আমার না বলা গল্প-৮

যৌন মর্ষকাম, বাংলাদেশ ও ভারতসুরঞ্জনা চৌধুরী: একবার একজন নারীনেত্রী একটা মত বিনিময় সভায় বলেছিলেন, ‘মেয়েরা তোমরা এসব বলছো, আমার ৬৫ বছর বয়সেও শরীরটাকে লুকাতে পারি না মানুষের দৃষ্টি থেকে, মনে হয় চোখ দিয়েই গিলে খাবে’। সেদিন একজন সিনিয়র সাংবাদিক আপাও বলছিলেন, গেছিলেন ভোট দিতে, সেখানে একজন নাতি বয়সী স্বেচ্ছাসেবক এমনভাবে হাতটা নাড়ালো, যেন হাতটা ঠিক বুকের মধ্যে এসেই লাগে। শুনে আমরা শ্রোতারা বলেছিলাম, ‘আপা, হয়তো ও আপনাকে দিয়েই হাতের প্রাকটিসটা করে নিয়েছে, পরবর্তীতে যাতে কম বয়সীদের ক্ষেত্রে করতে পারে অবলীলায়’।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল একজন সাবেক সাংবাদিক সহকর্মীর কথা। যে কিনা একদা ‘মোস্ট সার্কুলেটেড’ পত্রিকায় কাজ করতো। তো, সেই কাগজের চিফ রিপোর্টারের চোখ ছিল তীক্ষ্ণ, মর্মভেদি একেবারে। সেই সহকর্মিটি একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘ঊনার তো চোখ জামা ভেদ করে ব্রা ভেদ করে একেবারে ভিতরে গিয়ে দেখে আসে’। পরবর্তীতে কথাটার সত্যতাও পেয়েছি অনেকবার।

স্কুলে পড়ার সময় আমাদের কলোনিতে অনেকগুলো বাসার একটি বাসায় থাকতেন এক বয়সী লোক। মাঝখানে পুকুর, সেই পুকুর ঘিরে সবগুলো ভাড়া বাসা। তো, বিকেল হলেই বাসাগুলোর বউ-ঝিরা পুকুর পাড়ে জড়ো হতেন, খোশগল্প করতে। আর তখনই নিয়ম করে ওই লোকের আসা চাই-ই চাই। তাকে দূর থেকে দেখেই বউ-ঝিরা সবাই বাসায় ঢুকে পড়তো। তাদের ফিসফাস কানে আসে, ‘এই লোকের চোখ ভাল না’। আমি তখনও বোঝার বয়সে নেই, চোখ কি করে খারাপ হয় মানুষের! বড়জোর চোখে কম দেখতে পারেন। কিন্তু সেই কলোনিতে বছর না ঘুরতেই যখন হঠাৎ ‘বড় হয়ে গেলাম’ বুঝতে শিখলাম, সেই লোকের চোখের ভাষা। কখনও তার চোখ মেয়েদের বুক ছেড়ে উঠে আসতো না।

কী আশ্চর্য, এই লোকের এরকম ‘অন্যদৃষ্টি’র কথা বউদের বদৌলতে ঘরের ‘পুরুষ’ মানুষটির কাছেও পৌঁছাতো। সমাধান হতো, এতো বাসার বাইরে যাওয়ার দরকার কী!

সত্যিই তো, একজনের ‘কুনজর’ দেখে বাঁচতে শুধু শাড়ি-ওড়না দিয়ে শরীর ঢাকাই সব নয়, এবার বাসায় ঢুকে থাকো।

আমি তখন থাকতাম বোনের বাসায়। স্কুলে পড়তাম সেখান থেকেই। প্রেম করার কারণে আমার এই নির্বাসন। আমার প্রেমটা ছিল চিঠি লেখার প্রেম। প্রতিদিন চিঠি লিখতাম দুজন-দুজনকে। দুজনই স্কুলপড়ুয়া, সেকী দুর্বার সেই ভাষা। রবীন্দ্র-নজরুল কেউ বাদ পড়তো না সেই লেখা থেকে। কিন্তু দুজনের কাছে আসা দূরের কথা, সামনাসামনি কথাও হয়নি কোনদিন। কিন্তু পরিবার আমার সেই প্রেম থেকে ‘নিরাপত্তা’ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বোনের বাসায় আমাকে ট্রান্সফার করে দিল।

কিন্তু সেই বোনের বাসা যে আমার জীবনে কেমন কাল হয়ে এসেছিল, সেকথা জানবেন না আপনারা? সেখানে একজন দুলাভাই নামক পুরুষ ছিল। অনেকের দুলাভাই দেখেছি জীবনে যারা বড় ভাইয়ের আসনে আসীন হয়ে পুরো সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। কিন্তু আমার দুলাভাই তার বাসায় যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই একদিন সুযোগ বুঝে মন্তব্য করলো, ‘তোমার বুকটা এতো বড় কেন, অনেকেই হাত দিয়েছে বুঝি’! আমার সেদিন পায়ের নিচে মাটি সরে গিয়েছিল। যে প্রেমের কারণে আমার এই নির্বাসন, সেখানে তো এমন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না!

একদিন সে আমার গায়ে হাত দিল। প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় আমি অস্থির সেদিন। বড়বোনের কাছ থেকে আমার মাথা টিপে দেয়ার অনুমতি নিয়ে এসে আস্তে করে জামার তলায় হাত ঢুকিয়ে দিল। আমি এক ঝটকায় সেই হাত সরিয়ে দেই। এরপর থেকে আমি রাতে ঘুমাতে পারতাম না। ভয়ে সেঁদিয়ে থাকতাম, এই বুঝি ঘরে এসে আমাকে ধরে ফেললো। সেদিন থেকে আমার নিরাপত্তা হারাম হয়ে যায়।

গোসলখানাটা ছিল পাকা, টিনের দরোজা। সেই দরোজায় কয়েকটা ফুটো ছিল। একদিন গোসল করছি, হঠাৎই চোখ গেল ফুটোয়। দেখি একটা চোখ। ঘৃণায় আমার সারা শরীর রি রি করে উঠলো। বোন সেইসময় তার বাচ্চাকে রাখতে পাশের বাসায় গিয়ে গল্পে আটকে গেছিল। সেই ফাঁকেই তার ‘পরম স্বামী’ আমার কিশোরী উঠতি শরীর দেখতে চোখ লাগালো টিনের ফুটোয়। আমি সাবান পানি ছুড়েঁ মেরেছিলাম সেদিন আর চিৎকার করে বলেছিলাম, ‘কুত্তা’।

সেদিনই আমার মনে আছে খুব প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল মনটা। মাতৃতুল্য বোনকে বলেছিলাম, ‘তোমরা না আমার ভালোর জন্য তোমাদের এখানে নিয়ে এসেছো? নাকি তোমার জামাই এর জন্য এনেছো?’ এখনও ষ্পষ্ট মনে আছে, বোনের আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়েছিল সেদিন, কোনো ব্যাখ্যা সেই চাইতে পারেনি তার স্বামীর কাছে, প্রতিবাদ তো দূরের কথা। সে তার জীবনকে সারা জীবনই মেনে নিয়েছে। সে পরিবারে ভাল মেয়ে, অমায়িক মেয়ে, অসাধারণ মেয়ে।

আর আমি? প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করে, মুখরা মেয়ে সেজে, পরিবারে খারাপ মেয়ে সেজে এগিয়ে এসেছি এতোটা পথ। (চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.