখম। কোথাও পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। ডাক্তারের কাছে শুনলাম, না তেমন কিছু নয়। তবে মেয়েটিকে কোন সাংবাদিক গিয়ে তার ধারণা মতো প্রশ্ন করেছিল বলে শুনলাম।

কী বিচিত্র মানুষের আগ্রহ!

এবার হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরছিলাম। বিজিবি ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়া ঘেষা পথ ধরে। প্রায় শত গজ হাঁটা পথ।

এটুকু এগুতে আমার চারজনকে অতিক্রম করতে হলো যারা কাঁটাতারের দিকে মুখ করে মুত্রত্যাগ করছিল। আমি ভিন্ন দিকে মুখ করে পার হচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, যদি কোন নারী হোক না সে কোন পাগলী, এভাবে মুত্রত্যাগের জন্য রাস্তার পাশে বসতো, এই পুরুষরা তো  চোখ ফিরাতো না। পারলে তার সামনে গিয়ে হাঁটুগেড়ে বসে থাকতো।

দিগম্বর পাগলকে দেখে মেয়েরা ভয়ে চোখ বন্ধ করে, আর একটা ছিন্নবস্ত্রের পাগলীর শরীর দেখার জন্য উম্মুখ হয় পুরুষ। নারীতে পুরুষে রুচির ব্যবধান এতোটাই!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.